মতিন বকশ : গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার ও জনগণেরমধ্যকার জবাবদিহিতা হলো সুশাসনের মূলভিত্তি। সরকার তার গৃহীত নীতি, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এবং ব্যয়ের জন্য জনগণের (সংসদের মাধ্যমে) কাছে দায়বদ্ধ থাকে। অন্যদিকে, জনগণ ভোট, মতামত প্রকাশ, আইন মান্য করা এবং সচেতন অংশগ্রহণের মাধ্যমে সরকারকে জবাবদিহিতার আওতায় আনে।
সরকারের জবাবদিহিতার বিস্তারিত:
- সংসদীয় জবাবদিহিতা: মন্ত্রীরা আইনসভার (সংসদ) কাছে তাদের কাজের জন্য জবাব দিতে বাধ্য থাকেন [১০]।
- নির্বাচন ও ভোটাধিকার: প্রতি ৫ বছর পর বা নির্দিষ্ট মেয়াদে জনগণের ভোটে সরকার পুনর্নির্বাচিত বা প্রত্যাখ্যাত হয়, যা সবচেয়ে বড় জবাবদিহিতা।
- আইনের শাসন ও বিচার বিভাগ: সরকার আইনের ঊর্ধ্বে নয়, তাই ভুল সিদ্ধান্তের জন্য বিচার বিভাগের কাছে জবাবদিহি করতে হয়।
- তথ্য অধিকার: নাগরিকরা তথ্য অধিকার আইনের মাধ্যমে সরকারের কাজের স্বচ্ছতা যাচাই করতে পারে।
- গণমাধ্যম: পত্রিকা ও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে সরকার বিভিন্ন সমালোচনার মুখোমুখি হয় ও জবাব দিতে বাধ্য হয় [৭]।
জনগণের জবাবদিহিতা ও দায়িত্ব: - ভোটের সঠিক প্রয়োগ: যোগ্য প্রতিনিধি নির্বাচন করা জনগণের প্রধান দায়িত্ব।
- আইন মান্য করা: নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রীয় আইন ও নিয়মকানুন মেনে চলা।
- ট্যাক্স দেওয়া: নিয়মিত কর প্রদান করে সরকারি কাজে সহযোগিতা করা।
- সচেতন অংশগ্রহণ: সরকারের ভুলনীতি নিয়ে গঠনমূলক সমালোচনা করা ও প্রতিবাদ জানানো।
জবাবদিহিতার অভাবের কারণ (বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট): - দুর্বল বিরোধী দল: শক্তিশালী বিরোধী দলের অভাবে সংসদের জবাবদিহিতা হ্রাস পায়।
- প্রশাসনিক জটিলতা: আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় স্বচ্ছতা কমে যায়।
- সচেতনতার অভাব: জনগণের অনীহা বা স্বার্থপরতা অনেক সময় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে না। সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকার ও জনগণ উভয়েরই পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা আবশ্যক। পৃথিবীর সব দেশেই কমবেশি দুর্নীতি রয়েছে। লোভ ও অতিরিক্ত ভোগের আকাক্সক্ষা থেকেই দুর্নীতির উৎপত্তি হয়। সমাজ ও মনোবিজ্ঞানীদের মতে, ব্যক্তিগত লাভের জন্য সরকারি দায়িত্ব পালনের বিধিবিধান ও কর্তব্য থেকে বিচ্যুত হয়ে কাউকে কোনো সুবিধা দেওয়া হলো দুর্নীতি। দুর্নীতি শুধু সরকারি অফিসে সীমাবদ্ধ নেই। সমাজের প্রতিটি স্তরে দুর্নীতি বাসা বেঁধেছে। শুধু অভাবের তাড়নায় মানুষ দুর্নীতি করে এটি সত্য নয়। বিত্তশালী কর্মকর্তা বা ব্যক্তি আরো অর্থ-সম্পদের জন্য দুর্নীতি করে। মানুষের মধ্যে নীতিনৈতিকতার ঘাটতি হলেই দুর্নীতি জেঁকে বসে। একইসঙ্গে রয়েছে মিথ্যাচার,প্রতারণা,পরনিন্দা,স্বার্থপরতা, পরশ্রীকাতরতা ও অসততার দুর্নাম। এ ছাড়া লোকমুখে যেসব অভিযোগ সচরাচর শোনা যায় সেগুলো হলো সরকারি অফিসে তদবির না করলে কাজ হয় না। ব্যবসায়ী-শিল্পপতিরা অতিমুনাফাখোর, বিশেষ বিশেষ আইন প্রয়োগকারী সংস্থায় কোনো কার্যোপলক্ষে টাকা না দিলে ন্যায্য কাজ তো হবেই না, বরং অহেতুক হয়রানির সম্মুখীন হতে হয়। দেশে দুর্নীতির ব্যাপ্তি দেখে স্বাভাবিক ভাবেই ধারণা