4:27 am, Saturday, 16 May 2026

আব্দুল আলীমের স্বাধীনতা ও একুশে পদক চুরি

ডেস্ক রিপোর্ট : বাংলা লোকসংগীতকে অবিশ্বাস্য এক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন আব্দুল আলীম। পল্লীগীতি, ভাটিয়ালি, দেহতত্ত্ব, মুর্শিদি গানের শিল্পী হিসেবে আজও অপ্রতিদ্বন্দ্বী তিনি।
মরমী এই শিল্পী বহু গান যেমন উপহার দিয়েছেন, তেমনি অর্জন করেছেন অনেক সম্মাননা ও স্বীকৃতি। সে তালিকায় আছেন স্বাধীনতা পুরস্কার, একুশে পদকের মতো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিও।

শিল্পীর রাষ্ট্রীয় দুটি পদকসহ গুরুত্বপূর্ণ সাতটি পুরস্কার ও স্মারক চুরি হয়ে গেছে। গেল ৮ মে রাজধানীর খিলগাঁও এলাকার একটি বাসা থেকে এই চুরির ঘটনা ঘটে। দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও এখনো উদ্ধার হয়নি এসব মূল্যবান পদক।

আব্দুল আলীমের কন্যা নুরজাহান আলীম জানান, চুরি যাওয়া জিনিসগুলোর মধ্যে রয়েছে ১৯৭৭ সালের একুশে পদক, ১৯৯৭ সালের স্বাধীনতা পুরস্কার, ১৯৬০ সালে পাকিস্তানি প্রেসিডেন্টের দেওয়া তমঘা-ই-হুসন এবং লাহোরে নিখিল পাকিস্তান সংগীত সম্মেলনে প্রাপ্ত দুটি সম্মাননা স্মারক। সঙ্গে চুরি হয়েছে ৫০ হাজার টাকা, একটি স্বর্ণের কানের দুল ও একটি গলার হার।

খিলগাঁও সি ব্লকের পুনর্বাসন আবাসিক এলাকার তিনতলা বাড়ির নিচতলায় থাকেন আব্দুল আলীমের মেজো মেয়ে আসিয়া আলীম। ঘটনার দিন সন্ধ্যা ৭টার দিকে তিনি হাঁটতে বের হন, আর ফিরে এসে দেখতে পান দরজার তালা ভাঙা, ঘরে তছনছ অবস্থা।

বাড়ির ছয় ইউনিটের মধ্যে পাঁচটিতে শিল্পীর সন্তানরা থাকেন এবং একটি ইউনিট ভাড়া দেওয়া হয়েছে। নিচতলায় অপর ইউনিটে থাকেন আব্দুল আলীমের মেজো ছেলে সংগীতশিল্পী আজগর আলীম। দোতলায় থাকেন বড় ছেলে জহির আলীম।

জহির আলীম জানান, বাসায় গ্যাস-পানির বিল হিসেবে রাখা ১০ হাজার টাকা চোররা নেয়নি। তাদের টার্গেট ছিল মূল্যবান পদক ও স্বর্ণালঙ্কার। বাবার পদক উদ্ধারে তিনি স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করেন। উপদেষ্টা দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

বলে রাখা যায়, আব্দুল আলীমের জন্ম ১৯৩১ সালের ২৭ জুলাই বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের (ভারত) মুর্শিদাবাদের তালিবপুর গ্রামে। বাল্যকাল থেকেই আলীম সংগীতের প্রবল অনুরাগী ছিলেন আব্দুল আলীম। অর্থনৈতিক অনটনের কারণে কোনো শিক্ষকের কাছে গান শেখার সৌভাগ্য তার হয়নি। তিনি শুনে গান শিখতেন; আর বিভিন্ন পালাপার্বণে সেগুলো গাইতেন। এভাবে পালাপার্বণে গান গেয়ে তিনি বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেন।

মাত্র ১৩ বছর বয়সে ১৯৪৩ সালে তার গানের প্রথম রেকর্ড হয়। রেকর্ডকৃত গান দুটি হলো ‘তোর মোস্তফাকে দে না মাগো’ ও ‘আফতাব আলী বসলো পথে’। এত অল্প বয়সে গান রেকর্ড হওয়া সত্যিই বিস্ময়কর। পরে তা আর বিস্ময় হয়ে থাকেনি, তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলার লোকসংগীতের এক অবিসংবাদিত-কিংবদন্তি পুরুষ।

