আন্তর্জাতিক ডেস্ক :: নাইন ইলেভেন হামলার ২৫তম বার্ষিকীর আগে নিউইয়র্কের ব্রুকলিন ব্রিজ পার্ক থেকে দেখা যাচ্ছে লোয়ার ম্যানহাটনের আকাশজুড়ে আলোকিত ‘ট্রিবিউট ইন লাইট’। ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ছবি: রয়টার্স
দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার প্রচারে ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেকে শান্তির প্রেসিডেন্ট হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, বিদেশে নতুন কোনো যুদ্ধে জড়াবেন না।
কিন্তু ক্ষমতায় ফিরে ইরানের বিরুদ্ধে শুরু করা যুদ্ধ এখন দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে রূপ নেওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এটি ট্রাম্পের নিজস্ব ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধ’ হয়ে উঠতে পারে।
১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার ২৫ বছর পূর্তির প্রাক্কালে ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের যুদ্ধকে যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। এসব দীর্ঘ যুদ্ধ থেকে যুক্তরাষ্ট্র শিক্ষা নিয়েছে কি না এবং এবার যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার কোনো স্পষ্ট কৌশল আছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির বিশ্লেষক সিনা তুসি বলেন, ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি বড় ও অনির্দিষ্টকালীন যুদ্ধে জড়ানোর যে অনীহা তৈরি হয়েছিল, ট্রাম্প তা ভেঙে দিয়েছেন। এর ফলে ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্টকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আরও গভীর সংঘাতের উত্তরাধিকার বহন করতে হতে পারে।
তবে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, ইরানের বিরুদ্ধে বর্তমান যুদ্ধ ইরাক ও আফগানিস্তানের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের মতো নয়। ওই দুই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র শত্রু সরকার উৎখাত করেছিল, হাজার হাজার স্থলসেনা মোতায়েন করে ভূখণ্ড দখল ও নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল এবং ব্যাপক হতাহতের মুখে পড়েছিল। পশ্চিমা ধাঁচের শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চেষ্টাও করেছিল।
ইরানের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র মূলত আকাশ ও নৌ শক্তির ওপর নির্ভর করছে। এতে ইরানের সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি হলেও দেশটিকে পরাজিত করা যায়নি। একই সঙ্গে ট্রাম্পের আহ্বানে ইরানিরাও তাদের শাসকদের উৎখাত করতে এগিয়ে আসেনি।
ছয় মাস ধরে চলা এই যুদ্ধ এখন ক্ষয়যুদ্ধে পরিণত হয়েছে। মাঝেমধ্যে বড় ধরনের হামলা হচ্ছে। এর সর্বশেষ উদাহরণ তেলবাহী জাহাজে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলা। একই সময়ে তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, নভেম্বরের যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরও এই যুদ্ধ চলতে পারে। যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন ভোটারদের বিরোধিতা ট্রাম্পের রিপাবলিকান দলের কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার সম্ভাবনাকেও ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপও বাড়ছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহনে ইরানের বাধার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বেড়েছে। একই সঙ্গে যুদ্ধের কারণে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমেছে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ওয়াশিংটনের অবস্থানও দুর্বল হয়েছে। ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধের সময়ও যুক্তরাষ্ট্র একই ধরনের আন্তর্জাতিক ক্ষতির মুখে পড়েছিল।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি অবশ্য বলেছেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার সাহস একমাত্র ট্রাম্পই দেখিয়েছেন। তার দাবি, ট্রাম্প যুদ্ধের সব লক্ষ্য অর্জন করেছেন এবং নিষেধাজ্ঞা ও সমুদ্র অবরোধ জোরদার করার কারণে ইরানের অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ছে। তবে ইরানের যুদ্ধকে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে কীভাবে দেখা হচ্ছে, সে বিষয়ে রয়টার্সের প্রশ্নের সরাসরি জবাব দেননি তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র যে দীর্ঘ যুদ্ধের যুগে প্রবেশ করেছিল, তার অন্যতম শিক্ষা ছিল দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের রাজনৈতিক মূল্য এবং টিকে থাকার জন্য লড়াই করা প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার কঠিন বাস্তবতা। ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর আফগানিস্তানে অভিযান এবং ২০০৩ সালে ইরাকে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। পরে ইরাকের ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে যুদ্ধের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত গোয়েন্দা তথ্য ভুল প্রমাণিত হয়।
