12:31 am, Sunday, 9 August 2026

মৌলভীবাজারে খাল-বিলে মাছ ধরার উৎসব

এম এ ওয়াহিদ রুলু, কমলগঞ্জ থেকে:  চলমান মওসুম শুরু থেকেই মৌলভীবাজারের খাল-বিল, নদী-নালা, পুকুর-ডোবার পানি দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। সেই সঙ্গে গ্রামেগঞ্জে মাছ ধরার ধুম পড়েছে। প্রতিটি গ্রামগঞ্জেই এখন মাছ ধরার উৎসব চলছে। ভোর হতে না হতেই শুরু হয় মাছ ধরার পালা। শিশু-কিশোর ও বয়স্ক থেকে শুরু করে সকলেই মাছ ধরার উৎসবে মেতে উঠে। সকলেই উড়াইন্যা জাল, ঠ্যালা জাল, উইন্যা, পলো থালা-বাটি প্রভৃতি নিয়ে এবং শিশু-কিশোররা খালি হাতেই খালে-বিলে নেমে পড়ে। যেখানে হাঁটু পানি সেখানে সেচের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর মৎস্য শিকারীরা খালে-বিলে নামছে। বিকাল পর্যন্ত চলে মাছ ধরার এই প্রক্রিয়া। পরে নিজেদের পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে অতিরিক্ত মাছ হাটবাজারে বিক্রি করে দেয়।

সোমবার (১৭ জুলাই) বিকালে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার পৌর এলাকার বালিগাঁও গ্রামের একটা কৃষি জমিতে ট্রেটকার দিয়ে চাষাবাদ করা সময় ছোট বড় ১০-১৫ জন মিলে মাছ ধরছে। সেখানে দেশীয় প্রজাতির বিভিন্ন মাছ দেখা যায়।

একসময় খাল-বিল,পুকুর-ডোবা আর ক্ষেত-খাল শুকিয়ে এলে থালা-বাটি দিয়ে চলে সামান্য পানি সেচার কাজ। আর পুকুর-ডোবার পানি সেচা হয় পাম্প মেশিন দিয়ে। এরপর চলে মাছ ধরার উৎসব। রীতিমতো আনন্দ উল্লাস করে লোকজন পুকুর-ডোবা, খাল-বিলের শূন্য পানির কাদার ভেতরে হাত ঢুকিয়ে তুলে আনে একের পর এক মাছ। সেচ দেয়া পুকুরে চাষ করা মাছের পাশাপাশি পাওয়া যায় দেশীয় প্রজাতির বিভিন্ন মাছ। আর ডোবায় মেলে শোল, টাকি, পুঁটি, খলসে, কৈ, মাগুর, শিং, ট্যাংরাসহ দেশি প্রজাতির বিভিন্ন মাছ।

স্থানীয়রা জানান, প্রতি বছর বর্ষাকাল শেষ হলে পানি কমে গেলে এই এলাকার নিচু জমিগুলোতে এমন মাছ ধরার উৎসব চলে। সেই উৎসবে মাছ ধরায় মেতে উঠে নারী-পুরুষ, ছেলে-বুড়ো সবাই। কাদা পানিতে নেমে কে কতো বেশি মাছ ধরতে পারে, এই নিয়ে চলে অলিখিত প্রতিযোগিতা।

তারা আরো জানান, আগে এমন করে নানা জাতের দেশীয় মাছ প্রচুর ধরা গেলেও এখন আর সেদিন নেই। নেই মাছের সে প্রাচুর্য। প্রতিনিয়ত মাছের অভয়ারণ্য কমে যাওয়ায় আগের মতো জমে ওঠে না মাছ ধরার উৎসব। দেশীয় মাছের উৎসগুলো ক্রমেই যেন হারিয়ে যাচ্ছে।

এলাকার প্রবীণ ব্যক্তিরা জানান, দেশি কই, শিং, মাগুর, ভেদি, বায়লা, পাবদা, চিংড়ি ইত্যাদি মাছের প্রজননের সময় মা মাছেরা ডিম ছাড়ার জন্য বৃষ্টির পানিতে ভেসে গিয়ে ধান ক্ষেত, ডোবা, নালা, খাল-বিলে আশ্রয় নেয় এবং ডিম ছাড়ে। খাল, বিল, ডোবা, নালায় এখন ছোট বড় হরেক প্রজাতির দেশি মাছ বড় হয়ে ওঠার অপেক্ষায়। কিন্তু এলাকাগুলোতে ছোট ছোট জাল ও চাঁই (ফাঁদ) পেতে ছোট ছোট মাছসহ ডিমঅলা মাছগুলো ধরে অহরহ বিক্রি করছে হাট-বাজারে।

কমলগঞ্জ পৌর এলাকার সৌখিন মাছ শিকারী বুলবুল,মানিক ও হোসন মিয়া বলেন, একসময় অনেক মাছ পাওয়া গেলেও এখন একেবারেই কমে গেছে। বিভিন্ন বিলের নিচু এলাকায় ঘের তৈরি হওয়ায় মাছের আশ্রয়স্থল নষ্ট হয়ে গেছে। তাছাড়া আগের মতো পানি না হওয়ায় মাছ কম পাওয়া যায়।ধানী জমিতে বিষ প্রয়োগ, মা মাছ নিধনসহ বিভিন্ন কারণে মাছের প্রজনন কমে গিয়েছে। দেশীয় প্রজাতির এসব মাছ রক্ষায় বিভিন্ন বিলে অভয়াশ্রম তৈরি করা প্রয়োজন।

কমলগঞ্জ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. শহীদুর রহমান বলেন, মাছ ধরার উৎসব গ্রামগঞ্জের চিরচেনা ঐতিহ্য। শেষ করে বৈশাখ, জৈষ্ট আষাড় মাসে মাছ প্রজনন করে থাকে। এ জেলায় দেশীয় প্রজাতির মাছ পাওয়া যায় বেশি। তবে নদীতে বিষ প্রয়োগ,পানি কম হওয়াসহ নানা কারণে মাছের পরিমাণ কমে গেছে। তিনি আরোও বলেন, কেউ অবৈধ ভাবে নদীতে বা খালেবিলে মাছ শিকার করলে আমরা অভিযান করে জড়িমানা করছি।’

Tag :
About Author Information

Sirajul Islam

অরক্ষিত ‘হাকালুকি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র’চিকিৎসা বঞ্চিত হাওর পারের হতদরিদ্র বাসিন্দারা

মৌলভীবাজারে খাল-বিলে মাছ ধরার উৎসব

Update Time : 02:10:41 pm, Tuesday, 18 July 2023
এম এ ওয়াহিদ রুলু, কমলগঞ্জ থেকে:  চলমান মওসুম শুরু থেকেই মৌলভীবাজারের খাল-বিল, নদী-নালা, পুকুর-ডোবার পানি দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। সেই সঙ্গে গ্রামেগঞ্জে মাছ ধরার ধুম পড়েছে। প্রতিটি গ্রামগঞ্জেই এখন মাছ ধরার উৎসব চলছে। ভোর হতে না হতেই শুরু হয় মাছ ধরার পালা। শিশু-কিশোর ও বয়স্ক থেকে শুরু করে সকলেই মাছ ধরার উৎসবে মেতে উঠে। সকলেই উড়াইন্যা জাল, ঠ্যালা জাল, উইন্যা, পলো থালা-বাটি প্রভৃতি নিয়ে এবং শিশু-কিশোররা খালি হাতেই খালে-বিলে নেমে পড়ে। যেখানে হাঁটু পানি সেখানে সেচের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর মৎস্য শিকারীরা খালে-বিলে নামছে। বিকাল পর্যন্ত চলে মাছ ধরার এই প্রক্রিয়া। পরে নিজেদের পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে অতিরিক্ত মাছ হাটবাজারে বিক্রি করে দেয়।

সোমবার (১৭ জুলাই) বিকালে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার পৌর এলাকার বালিগাঁও গ্রামের একটা কৃষি জমিতে ট্রেটকার দিয়ে চাষাবাদ করা সময় ছোট বড় ১০-১৫ জন মিলে মাছ ধরছে। সেখানে দেশীয় প্রজাতির বিভিন্ন মাছ দেখা যায়।

