10:59 pm, Thursday, 8 October 2026

‘লালন কন্যা’ ফরিদা পারভীনের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

বিনোদন ডেস্ক

কিছু কণ্ঠ থেমে যায়, কিন্তু তাদের সুর থামে না। কিছু মানুষ চলে যান, অথচ তাদের গাওয়া গান হয়ে ওঠে সময়ের দীর্ঘশ্বাস, মানুষের হৃদয়ের আশ্রয়।

লালন সাঁইজির দর্শন আর মাটির মানুষের অনুভবকে কণ্ঠে ধারণ করে তেমনই এক অবিনশ্বর নাম ফরিদা পারভীন।
‘লালন কন্যা’ খ্যাত এই কিংবদন্তি লালনসংগীতশিল্পীর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী আজ (১৩ সেপ্টেম্বর)।

দীর্ঘদিন কিডনি জটিলতায় ভোগার পর ২০২৫ সালের এই দিনে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান তিনি।
শরীরের মৃত্যু হলেও তার কণ্ঠের মৃত্যু নেই।

‘খাঁচার ভিতর’, ‘বাড়ির কাছে আরশি নগর’ কিংবা ‘নিন্দার কাঁটা যদি না বিঁধিল গায়ে’- তার গাওয়া প্রতিটি গান আজও যেন বাংলার মাটি, মানুষ আর আত্মার সঙ্গে কথা বলে।
১৯৫৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর নাটোর জেলার সিংড়া থানার শাওল গ্রামে জন্ম ফরিদা পারভীনের।

জন্ম নাটোরে হলেও তার বেড়ে ওঠা কুষ্টিয়ায়। সংগীতের সঙ্গে তার সখ্যও তৈরি হয় শৈশবেই। মাগুরায় ওস্তাদ কমল চক্রবর্তীর কাছে গানের হাতেখড়ি। পরে কুষ্টিয়ার ওস্তাদ রবীন্দ্রনাথ রায়, মোতালেব বিশ্বাস ও ওসমান গণির কাছে দীর্ঘদিন ক্ল্যাসিক্যাল সংগীতের তালিম নেন। প্রায় ছয়-সাত বছর তানপুরার সঙ্গে সাধনা করার পর তার কণ্ঠে ধরা দেয় নজরুলসংগীতের সুর।
১৯৬৮ সালে রাজশাহী বেতারের তালিকাভুক্ত শিল্পী হিসেবে নজরুলসংগীত দিয়ে তার সংগীতজীবনের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু। কুষ্টিয়ার ওস্তাদ আবদুল কাদের ছিলেন তার নজরুলসংগীতের প্রথম গুরু। পরে মেহেরপুরের মীর মোজাফফর আলীর কাছেও তিনি নজরুলসংগীতের তালিম নেন। স্বরলিপি অনুসরণ করে হারমোনিয়ামে ও কণ্ঠে নজরুলের গান তোলার প্রথম পাঠও তার কাছ থেকেই।

তবে ফরিদা পারভীনের শিল্পীসত্তাকে যে সুর চিরকালের জন্য আলাদা পরিচয় দিয়েছে, তা হলো লালনের সুর। স্বাধীনতার পর কুষ্টিয়ায় থাকার সময় পারিবারিক বন্ধু গুরু মোকছেদ আলী সাঁইয়ের সংস্পর্শে আসেন ফরিদা। ১৯৭৩ সালে তার কাছেই ‘সত্য বল সুপথে চল’ গানটি শেখার মধ্য দিয়ে শুরু হয় লালন সাঁইজির গানের সঙ্গে তার গভীর আত্মিক সম্পর্ক। এরপর মোকছেদ আলী সাঁইয়ের মৃত্যুর পর খোদা বক্স সাঁই, ব্রজেন দাস, বেহাল সাঁই, ইয়াছিন সাঁই ও করিম সাঁইয়ের কাছ থেকেও লালনসংগীতের তালিম নেন তিনি।

লালনের গানকে শুধু গাওয়া নয়, বরং আত্মস্থ করেছিলেন ফরিদা পারভীন। তার কণ্ঠে লালনের দর্শন পেয়েছিল নতুন এক ব্যঞ্জনা। মাটির মানুষের সহজ ভাষা, জীবনবোধ, প্রেম, বিরহ আর আত্মঅন্বেষণের যে দর্শন লালনের গানে ছড়িয়ে আছে, ফরিদার কণ্ঠে তা যেন আরও মায়াময় হয়ে ধরা দিত।

তবে তার সংগীতের পরিধি শুধু লালনেই সীমাবদ্ধ ছিল না। আধুনিক, দেশাত্মবোধক ও চলচ্চিত্রের গানেও তিনি রেখে গেছেন স্বতন্ত্র স্বাক্ষর। ১৯৭৩ সালের দিকে দেশাত্মবোধক গান গেয়ে ব্যাপক পরিচিতি পান তিনি। তার কণ্ঠে ‘এই পদ্মা, এই মেঘনা, এই যমুনা-সুরমা নদীর তটে’ গানটি যেমন দেশপ্রেমের আবেগ জাগিয়েছে, তেমনি ‘তোমরা ভুলেই গেছো মল্লিকাদির নাম’, ‘নিন্দার কাঁটা যদি না বিঁধিল গায়ে প্রেমের কী সাধ আছে বলো’, ‘খাঁচার ভিতর’, ‘বাড়ির কাছে আরশি নগর’- এসব গান তাকে পৌঁছে দিয়েছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের শ্রোতার হৃদয়ে।

সংগীতে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিও পেয়েছেন বহুবার। অর্জন করেছেন একুশে পদক। ১৯৯৩ সালে সেরা প্লেব্যাক গায়িকা হিসেবে পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। ২০০৮ সালে জাপান সরকারের পক্ষ থেকে পেয়েছেন ফুকুওয়াকা এশিয়ান কালচার পুরস্কার।

শুধু নিজের কণ্ঠে লালনের গান বাঁচিয়ে রাখাই নয়, নতুন প্রজন্মের কাছে লালনের দর্শন ও সংগীত পৌঁছে দেওয়ারও চেষ্টা করেছেন তিনি। শিশুদের লালনসংগীত শেখাতে গড়ে তুলেছিলেন ‘অচিন পাখি স্কুল’।

আজ তার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। এক বছর হলো ফরিদা পারভীনের কণ্ঠ থেমেছে। কিন্তু থামেনি তার গান। বাংলার বাতাসে, নদীর জলে, মাটির গন্ধে আর মানুষের হৃদয়ের গভীরে এখনও বেজে ওঠে তার কণ্ঠ।

ফরিদা পারভীন নেই তবু তার গান আছে। তার গান আছে বলেই হয়তো তিনি নেই হয়েও আছেন। লালনের সুরে, মাটির মানুষের ভালোবাসায়- ফরিদা পারভীন বেঁচে থাকবেন আরও প্রজন্মের পর প্রজন্ম।

Tag :
About Author Information

Sirajul Islam

মৌলভীবাজারে শহরের ১৪টি পূজা মণ্ডপে অনুদানের চেক বিতরণ

‘লালন কন্যা’ ফরিদা পারভীনের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

Update Time : 07:44:50 am, Sunday, 13 September 2026

বিনোদন ডেস্ক

কিছু কণ্ঠ থেমে যায়, কিন্তু তাদের সুর থামে না। কিছু মানুষ চলে যান, অথচ তাদের গাওয়া গান হয়ে ওঠে সময়ের দীর্ঘশ্বাস, মানুষের হৃদয়ের আশ্রয়।

লালন সাঁইজির দর্শন আর মাটির মানুষের অনুভবকে কণ্ঠে ধারণ করে তেমনই এক অবিনশ্বর নাম ফরিদা পারভীন।
‘লালন কন্যা’ খ্যাত এই কিংবদন্তি লালনসংগীতশিল্পীর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী আজ (১৩ সেপ্টেম্বর)।

দীর্ঘদিন কিডনি জটিলতায় ভোগার পর ২০২৫ সালের এই দিনে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান তিনি।
শরীরের মৃত্যু হলেও তার কণ্ঠের মৃত্যু নেই।

‘খাঁচার ভিতর’, ‘বাড়ির কাছে আরশি নগর’ কিংবা ‘নিন্দার কাঁটা যদি না বিঁধিল গায়ে’- তার গাওয়া প্রতিটি গান আজও যেন বাংলার মাটি, মানুষ আর আত্মার সঙ্গে কথা বলে।
১৯৫৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর নাটোর জেলার সিংড়া থানার শাওল গ্রামে জন্ম ফরিদা পারভীনের।

জন্ম নাটোরে হলেও তার বেড়ে ওঠা কুষ্টিয়ায়। সংগীতের সঙ্গে তার সখ্যও তৈরি হয় শৈশবেই। মাগুরায় ওস্তাদ কমল চক্রবর্তীর কাছে গানের হাতেখড়ি। পরে কুষ্টিয়ার ওস্তাদ রবীন্দ্রনাথ রায়, মোতালেব বিশ্বাস ও ওসমান গণির কাছে দীর্ঘদিন ক্ল্যাসিক্যাল সংগীতের তালিম নেন। প্রায় ছয়-সাত বছর তানপুরার সঙ্গে সাধনা করার পর তার কণ্ঠে ধরা দেয় নজরুলসংগীতের সুর।
১৯৬৮ সালে রাজশাহী বেতারের তালিকাভুক্ত শিল্পী হিসেবে নজরুলসংগীত দিয়ে তার সংগীতজীবনের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু। কুষ্টিয়ার ওস্তাদ আবদুল কাদের ছিলেন তার নজরুলসংগীতের প্রথম গুরু। পরে মেহেরপুরের মীর মোজাফফর আলীর কাছেও তিনি নজরুলসংগীতের তালিম নেন। স্বরলিপি অনুসরণ করে হারমোনিয়ামে ও কণ্ঠে নজরুলের গান তোলার প্রথম পাঠও তার কাছ থেকেই।

তবে ফরিদা পারভীনের শিল্পীসত্তাকে যে সুর চিরকালের জন্য আলাদা পরিচয় দিয়েছে, তা হলো লালনের সুর। স্বাধীনতার পর কুষ্টিয়ায় থাকার সময় পারিবারিক বন্ধু গুরু মোকছেদ আলী সাঁইয়ের সংস্পর্শে আসেন ফরিদা। ১৯৭৩ সালে তার কাছেই ‘সত্য বল সুপথে চল’ গানটি শেখার মধ্য দিয়ে শুরু হয় লালন সাঁইজির গানের সঙ্গে তার গভীর আত্মিক সম্পর্ক। এরপর মোকছেদ আলী সাঁইয়ের মৃত্যুর পর খোদা বক্স সাঁই, ব্রজেন দাস, বেহাল সাঁই, ইয়াছিন সাঁই ও করিম সাঁইয়ের কাছ থেকেও লালনসংগীতের তালিম নেন তিনি।

লালনের গানকে শুধু গাওয়া নয়, বরং আত্মস্থ করেছিলেন ফরিদা পারভীন। তার কণ্ঠে লালনের দর্শন পেয়েছিল নতুন এক ব্যঞ্জনা। মাটির মানুষের সহজ ভাষা, জীবনবোধ, প্রেম, বিরহ আর আত্মঅন্বেষণের যে দর্শন লালনের গানে ছড়িয়ে আছে, ফরিদার কণ্ঠে তা যেন আরও মায়াময় হয়ে ধরা দিত।

তবে তার সংগীতের পরিধি শুধু লালনেই সীমাবদ্ধ ছিল না। আধুনিক, দেশাত্মবোধক ও চলচ্চিত্রের গানেও তিনি রেখে গেছেন স্বতন্ত্র স্বাক্ষর। ১৯৭৩ সালের দিকে দেশাত্মবোধক গান গেয়ে ব্যাপক পরিচিতি পান তিনি। তার কণ্ঠে ‘এই পদ্মা, এই মেঘনা, এই যমুনা-সুরমা নদীর তটে’ গানটি যেমন দেশপ্রেমের আবেগ জাগিয়েছে, তেমনি ‘তোমরা ভুলেই গেছো মল্লিকাদির নাম’, ‘নিন্দার কাঁটা যদি না বিঁধিল গায়ে প্রেমের কী সাধ আছে বলো’, ‘খাঁচার ভিতর’, ‘বাড়ির কাছে আরশি নগর’- এসব গান তাকে পৌঁছে দিয়েছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের শ্রোতার হৃদয়ে।

সংগীতে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিও পেয়েছেন বহুবার। অর্জন করেছেন একুশে পদক। ১৯৯৩ সালে সেরা প্লেব্যাক গায়িকা হিসেবে পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। ২০০৮ সালে জাপান সরকারের পক্ষ থেকে পেয়েছেন ফুকুওয়াকা এশিয়ান কালচার পুরস্কার।

শুধু নিজের কণ্ঠে লালনের গান বাঁচিয়ে রাখাই নয়, নতুন প্রজন্মের কাছে লালনের দর্শন ও সংগীত পৌঁছে দেওয়ারও চেষ্টা করেছেন তিনি। শিশুদের লালনসংগীত শেখাতে গড়ে তুলেছিলেন ‘অচিন পাখি স্কুল’।

আজ তার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। এক বছর হলো ফরিদা পারভীনের কণ্ঠ থেমেছে। কিন্তু থামেনি তার গান। বাংলার বাতাসে, নদীর জলে, মাটির গন্ধে আর মানুষের হৃদয়ের গভীরে এখনও বেজে ওঠে তার কণ্ঠ।

ফরিদা পারভীন নেই তবু তার গান আছে। তার গান আছে বলেই হয়তো তিনি নেই হয়েও আছেন। লালনের সুরে, মাটির মানুষের ভালোবাসায়- ফরিদা পারভীন বেঁচে থাকবেন আরও প্রজন্মের পর প্রজন্ম।