1:03 am, Saturday, 24 October 2026

বড়লেখায় নির্যাতনে গৃহবধু মুন্নির মৃত্যু: অবশেষে শ্বাশুড়ি-ননদ স্বামীসহ ছয় জনের বিরুদ্ধে থানায় মামলা


বড়লেখা প্রতিনিধি : বড়লেখায় বহুল আলোচিত গৃহবধূ মরিয়ম আক্তার মুন্নির (২২) মৃত্যুর ঘটনার ১৬ দিন পর অবশেষে স্বামী, শাশুড়ি, ননদ, ভাসুর ও জাসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে মামলা নিয়েছে থানা পুলিশ। শনিবার রাতে থানায় মামলাটি করেছেন নিহত মুন্নির মা মোছা. রেনু বেগম।

যৌতুকের পাঁচ লাখ টাকা ও ঋণের কিস্তির টাকা পরিশোধের জন্য দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের কারণে মুন্নি আত্মহত্যা করেছেন বলে মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে।

ঘটনার শুরুতে পুলিশের অপমৃত্যু মামলা গ্রহণ নিয়ে নিহতের স্বজনসহ বিভিন্ন মহলে সুরতহাল প্রতিবেদনকারি পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ওঠে। ২১ আগস্ট উপজেলার মুড়িরগুল এলাকায় শ্বশুরবাড়ি থেকে মুন্নির ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এই মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় নানা আলোচনা-সমালোচনা দেখা দেয়। মুন্নির মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটন, অভিযুক্তদের দ্রæত গ্রেফতার ও ন্যায় বিচার নিশ্চিতের দাবিতে সর্বস্তুরের জনসাধারণ সোচ্চার হন।

পরে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে মৃত্যুর কারণ আত্মহত্যা উঠে আসায় শনিবার রাতে (৫ সেপ্টেম্বর) মুন্নির শ্বাশুড়ি-ননদ, স্বামি, ভাসুরসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে মামলা নিয়েছে থানা পুলিশ। মামলায় আরো ৫/৬ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে। পুলিশ আসামিদের গ্রেফতারের জন্য অভিযান চালাচ্ছে।

এদিকে রোববার দুপুরে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবুল খায়ের ও বড়লেখা থানার ওসি মো. মনিরুজ্জামান খানসহ পুলিশ কর্মকর্তারা মুন্নির বাবা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি আব্দুল হাফিজ লালনসহ এলাকার মুরুব্বীদের নিয়ে মুন্নির শ্বশুড় বাড়ির ঘরের তালা ভেঙ্গে ভিতরে প্রবেশ করে তল্লাশি এবং লাশ উদ্ধারের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে মৃত্যুর আলামত ও মুন্নির ব্যবহৃত মোবাইল ফোন উদ্ধারের চেষ্টা চালান। এ সময় মুন্নীর আড়াই বছরের মেয়ে সকলের সামনে এসে আম্মা আম্মা বলে চিৎকার করতে থাকলে সেখানের পরিবেশ ভারি হয়ে উঠে। উল্লেখ্য ঘটনার পর থেকেই অভিযুক্তরা ঘরে তালা ঝুলিয়ে পালিয়ে গেেেছ।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, প্রায় চার বছর আগে উপজেলার মুড়িরগুল এলাকার মৃত ইয়াছিন আলীর ছেলে লাভলু আহমদের সঙ্গে ডিমাই এলাকার হাজী মকবুল আলীর মেয়ে মরিয়ম আক্তার মুন্নির বিয়ে হয়। তাদের আড়াই বছরের একটি মেয়ে রয়েছে। লাভলু বর্তমানে সৌদি আরবে থাকেন।

মুন্নির পরিবারের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই শ্বশুরবাড়ির লোকজন তার কাছে পাঁচ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করে আসছিলেন। ওই টাকা দিয়ে লাভলু সৌদি আরবে গাড়ি কিনবেন বলে মুন্নিকে চাপ দেওয়া হত। টাকা দিতে না পারায় তাকে বিভিন্ন সময় গালিগালাজ ও শারীরিক-মানসিক নির্যাতন করা হয়।

এজাহারে আরও বলা হয়েছে, শ্বশুরবাড়ির লোকজন মুন্নিকে বিভিন্ন ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠান থেকে টাকা তুলে দেওয়ার জন্য চাপ দিতেন। একপর্যায়ে মুন্নির বাবা জিম্মাদার হয়ে মুন্নির নামে একটি বেসরকারি ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠান থেকে পাঁচ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে দেন। পরে ওই ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলে মুন্নির ওপর আবারও চাপ সৃষ্টি করা হয়।

পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার দিন ২১ আগস্ট মুন্নিকে পিত্রালয় থেকে টাকা এনে ঋণের কিস্তি পরিশোধের জন্য চাপ দেওয়া হয়। তিনি টাকা এনে দিতে অপারগতা জানালে গালিগালাজ ও মারধর করা হয়। এ সময় নির্যাতনের কিছু অডিও পরিবারের সদস্যদের কাছে পাঠিয়েছিলেন মুন্নি। তার মায়ের দাবি, স্বামীর কাছ থেকেও ফোনে হুমকি ও মানসিক চাপ দেওয়া হতো।

পরে ওই দিন দুপুরের দিকে স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধি মুন্নির বাবাকে ফোন করে তার মৃত্যুর খবর দেন। পরিবারের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে মুন্নিকে বাথরুমে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান। খবর পেয়ে পুলিশ লাশ উদ্ধার ও ময়নাতদন্তের জন্য মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে পাঠায়। এর আগে মুন্নির বাবাকে দিয়ে অপমৃত্যু মামলা নেয় পুলিশ।

মুন্নির মা রেনু বেগমের অভিযোগ, মেয়ের লাশ গোসলের সময় তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। নির্যাতনের কথা জানিয়ে মুন্নির পাঠানো অডিও ও ভিডিও তাদের কাছে সংরক্ষিত আছে বলেও তিনি মামলায় উল্লেখ করেন। তার দাবি, স্বামীসহ শ্বশুরবাড়ির লোকজনের দীর্ঘদিনের নির্যাতন, মানসিক যন্ত্রণা ও আত্মহত্যায় প্ররোচনার কারণে মুন্নি এ পথ বেছে নেন।

থানার ওসি মো. মনিরুজ্জামান খান রোববার বিকেলে বলেন, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পরই মামলা দেওয়ার জন্য মুন্নির বাবাকে খবর পাঠান। রোববার রাতে মুন্নির মা থানায় মামলা করেছেন। আসামিদের গ্রেফতার ও মুন্নির ব্যবহৃত মোবাইল ফোন উদ্ধারের জন্য পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে।

Tag :
About Author Information

Sirajul Islam

কুলাউড়ার ভাটেরায় স্বৈরাচারের দোসরদের অপতৎপরতা: ফের সক্রিয় যুক্তরাষ্ট্র ফেরত উলামা লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল সিদ্দেকী সেফুল

বড়লেখায় নির্যাতনে গৃহবধু মুন্নির মৃত্যু: অবশেষে শ্বাশুড়ি-ননদ স্বামীসহ ছয় জনের বিরুদ্ধে থানায় মামলা

Update Time : 01:35:12 pm, Monday, 7 September 2026


বড়লেখা প্রতিনিধি : বড়লেখায় বহুল আলোচিত গৃহবধূ মরিয়ম আক্তার মুন্নির (২২) মৃত্যুর ঘটনার ১৬ দিন পর অবশেষে স্বামী, শাশুড়ি, ননদ, ভাসুর ও জাসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে মামলা নিয়েছে থানা পুলিশ। শনিবার রাতে থানায় মামলাটি করেছেন নিহত মুন্নির মা মোছা. রেনু বেগম।

যৌতুকের পাঁচ লাখ টাকা ও ঋণের কিস্তির টাকা পরিশোধের জন্য দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের কারণে মুন্নি আত্মহত্যা করেছেন বলে মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে।

ঘটনার শুরুতে পুলিশের অপমৃত্যু মামলা গ্রহণ নিয়ে নিহতের স্বজনসহ বিভিন্ন মহলে সুরতহাল প্রতিবেদনকারি পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ওঠে। ২১ আগস্ট উপজেলার মুড়িরগুল এলাকায় শ্বশুরবাড়ি থেকে মুন্নির ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এই মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় নানা আলোচনা-সমালোচনা দেখা দেয়। মুন্নির মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটন, অভিযুক্তদের দ্রæত গ্রেফতার ও ন্যায় বিচার নিশ্চিতের দাবিতে সর্বস্তুরের জনসাধারণ সোচ্চার হন।

পরে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে মৃত্যুর কারণ আত্মহত্যা উঠে আসায় শনিবার রাতে (৫ সেপ্টেম্বর) মুন্নির শ্বাশুড়ি-ননদ, স্বামি, ভাসুরসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে মামলা নিয়েছে থানা পুলিশ। মামলায় আরো ৫/৬ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে। পুলিশ আসামিদের গ্রেফতারের জন্য অভিযান চালাচ্ছে।