জর্জ ডব্লিউ বুশের আমলের এই দুই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার ওপর বড় চাপ তৈরি করে এবং মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা বাড়ায়। এর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের ক্ষোভই এক দশক আগে ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্থানে ভূমিকা রাখে। ২০২৪ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হওয়ার সময়ও ট্রাম্প সামরিক হস্তক্ষেপ এড়িয়ে দেশের অর্থনৈতিক সমস্যায় মনোযোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি সরবরাহের ওপর প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা ট্রাম্প প্রশাসন যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেনি। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। সমালোচকেরা বলছেন, এর পেছনে ১১ সেপ্টেম্বরের মতো কোনো জাতীয় সংকট ছিল না; বরং এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের পছন্দের যুদ্ধ। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি ছিল—ট্রাম্পের এই দাবিও বিশেষজ্ঞদের একাংশ প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।
ইরান পরিস্থিতি অনেকটা আফগানিস্তানের তালেবানের কৌশলের কথাও মনে করিয়ে দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, দৃঢ় প্রতিপক্ষ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের চাপ সহ্য করে দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারে এবং একই সময়ে দেশের ভেতরের রাজনৈতিক চাপ যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা দুর্বল করতে পারে।
এদিকে এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ইরাক ও আফগানিস্তানে হামলার আগে বুশ প্রশাসন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য সমর্থন পেয়েছিল। পরে সেই সমর্থন কমে যায়। বিপরীতে, ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান শুরুর আগে ট্রাম্প খুব কম পরামর্শ ও ব্যাখ্যার মাধ্যমে এগিয়েছেন। ইউরোপ ও এশিয়ার অনেক দেশের নেতাই যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতার আহ্বানে সাড়া দিতে অনাগ্রহ দেখিয়েছেন।
ইরানের পাল্টা হামলা যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় মিত্রদের ওপর ছড়িয়ে পড়ায় যুদ্ধের আঞ্চলিক প্রভাবও বেড়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলো এমন একটি যুদ্ধ থেকে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করছে, যা তারা নিজেরা চায়নি। এক উপসাগরীয় কর্মকর্তা প্রশ্ন তুলেছেন, এই যুদ্ধের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল আসলে কী।
সৌদি বিশ্লেষক আজিজ আলগাশিয়ান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছায় শুরু হওয়া যুদ্ধগুলোর কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলে এক ধরনের সীমাবদ্ধতা ও অসহায়ত্বের অনুভূতি তৈরি হয়েছে।
ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধ শুরুর সময় যুক্তরাষ্ট্রে শক্তিশালী জনসমর্থন থাকলেও ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের যুদ্ধ শুরু থেকেই তেমন সমর্থন পায়নি। এমনকি ট্রাম্পের ‘আমেরিকা প্রথম’ নীতির সঙ্গে যুক্ত বিশিষ্ট ব্যক্তিদের কেউ কেউ এর সমালোচনা করেছেন।
ট্রাম্প শুরুতে ৩ জানুয়ারির অভিযানের মতো দ্রুত বিজয় আশা করেছিলেন। ওই অভিযানে ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে আটক করা হয়েছিল। কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন হয়েছে। যুদ্ধ এখন অস্বস্তিকর অচলাবস্থায় পরিণত হয়েছে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করাসহ ট্রাম্পের ঘোষিত বিভিন্ন লক্ষ্য এখনো পূরণ হয়নি। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতও কমেছে।
তবে ট্রাম্পের পদক্ষেপের সমর্থকও রয়েছেন। ওয়াশিংটনের ইরানবিরোধী গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিজের প্রধান মার্ক দুবোভিৎস মনে করেন, ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো অন্তহীন যুদ্ধে ফেলেননি। তার দাবি, ট্রাম্প কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জন করেছেন, যা শেষ পর্যন্ত বিজয় এনে দেবে।
সূত্র: রয়টার্স

নিজস্ব প্রতিবেদক 
