একসময় খাল-বিল,পুকুর-ডোবা আর ক্ষেত-খাল শুকিয়ে এলে থালা-বাটি দিয়ে চলে সামান্য পানি সেচার কাজ। আর পুকুর-ডোবার পানি সেচা হয় পাম্প মেশিন দিয়ে। এরপর চলে মাছ ধরার উৎসব। রীতিমতো আনন্দ উল্লাস করে লোকজন পুকুর-ডোবা, খাল-বিলের শূন্য পানির কাদার ভেতরে হাত ঢুকিয়ে তুলে আনে একের পর এক মাছ। সেচ দেয়া পুকুরে চাষ করা মাছের পাশাপাশি পাওয়া যায় দেশীয় প্রজাতির বিভিন্ন মাছ। আর ডোবায় মেলে শোল, টাকি, পুঁটি, খলসে, কৈ, মাগুর, শিং, ট্যাংরাসহ দেশি প্রজাতির বিভিন্ন মাছ।

স্থানীয়রা জানান, প্রতি বছর বর্ষাকাল শেষ হলে পানি কমে গেলে এই এলাকার নিচু জমিগুলোতে এমন মাছ ধরার উৎসব চলে। সেই উৎসবে মাছ ধরায় মেতে উঠে নারী-পুরুষ, ছেলে-বুড়ো সবাই। কাদা পানিতে নেমে কে কতো বেশি মাছ ধরতে পারে, এই নিয়ে চলে অলিখিত প্রতিযোগিতা।

তারা আরো জানান, আগে এমন করে নানা জাতের দেশীয় মাছ প্রচুর ধরা গেলেও এখন আর সেদিন নেই। নেই মাছের সে প্রাচুর্য। প্রতিনিয়ত মাছের অভয়ারণ্য কমে যাওয়ায় আগের মতো জমে ওঠে না মাছ ধরার উৎসব। দেশীয় মাছের উৎসগুলো ক্রমেই যেন হারিয়ে যাচ্ছে।

এলাকার প্রবীণ ব্যক্তিরা জানান, দেশি কই, শিং, মাগুর, ভেদি, বায়লা, পাবদা, চিংড়ি ইত্যাদি মাছের প্রজননের সময় মা মাছেরা ডিম ছাড়ার জন্য বৃষ্টির পানিতে ভেসে গিয়ে ধান ক্ষেত, ডোবা, নালা, খাল-বিলে আশ্রয় নেয় এবং ডিম ছাড়ে। খাল, বিল, ডোবা, নালায় এখন ছোট বড় হরেক প্রজাতির দেশি মাছ বড় হয়ে ওঠার অপেক্ষায়। কিন্তু এলাকাগুলোতে ছোট ছোট জাল ও চাঁই (ফাঁদ) পেতে ছোট ছোট মাছসহ ডিমঅলা মাছগুলো ধরে অহরহ বিক্রি করছে হাট-বাজারে।

কমলগঞ্জ পৌর এলাকার সৌখিন মাছ শিকারী বুলবুল,মানিক ও হোসন মিয়া বলেন, একসময় অনেক মাছ পাওয়া গেলেও এখন একেবারেই কমে গেছে। বিভিন্ন বিলের নিচু এলাকায় ঘের তৈরি হওয়ায় মাছের আশ্রয়স্থল নষ্ট হয়ে গেছে। তাছাড়া আগের মতো পানি না হওয়ায় মাছ কম পাওয়া যায়।ধানী জমিতে বিষ প্রয়োগ, মা মাছ নিধনসহ বিভিন্ন কারণে মাছের প্রজনন কমে গিয়েছে। দেশীয় প্রজাতির এসব মাছ রক্ষায় বিভিন্ন বিলে অভয়াশ্রম তৈরি করা প্রয়োজন।

কমলগঞ্জ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. শহীদুর রহমান বলেন, মাছ ধরার উৎসব গ্রামগঞ্জের চিরচেনা ঐতিহ্য। শেষ করে বৈশাখ, জৈষ্ট আষাড় মাসে মাছ প্রজনন করে থাকে। এ জেলায় দেশীয় প্রজাতির মাছ পাওয়া যায় বেশি। তবে নদীতে বিষ প্রয়োগ,পানি কম হওয়াসহ নানা কারণে মাছের পরিমাণ কমে গেছে। তিনি আরোও বলেন, কেউ অবৈধ ভাবে নদীতে বা খালেবিলে মাছ শিকার করলে আমরা অভিযান করে জড়িমানা করছি।’