এদিকে রোববার দুপুরে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবুল খায়ের ও বড়লেখা থানার ওসি মো. মনিরুজ্জামান খানসহ পুলিশ কর্মকর্তারা মুন্নির বাবা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি আব্দুল হাফিজ লালনসহ এলাকার মুরুব্বীদের নিয়ে মুন্নির শ্বশুড় বাড়ির ঘরের তালা ভেঙ্গে ভিতরে প্রবেশ করে তল্লাশি এবং লাশ উদ্ধারের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে মৃত্যুর আলামত ও মুন্নির ব্যবহৃত মোবাইল ফোন উদ্ধারের চেষ্টা চালান। এ সময় মুন্নীর আড়াই বছরের মেয়ে সকলের সামনে এসে আম্মা আম্মা বলে চিৎকার করতে থাকলে সেখানের পরিবেশ ভারি হয়ে উঠে। উল্লেখ্য ঘটনার পর থেকেই অভিযুক্তরা ঘরে তালা ঝুলিয়ে পালিয়ে গেেেছ।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, প্রায় চার বছর আগে উপজেলার মুড়িরগুল এলাকার মৃত ইয়াছিন আলীর ছেলে লাভলু আহমদের সঙ্গে ডিমাই এলাকার হাজী মকবুল আলীর মেয়ে মরিয়ম আক্তার মুন্নির বিয়ে হয়। তাদের আড়াই বছরের একটি মেয়ে রয়েছে। লাভলু বর্তমানে সৌদি আরবে থাকেন।

মুন্নির পরিবারের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই শ্বশুরবাড়ির লোকজন তার কাছে পাঁচ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করে আসছিলেন। ওই টাকা দিয়ে লাভলু সৌদি আরবে গাড়ি কিনবেন বলে মুন্নিকে চাপ দেওয়া হত। টাকা দিতে না পারায় তাকে বিভিন্ন সময় গালিগালাজ ও শারীরিক-মানসিক নির্যাতন করা হয়।

এজাহারে আরও বলা হয়েছে, শ্বশুরবাড়ির লোকজন মুন্নিকে বিভিন্ন ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠান থেকে টাকা তুলে দেওয়ার জন্য চাপ দিতেন। একপর্যায়ে মুন্নির বাবা জিম্মাদার হয়ে মুন্নির নামে একটি বেসরকারি ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠান থেকে পাঁচ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে দেন। পরে ওই ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলে মুন্নির ওপর আবারও চাপ সৃষ্টি করা হয়।

পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার দিন ২১ আগস্ট মুন্নিকে পিত্রালয় থেকে টাকা এনে ঋণের কিস্তি পরিশোধের জন্য চাপ দেওয়া হয়। তিনি টাকা এনে দিতে অপারগতা জানালে গালিগালাজ ও মারধর করা হয়। এ সময় নির্যাতনের কিছু অডিও পরিবারের সদস্যদের কাছে পাঠিয়েছিলেন মুন্নি। তার মায়ের দাবি, স্বামীর কাছ থেকেও ফোনে হুমকি ও মানসিক চাপ দেওয়া হতো।

পরে ওই দিন দুপুরের দিকে স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধি মুন্নির বাবাকে ফোন করে তার মৃত্যুর খবর দেন। পরিবারের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে মুন্নিকে বাথরুমে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান। খবর পেয়ে পুলিশ লাশ উদ্ধার ও ময়নাতদন্তের জন্য মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে পাঠায়। এর আগে মুন্নির বাবাকে দিয়ে অপমৃত্যু মামলা নেয় পুলিশ।

মুন্নির মা রেনু বেগমের অভিযোগ, মেয়ের লাশ গোসলের সময় তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। নির্যাতনের কথা জানিয়ে মুন্নির পাঠানো অডিও ও ভিডিও তাদের কাছে সংরক্ষিত আছে বলেও তিনি মামলায় উল্লেখ করেন। তার দাবি, স্বামীসহ শ্বশুরবাড়ির লোকজনের দীর্ঘদিনের নির্যাতন, মানসিক যন্ত্রণা ও আত্মহত্যায় প্ররোচনার কারণে মুন্নি এ পথ বেছে নেন।

থানার ওসি মো. মনিরুজ্জামান খান রোববার বিকেলে বলেন, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পরই মামলা দেওয়ার জন্য মুন্নির বাবাকে খবর পাঠান। রোববার রাতে মুন্নির মা থানায় মামলা করেছেন। আসামিদের গ্রেফতার ও মুন্নির ব্যবহৃত মোবাইল ফোন উদ্ধারের জন্য পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে।