:শরীফ আহমেদ:
ঈদ মানেই ঘরে ফেরা, নাড়ীর টানে, প্রিয়জনের কাছে ফিরে যাওয়ার অদম্য আকুলতা। কিন্তু সেই আনন্দযাত্রাই প্রতি বছর রূপ নেয় এক অদৃশ্য মৃত্যুফাঁদে। এবারের ঈদযাত্রাও তার ব্যতিক্রম নয়; বরং সড়কের পাশাপাশি রেল ও নৌপথে দুর্ঘটনার বাড়তি ঝুঁকি পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।
তথ্য অনুযায়ী, শুধু সড়কেই নয়, রেল ও নৌ-পথ মিলিয়ে মোট ৩৭৭টি দুর্ঘটনায় ৩৯৪ জন নিহত এবং ১২৮৮ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে রেলপথে ২৩টি দুর্ঘটনায় ৩৫ জন এবং নৌ-পথে ৮টি দুর্ঘটনায় ৮ জন নিহত হয়েছেন। নিখোঁজ রয়েছেন ৩ জন। এছাড়া জাতীয় অর্থোপেডিক (পঙ্গু) হাসপাতালে এ সময়ে ভর্তি হয়েছেন ২ হাজার ১৭৮ জন।তথ্য নিয়ে আরও জানা যায়, ২০২৫ সালের ঈদুল ফিতরে ৩১৫টি দুর্ঘটনায় ৩২২ জন নিহত এবং ৮২৬ জন আহত হয়েছিলেন। সেই তুলনায় এবার প্রাণহানি বেড়েছে ৮.২৬ শতাংশ এবং আহতের সংখ্যা বেড়েছে ২১.০৫ শতাংশ। পরিস্থিতি কতটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো,এই দুর্ঘটনাগুলোর বড় অংশেই নিহত হচ্ছেন তরুণ ও কর্মক্ষম মানুষ, যারা একটি পরিবার ও সমাজের ভবিষ্যৎ বহন করতেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে,এই সংকট কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার ফল। অতিরিক্ত গতি, অদক্ষ ও ক্লান্ত চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অপরিকল্পিত সড়ক ব্যবস্থাপনা- সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক ঝুঁকিপূর্ণ পরিবহন বাস্তবতা।
বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষকদের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, শুধু সড়ক নয়; রেলক্রসিংয়ের নিরাপত্তাহীনতা এবং নৌপথে তদারকির ঘাটতিও এখন বড় হুমকি। অনেক স্থানে গেটম্যান নেই, সিগন্যাল অমান্য করা হয়, আবার কোথাও রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি প্রকট। ফলে ছোট একটি ভুলও মুহূর্তেই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় রূপ নেয়।

চালকের সংকট ও অতিরিক্ত কাজের চাপও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। পর্যাপ্ত বিশ্রাম ছাড়াই দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানো, যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতা এবং আয়ের চাপ- এসবই চালকদের ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে। এর সঙ্গে যোগ হয় দুর্বল মনিটরিং ও আইনের শিথিল প্রয়োগ, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
বিশ্লেষকদের মতে, সমস্যার মূল জায়গা হলো সমন্বয়হীনতা ও দায়বদ্ধতার অভাব। ঈদকে কেন্দ্র করে যাত্রীচাপ বাড়লেও সেই অনুযায়ী পরিকল্পনা, যানবাহন ব্যবস্থাপনা, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয় না। ফলে পুরো ব্যবস্থায় তৈরি হয় বিশৃঙ্খলা, যার মাশুল দিতে হয় সাধারণ মানুষকে। রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে সাম্প্রতিক দুর্ঘটনা তার একটি নির্মম উদাহরণ। একটি বাস নদীতে পড়ে অন্তত ২৫-২৬ জনের প্রাণহানি ঘটে। ফেরি ভেড়ার সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা, যথাযথ তদারকির অভাব এবং দায়িত্বে অবহেলা; সব মিলিয়ে একটি প্রতিরোধযোগ্য দুর্ঘটনা মর্মান্তিক ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়েছে।
প্রশ্নটা এখন শুধু দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান নয়, প্রশ্নটা দায়বদ্ধতার। প্রতিবছর একই চিত্র,একই শোক,একই প্রতিশ্রুতি.. কিন্তু কার্যকর পরিবর্তন কোথায়?
সরকারের একাধিক বিভাগ, বিপুল বাজেট ও পর্যাপ্ত জনবল থাকা সত্ত্বেও কেন একটি উৎসবের সময়ে মানুষের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা যায় না? এই প্রশ্ন এখন জনমনে গভীরভাবে নাড়া দিচ্ছে। দুর্যোগ তো প্রতিদিন ঘটে না; বরং এটি একটি পূর্বানুমেয় সময়কাল। তবুও প্রস্তুতির অভাব কেন থেকে যায়? বাস্তবতা হলো, ব্যবস্থার ফাঁক গলে সুবিধাভোগীরা ঠিকই রয়ে যায় নিরাপদে, কিন্তু সাধারণ মানুষকে দিতে হয় জীবনের মূল্য। ঈদের আনন্দ তাই অনেক পরিবারের কাছে পরিণত হয় চিরস্থায়ী শোকে।
সমাধান একদিনে সম্ভব নয়, তবে কার্যকর উদ্যোগ এখনই নিতে হবে। প্রথমত, ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো ধরনের শিথিলতা চলবে না। দ্বিতীয়ত, চালকদের প্রশিক্ষণ, লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া ও বিশ্রামের বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে। তৃতীয়ত, রেলক্রসিং ও নৌপথে আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি। চতুর্থত, প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং ও সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থাপনা চালু করতে হবে, যাতে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়।
এ ছাড়া জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং পরিবহন খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ঈদ আনন্দের উৎসব। এটি কখনোই শোকের কারণ হতে পারে না। নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি মানুষের মৌলিক অধিকার। এখন সময় এসেছে প্রতিশ্রুতি নয়, কার্যকর পদক্ষেপ দেখানোর, যাতে আগামী ঈদে ঘরে ফেরা মানে শুধু আনন্দই হয়, মৃত্যুভয় নয়।
লেখক: সাংবাদিক

নিজস্ব প্রতিবেদক 
