দেশভাগের পর আব্দুল আলীম ঢাকায় চলে আসেন এবং রেডিওতে স্টাফ আর্টিস্ট হিসেবে গান গাইতে শুরু করেন। তিনি পরে টেলিভিশন সেন্টার চালু হলে সেখানেও সংগীত পরিবেশন শুরু করেন। এ ছাড়া তৎকালীন বাংলাদেশের প্রথম চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’সহ বিভিন্ন বাংলা চলচ্চিত্রে আব্দুল আলীম গান করেছেন। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রটি হলো ‘লালন ফকির’।

সব মিলিয়ে প্রায় ৫০০টির মতো গান রেকর্ড হয়েছিল আব্দুল আলীমের। এছাড়া স্টুডিও রেকর্ডেও তার অসংখ্য গান রয়েছে। তার জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে ‘যার আপন খবর আপনার হয় না’, ‘নাইয়া রে নায়ের বাদাম তুইলা’, ‘সর্বনাশা পদ্মা নদী’, ‘হলুদিয়া পাখী’, ‘মেঘনার কুলে ঘর বাঁধিলাম’, ‘এই যে দুনিয়া’, ‘দোল দোল দুলনি’, ‘দুয়ারে আইসাছে পালকি’, ‘কেনবা তারে সঁপে দিলাম দেহ মন প্রাণ’, ‘মনে বড় আশা ছিল যাবো মদীনায়’ কেহ করে বেচা কেনা কেহ কান্দে’, ‘সব সখিরে পার করিতে নেব আনা আনা’ প্রভৃতি।

সঙ্গীতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আব্দুল আলীম বেশ কয়েকটি জাতীয় পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার সম্মাননা পেয়েছেন। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- একুশে পদক, পূর্বাণী চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি পুরস্কার। পাকিস্তান মিউজিক কনফারেন্স, লাহোরে সঙ্গীত পরিবেশন করে আব্দুল আলীম পাঁচটি স্বর্ণ পদক পেয়েছিলেন।

১৯৭৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর মাত্র ৪৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন আব্দুল আলীম। বাংলাদেশ সরকার ১৯৭৭ সালে তাকে মরণোত্তর একুশে পদক প্রদান করে সম্মানিত করে। এছাড়া ১৯৯৭ সালে তাকে মরণোত্তর স্বাধীনতা দিবস পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়।

Tag :
About Author Information

Sirajul Islam

আব্দুল আলীমের স্বাধীনতা ও একুশে পদক চুরি

Update Time : 10:23:07 am, Thursday, 22 May 2025

ডেস্ক রিপোর্ট : বাংলা লোকসংগীতকে অবিশ্বাস্য এক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন আব্দুল আলীম। পল্লীগীতি, ভাটিয়ালি, দেহতত্ত্ব, মুর্শিদি গানের শিল্পী হিসেবে আজও অপ্রতিদ্বন্দ্বী তিনি।
মরমী এই শিল্পী বহু গান যেমন উপহার দিয়েছেন, তেমনি অর্জন করেছেন অনেক সম্মাননা ও স্বীকৃতি। সে তালিকায় আছেন স্বাধীনতা পুরস্কার, একুশে পদকের মতো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিও।

শিল্পীর রাষ্ট্রীয় দুটি পদকসহ গুরুত্বপূর্ণ সাতটি পুরস্কার ও স্মারক চুরি হয়ে গেছে। গেল ৮ মে রাজধানীর খিলগাঁও এলাকার একটি বাসা থেকে এই চুরির ঘটনা ঘটে। দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও এখনো উদ্ধার হয়নি এসব মূল্যবান পদক।

আব্দুল আলীমের কন্যা নুরজাহান আলীম জানান, চুরি যাওয়া জিনিসগুলোর মধ্যে রয়েছে ১৯৭৭ সালের একুশে পদক, ১৯৯৭ সালের স্বাধীনতা পুরস্কার, ১৯৬০ সালে পাকিস্তানি প্রেসিডেন্টের দেওয়া তমঘা-ই-হুসন এবং লাহোরে নিখিল পাকিস্তান সংগীত সম্মেলনে প্রাপ্ত দুটি সম্মাননা স্মারক। সঙ্গে চুরি হয়েছে ৫০ হাজার টাকা, একটি স্বর্ণের কানের দুল ও একটি গলার হার।

খিলগাঁও সি ব্লকের পুনর্বাসন আবাসিক এলাকার তিনতলা বাড়ির নিচতলায় থাকেন আব্দুল আলীমের মেজো মেয়ে আসিয়া আলীম। ঘটনার দিন সন্ধ্যা ৭টার দিকে তিনি হাঁটতে বের হন, আর ফিরে এসে দেখতে পান দরজার তালা ভাঙা, ঘরে তছনছ অবস্থা।

বাড়ির ছয় ইউনিটের মধ্যে পাঁচটিতে শিল্পীর সন্তানরা থাকেন এবং একটি ইউনিট ভাড়া দেওয়া হয়েছে। নিচতলায় অপর ইউনিটে থাকেন আব্দুল আলীমের মেজো ছেলে সংগীতশিল্পী আজগর আলীম। দোতলায় থাকেন বড় ছেলে জহির আলীম।

জহির আলীম জানান, বাসায় গ্যাস-পানির বিল হিসেবে রাখা ১০ হাজার টাকা চোররা নেয়নি। তাদের টার্গেট ছিল মূল্যবান পদক ও স্বর্ণালঙ্কার। বাবার পদক উদ্ধারে তিনি স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করেন। উপদেষ্টা দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

বলে রাখা যায়, আব্দুল আলীমের জন্ম ১৯৩১ সালের ২৭ জুলাই বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের (ভারত) মুর্শিদাবাদের তালিবপুর গ্রামে। বাল্যকাল থেকেই আলীম সংগীতের প্রবল অনুরাগী ছিলেন আব্দুল আলীম। অর্থনৈতিক অনটনের কারণে কোনো শিক্ষকের কাছে গান শেখার সৌভাগ্য তার হয়নি। তিনি শুনে গান শিখতেন; আর বিভিন্ন পালাপার্বণে সেগুলো গাইতেন। এভাবে পালাপার্বণে গান গেয়ে তিনি বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেন।

মাত্র ১৩ বছর বয়সে ১৯৪৩ সালে তার গানের প্রথম রেকর্ড হয়। রেকর্ডকৃত গান দুটি হলো ‘তোর মোস্তফাকে দে না মাগো’ ও ‘আফতাব আলী বসলো পথে’। এত অল্প বয়সে গান রেকর্ড হওয়া সত্যিই বিস্ময়কর। পরে তা আর বিস্ময় হয়ে থাকেনি, তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলার লোকসংগীতের এক অবিসংবাদিত-কিংবদন্তি পুরুষ।

দেশভাগের পর আব্দুল আলীম ঢাকায় চলে আসেন এবং রেডিওতে স্টাফ আর্টিস্ট হিসেবে গান গাইতে শুরু করেন। তিনি পরে টেলিভিশন সেন্টার চালু হলে সেখানেও সংগীত পরিবেশন শুরু করেন। এ ছাড়া তৎকালীন বাংলাদেশের প্রথম চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’সহ বিভিন্ন বাংলা চলচ্চিত্রে আব্দুল আলীম গান করেছেন। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রটি হলো ‘লালন ফকির’।

সব মিলিয়ে প্রায় ৫০০টির মতো গান রেকর্ড হয়েছিল আব্দুল আলীমের। এছাড়া স্টুডিও রেকর্ডেও তার অসংখ্য গান রয়েছে। তার জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে ‘যার আপন খবর আপনার হয় না’, ‘নাইয়া রে নায়ের বাদাম তুইলা’, ‘সর্বনাশা পদ্মা নদী’, ‘হলুদিয়া পাখী’, ‘মেঘনার কুলে ঘর বাঁধিলাম’, ‘এই যে দুনিয়া’, ‘দোল দোল দুলনি’, ‘দুয়ারে আইসাছে পালকি’, ‘কেনবা তারে সঁপে দিলাম দেহ মন প্রাণ’, ‘মনে বড় আশা ছিল যাবো মদীনায়’ কেহ করে বেচা কেনা কেহ কান্দে’, ‘সব সখিরে পার করিতে নেব আনা আনা’ প্রভৃতি।

সঙ্গীতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আব্দুল আলীম বেশ কয়েকটি জাতীয় পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার সম্মাননা পেয়েছেন। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- একুশে পদক, পূর্বাণী চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি পুরস্কার। পাকিস্তান মিউজিক কনফারেন্স, লাহোরে সঙ্গীত পরিবেশন করে আব্দুল আলীম পাঁচটি স্বর্ণ পদক পেয়েছিলেন।

১৯৭৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর মাত্র ৪৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন আব্দুল আলীম। বাংলাদেশ সরকার ১৯৭৭ সালে তাকে মরণোত্তর একুশে পদক প্রদান করে সম্মানিত করে। এছাড়া ১৯৯৭ সালে তাকে মরণোত্তর স্বাধীনতা দিবস পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়।