12:36 pm, Tuesday, 6 October 2026

আমাদের মাদ্রাসা, আমাদের আমানত – সংস্কারের এখনই সময়

অতীত কাল থেকে একটি রেওয়াজ চলে আসছে – মাদ্রাসার ছাত্রদের দিয়ে হুজুরের জুতা বহন করানো, ব্যাগ বহন করানো, শরীর টিপে দেওয়া বা ম্যাসাজ করানোকে ‘খেদমত’ নামে চালিয়ে দেওয়া।
আগের যুগের হুজুররা ছিলেন অনেক বড় পরহেজগার, মুত্তাকি। ছাত্রদের তারা সন্তানের মতো দেখতেন। কিন্তু আজ দুঃখজনক হলেও সত্য, হাতে গোনা কিছু হুজুর নফসের গোলামে পরিণত হয়েছেন। এই ‘খেদমত’ এর নামে যে সুযোগ তৈরি হয়, তার অপব্যবহারের কিছু বিচ্ছিন্ন কিন্তু অত্যন্ত নিন্দনীয় ঘটনা আমরা দেখছি।
আমার প্রশ্ন হলো – স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটিতে সমকামী প্রেমের নামে, অবাধ মেলামেশার নামে যা হয়, তা নিয়ে কয়টা পত্রিকায় নিউজ হয়? তখন সমাজ অনেকটাই নীরব থাকে।
কিন্তু মাদ্রাসার একটি ঘটনা কেন এত বড় করে প্রচার হয়? কারণ মাদ্রাসা একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। এটি বিশ্বাসের জায়গা, ভরসার জায়গা। এখানে আমল, ঈমান, আখলাক নিয়ে কথা হয়। এখানে তালিম হয় হালাল-হারাম, বেহেশত-দোজখ নিয়ে। মানুষ তার কলিজার টুকরা সন্তানকে আল্লাহর রাস্তায় দিয়ে আসে এক বুক বিশ্বাস নিয়ে। তাই এখানকার সামান্য বিচ্ছিন্ন ঘটনাও মানুষের হৃদয়ে বড় আঘাত করে, পুরো দ্বীনি শিক্ষা ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
তাহলে মানুষ যাবে কোথায়? এই বিশ্বাসের জায়গাটা যদি নিরাপদ না থাকে?
তাই সময় এসেছে কঠোর সংস্কারের। আমি একজন সমাজকর্মী হিসেবে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি:
১. খেদমতের নামে ব্যক্তিগত সেবা সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে: কোনো ছাত্র দিয়ে হুজুরের শরীর ম্যাসাজ করানো, জুতা-ব্যাগ বহন করানো যাবে না। ছাত্ররা এসেছে ইলম শিখতে, ব্যক্তিগত চাকর হতে নয়।
২. প্রত্যেক ক্লাসরুম ও অফিস রুমে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন: স্বচ্ছতার জন্য এটি অত্যন্ত জরুরি।
৩. আবাসিক নিয়মে কঠোরতা: ছাত্রদের আবাসিক রুমে কোনো শিক্ষক বিনা প্রয়োজনে এবং একাকী প্রবেশ করবেন না। এবং শিক্ষকের ব্যক্তিগত রুমে ছাত্রদের একাকী প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে।
৪. কড়া নজরদারি ও অভিযোগ বক্স: প্রতিটি মাদ্রাসায় গোপন অভিযোগ বক্স এবং অভিভাবকদের সাথে নিয়মিত মতবিনিময় সভা চালু করতে হবে।
মাদ্রাসা আমাদের দ্বীনের দুর্গ। এই দুর্গকে কলঙ্কমুক্ত রাখার দায়িত্ব আমাদের সবার। আসুন, সমালোচনা নয়, সংস্কারের মাধ্যমে আমাদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও সুন্দর ও নিরাপদ করে তুলি।
কোরআন ও হাদিসের আলোকে আমাদের দায়িত্ব:
আল্লাহ তাআলা আমাদের আমানত রক্ষার কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। ছাত্ররা শিক্ষকদের কাছে আমানত।
১. আমানত রক্ষা সম্পর্কে আল্লাহ বলেন:
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَىٰ أَهْلِهَا
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তোমরা আমানতসমূহ তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দাও।”
[সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৫৮]
২. আমানতের খেয়ানত সম্পর্কে:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَخُونُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ وَتَخُونُوا أَمَانَاتِكُمْ
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ ও রাসূলের সাথে খেয়ানত করো না এবং জেনে-শুনে নিজেদের আমানতের খেয়ানত করো না।”
[সূরা আল-আনফাল, আয়াত: ২৭]
৩. ন্যায় ও ইনসাফ সম্পর্কে:
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ
“নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা ও সদাচরণের নির্দেশ দেন।”
[সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৯০]
রাসূল (সাঃ) এর হাদিস:
১. প্রত্যেক দায়িত্বশীলকে জবাবদিহি করতে হবে:
كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ
“তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।”
[সহীহ বুখারী – ৮৯৩, সহীহ মুসলিম – ১৮২৯]
২. ছোটদের প্রতি দয়া সম্পর্কে:
لَيْسَ مِنَّا مَنْ لَمْ يَرْحَمْ صَغِيرَنَا وَيُوَقِّرْ كَبِيرَنَا
“যে আমাদের ছোটদের প্রতি দয়া করে না এবং বড়দের সম্মান করে না, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।”
[জামে তিরমিজি – ১৯১৯]
৩. উত্তম শিক্ষক সম্পর্কে:
خَيْرُكُمْ مَنْ تَعَلَّمَ الْقُرْآنَ وَعَلَّمَهُ
“তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে, যে নিজে কোরআন শেখে এবং অপরকে শেখায়।”
[সহীহ বুখারী – ৫০২৭]
তাই সময় এসেছে কঠোর সংস্কারের। আমি সমাজকর্মী হিসেবে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানাচ্ছি:
১. খেদমতের নামে ব্যক্তিগত সেবা বন্ধ: শরীর ম্যাসাজ, জুতা-ব্যাগ বহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। আবাসিক রুমে রাত্রিবেলা হুজুর প্রবেশ নিষিদ্ধ করা।
আসুন আমরা আমাদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সুন্দর রাখি।
মতিন বকশ
বিএ/বিএসএস -এলএলবি
সমাজকর্মী।

Tag :
About Author Information

Sirajul Islam

কুলাউড়ায় বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে পাঁচ গুণী শিক্ষককে সম্মাননা

আমাদের মাদ্রাসা, আমাদের আমানত – সংস্কারের এখনই সময়

Update Time : 10:11:17 am, Saturday, 3 October 2026

অতীত কাল থেকে একটি রেওয়াজ চলে আসছে – মাদ্রাসার ছাত্রদের দিয়ে হুজুরের জুতা বহন করানো, ব্যাগ বহন করানো, শরীর টিপে দেওয়া বা ম্যাসাজ করানোকে ‘খেদমত’ নামে চালিয়ে দেওয়া।
আগের যুগের হুজুররা ছিলেন অনেক বড় পরহেজগার, মুত্তাকি। ছাত্রদের তারা সন্তানের মতো দেখতেন। কিন্তু আজ দুঃখজনক হলেও সত্য, হাতে গোনা কিছু হুজুর নফসের গোলামে পরিণত হয়েছেন। এই ‘খেদমত’ এর নামে যে সুযোগ তৈরি হয়, তার অপব্যবহারের কিছু বিচ্ছিন্ন কিন্তু অত্যন্ত নিন্দনীয় ঘটনা আমরা দেখছি।
আমার প্রশ্ন হলো – স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটিতে সমকামী প্রেমের নামে, অবাধ মেলামেশার নামে যা হয়, তা নিয়ে কয়টা পত্রিকায় নিউজ হয়? তখন সমাজ অনেকটাই নীরব থাকে।
কিন্তু মাদ্রাসার একটি ঘটনা কেন এত বড় করে প্রচার হয়? কারণ মাদ্রাসা একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। এটি বিশ্বাসের জায়গা, ভরসার জায়গা। এখানে আমল, ঈমান, আখলাক নিয়ে কথা হয়। এখানে তালিম হয় হালাল-হারাম, বেহেশত-দোজখ নিয়ে। মানুষ তার কলিজার টুকরা সন্তানকে আল্লাহর রাস্তায় দিয়ে আসে এক বুক বিশ্বাস নিয়ে। তাই এখানকার সামান্য বিচ্ছিন্ন ঘটনাও মানুষের হৃদয়ে বড় আঘাত করে, পুরো দ্বীনি শিক্ষা ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
তাহলে মানুষ যাবে কোথায়? এই বিশ্বাসের জায়গাটা যদি নিরাপদ না থাকে?
তাই সময় এসেছে কঠোর সংস্কারের। আমি একজন সমাজকর্মী হিসেবে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি:
১. খেদমতের নামে ব্যক্তিগত সেবা সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে: কোনো ছাত্র দিয়ে হুজুরের শরীর ম্যাসাজ করানো, জুতা-ব্যাগ বহন করানো যাবে না। ছাত্ররা এসেছে ইলম শিখতে, ব্যক্তিগত চাকর হতে নয়।
২. প্রত্যেক ক্লাসরুম ও অফিস রুমে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন: স্বচ্ছতার জন্য এটি অত্যন্ত জরুরি।
৩. আবাসিক নিয়মে কঠোরতা: ছাত্রদের আবাসিক রুমে কোনো শিক্ষক বিনা প্রয়োজনে এবং একাকী প্রবেশ করবেন না। এবং শিক্ষকের ব্যক্তিগত রুমে ছাত্রদের একাকী প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে।
৪. কড়া নজরদারি ও অভিযোগ বক্স: প্রতিটি মাদ্রাসায় গোপন অভিযোগ বক্স এবং অভিভাবকদের সাথে নিয়মিত মতবিনিময় সভা চালু করতে হবে।
মাদ্রাসা আমাদের দ্বীনের দুর্গ। এই দুর্গকে কলঙ্কমুক্ত রাখার দায়িত্ব আমাদের সবার। আসুন, সমালোচনা নয়, সংস্কারের মাধ্যমে আমাদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও সুন্দর ও নিরাপদ করে তুলি।
কোরআন ও হাদিসের আলোকে আমাদের দায়িত্ব:
আল্লাহ তাআলা আমাদের আমানত রক্ষার কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। ছাত্ররা শিক্ষকদের কাছে আমানত।
১. আমানত রক্ষা সম্পর্কে আল্লাহ বলেন:
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَىٰ أَهْلِهَا
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তোমরা আমানতসমূহ তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দাও।”
[সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৫৮]
২. আমানতের খেয়ানত সম্পর্কে:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَخُونُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ وَتَخُونُوا أَمَانَاتِكُمْ
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ ও রাসূলের সাথে খেয়ানত করো না এবং জেনে-শুনে নিজেদের আমানতের খেয়ানত করো না।”
[সূরা আল-আনফাল, আয়াত: ২৭]
৩. ন্যায় ও ইনসাফ সম্পর্কে:
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ
“নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা ও সদাচরণের নির্দেশ দেন।”
[সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৯০]
রাসূল (সাঃ) এর হাদিস:
১. প্রত্যেক দায়িত্বশীলকে জবাবদিহি করতে হবে:
كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ
“তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।”
[সহীহ বুখারী – ৮৯৩, সহীহ মুসলিম – ১৮২৯]
২. ছোটদের প্রতি দয়া সম্পর্কে:
لَيْسَ مِنَّا مَنْ لَمْ يَرْحَمْ صَغِيرَنَا وَيُوَقِّرْ كَبِيرَنَا
“যে আমাদের ছোটদের প্রতি দয়া করে না এবং বড়দের সম্মান করে না, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।”
[জামে তিরমিজি – ১৯১৯]
৩. উত্তম শিক্ষক সম্পর্কে:
خَيْرُكُمْ مَنْ تَعَلَّمَ الْقُرْآنَ وَعَلَّمَهُ
“তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে, যে নিজে কোরআন শেখে এবং অপরকে শেখায়।”
[সহীহ বুখারী – ৫০২৭]
তাই সময় এসেছে কঠোর সংস্কারের। আমি সমাজকর্মী হিসেবে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানাচ্ছি:
১. খেদমতের নামে ব্যক্তিগত সেবা বন্ধ: শরীর ম্যাসাজ, জুতা-ব্যাগ বহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। আবাসিক রুমে রাত্রিবেলা হুজুর প্রবেশ নিষিদ্ধ করা।
আসুন আমরা আমাদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সুন্দর রাখি।
মতিন বকশ
বিএ/বিএসএস -এলএলবি
সমাজকর্মী।