হাসান আল মাহমুদ রাজু:: মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় চা চাষের অনুপযোগী ও পতিত কৃষিজমিকে কাজে লাগিয়ে ড্রাগন ফলের চাষ করে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছেন সিরাজনগর চা বাগানের কর্ণধার সায়ান রসিদ চৌধুরী। চা বাগানের একটি আলাদা প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৫ বিঘা জমিতে গড়ে তোলা হয়েছে ড্রাগন ফলের বাগান। বর্তমানে বাগানটিতে ড্রাগনের বাম্পার ফলন হয়েছে।
গত ১২ সেপ্টেম্বর সরেজমিনে সিরাজনগর চা বাগানে গিয়ে দেখা যায়, বাগানের নিচু জমিতে সারি সারি করে লাগানো হয়েছে ড্রাগন গাছ। গাছের ডালে ঝুলছে অসংখ্য লাল রঙের ড্রাগন ফল। পুরো বাগানজুড়ে ফলের সমারোহে তৈরি হয়েছে মনোরম দৃশ্য।
বাগান সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রায় ১৮ লাখ টাকা প্রাথমিক বিনিয়োগ করে ১৪ হাজার ড্রাগন চারা রোপণের মাধ্যমে প্রকল্পটির যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে বাগানটিতে প্রায় ১৪ হাজার ড্রাগন গাছ রয়েছে। এখানে থাই রেড, জাম্বো রেড ও হোয়াইট পিংক এই তিন জাতের ড্রাগন ফল উৎপাদন করা হচ্ছে।
চারা রোপণের প্রায় ছয় মাস পর গাছে ফল আসতে শুরু করে। পর্যায়ক্রমে প্রায় ১৬ ধাপে গাছে ফুল আসে এবং পরবর্তীতে ফল ধরে। একটি গাছে একাধিক ধাপে ফলন পাওয়া যায়। প্রতিটি চারায় গড়ে ৬ থেকে ৭টি ফল ধরে। প্রতিটি ড্রাগন ফলের ওজন প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ গ্রাম।
প্রকল্প শুরুর সময় প্রায় ১৮ লাখ টাকা বিনিয়োগ করা হলেও বর্তমানে বাগানটিতে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ বেড়ে প্রায় ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। বাগানের পরিচর্যায় একজন ম্যানেজার ও তিনজন কর্মচারী দায়িত্ব পালন করছেন।
বাগান থেকে এ পর্যন্ত আনুমানিক ৬ লাখ টাকার ড্রাগন ফল বিক্রি হয়েছে। এখনও গাছে বিপুল পরিমাণ ফল রয়েছে। পর্যায়ক্রমে পাকা ফল সংগ্রহ করে বাজারজাত করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রায় এক মাস পরপর গড়ে ৫০০ কেজি ফল পাওয়া যায়। এসব ফল বিক্রি করে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা আয় হচ্ছে।
ড্রাগন ফল বাগানের ম্যানেজার শেখ মোহাম্মদ আল মিকাত বলেন,আমাদের চা বাগানের কর্ণধার সায়ান রসিদ চৌধুরী স্যার নিজ উদ্যোগে চা বাগানের নিচু কৃষিজমিতে আলাদা প্রকল্পের মাধ্যমে ড্রাগন ফলের চাষ শুরু করেছেন। বর্তমানে বাগানে ড্রাগনের বাম্পার ফলন হয়েছে। উৎপাদিত ফলের একটি অংশ নিজেদের চাহিদা মেটাতে এবং চা বাগানের শ্রমিকদের মধ্যেও সরবরাহ করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন,শীত মৌসুমে দিনের আলো কম থাকায় ড্রাগনের ফলন কিছুটা কমে যায়। তবে রাতে বাগানে লাইটিংয়ের ব্যবস্থা করা গেলে শীতকালেও ভালো ফলন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সিরাজনগর চা বাগানের ম্যানেজার শামীম আহমদ চৌধুরী বলেন, চা চাষের অনুপযোগী পতিত কৃষিজমিকে কাজে লাগিয়ে ড্রাগন ফলের চাষ করা হচ্ছে। বাগানের মালিক পক্ষের উদ্যোগে আলাদা প্রকল্পের মাধ্যমে এই চাষাবাদ পরিচালিত হচ্ছে। ফল উৎপাদনে ক্ষতিকর কীটনাশক বা পেস্টিসাইডের পরিবর্তে জৈব পদ্ধতিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন,ড্রাগন ফল চাষের মাধ্যমে একদিকে যেমন পুষ্টির চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখছে, অন্যদিকে চা বাগানের শ্রমিকদেরও এই ফল সরবরাহ করা হচ্ছে।
এদিকে কুলাউড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. জসীম উদ্দিন বলেন, ড্রাগন ফলের এই সুন্দর বাগানটি আমি পরিদর্শন করেছি। চা চাষের জন্য অনুপযোগী কৃষিজমি বিকল্প কৃষিতে ব্যবহার করা হলে বাগানের আয় বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে পুষ্টির চাহিদা পূরণেও এ ধরনের উদ্যোগ ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি আরও বলেন,কুলাউড়ার স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে এমনকি বিদেশেও ড্রাগন ফল পাঠানোর সুযোগ রয়েছে। চা বাগান কর্তৃপক্ষ কৃষি বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করলে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হবে।
ড্রাগন ফল প্রকল্পের মালিক ও সিরাজনগর চা বাগানের কর্ণধার সায়ান রসিদ চৌধুরী দেশের বাইরে থাকায় এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

নিজস্ব প্রতিবেদক 






