হতে পারে, আমাদের গোড়ায় গলদ রয়েছে। আমরা বিদেশি ঔপনিবেশিক শাসন, স্বৈরাচার, একনায়ক কর্তৃক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শাসিত হয়েছি। নীতি নৈতিকতার শিক্ষায় আমাদের রয়েছে বিরাট ঘাটতি। কী পরিবার, কী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কী সমাজ-কোথাও সততা ও নীতিনৈতিকতা-কে ১ নম্বর অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনায় নেওয়া হয় না। এমনকি ব্যবসা-বাণিজ্যে ওজনে কম দেওয়া, অতিমুনাফাখোরি, খাদ্য ও ব্যবহৃত দ্রব্যাদিতে ভেজাল দেওয়া, কর ও ভ্যাট ফাঁকি তো নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে সঠিকভাবে পাঠদান না করানো, হাসপাতালে অতিরিক্ত ফি আদায় ও ভুল চিকিৎসা, ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎ, মিথ্যা তথ্য দিয়ে ব্যাংকঋণ গ্রহণ।মানি লটারিং ইত্যাদি। শুধু তাই নয়, দুর্নীতি দেশের সামাজিক পরিবেশ, রাজনীতি ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি নষ্ট করে। দেশে বৈষম্য বাড়ে। সব ক্ষেত্রে ক্ষমতাশালীদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে আমজনতা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দুর্নীতিবাজরা নির্দ্বিধায় দেশের সম্পদ লুণ্ঠন করে বিদেশে অর্থ পাচার করছে। দেশের ভবিষ্যতের জন্য এসবই অশুভ লক্ষণ। দুর্নীতি প্রতিরোধে আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সৎ ও যোগ্যদের যথাস্থানে বসিয়ে তাদের সঙ্গে নিয়ে সরকারকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠিন অবস্থান নিতে হবে। জনগণকেও এ ব্যাপারে সরকারকে সহযোগিতা করার জন্য এগিয়ে আসতে হবে। সত্যি বলতে কী, দুর্নীতি নিয়ে প্রতিষ্ঠান গুলো সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। দুদক বড় দুর্নীতি নিয়ে কাজ করতে পারে না। পুলিশ, র্যাব এবং সাংবাদিকরা যে বিষয়গুলো বের করে আনে সেগুলো নিয়ে দুদক কাজ করে। আইনের বাস্তবায়ন নেই বলে মানুষ দুর্নীতি করার সুযোগ পায় এবং জনগণ তার আয়ের হিসাব বা করের তথ্য ঠিকভাবে দেয় না এবং এটা আদায়ে তেমন জোরদার ব্যবস্থা নেই। দুর্নীতি দমন করার মূল উপায়গুলো খতিয়ে দেখতে হবে। যেমন : রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকতে হবে-এটা শুধু কাগজে-কলমে থাকলে চলবে না, বাস্তবে থাকা প্রয়োজন। কারো প্রতি কোনো ধরনের ভয়ভীতি প্রদর্শন না করে এটা থাকতে হবে। দেশের শীর্ষপর্যায় থেকে শুরু করে একেবারে নিম্নপর্যায় পর্যন্ত এর প্রয়োগ থাকতে হবে। আইনের প্রয়োগ থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে যারা বিচারের আওতায় আসবে তাদের আইন অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। আইন সবার জন্য সমান হবে। কোনো রকম প্রভাব বা হস্তক্ষেপ ছাড়াই অপরাধীদের বিচার করতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক সামর্থ্য থাকতে হবে-দুর্নীতি দমনে যেসব প্রতিষ্ঠান কাজ করছে সেসব প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা থাকতে হবে।
সাধারণ অর্থে নীতিহীনতাকে দুর্নীতি হিসেবে অভিহিত করা হলেও রাষ্ট্রীয় পরিমণ্ডলে সুশাসনের অভাবকে দুর্নীতি বোঝায়। এক্ষেত্রে আর্থিক অনিয়ম, অপচয়, সরকারি অফিসে ঘুসের বিনিময়ে সেবা প্রাপ্তি ইত্যাদি অভিযোগের পাশাপাশি স্বজনপ্রীতি, আইন প্রয়োগে ঘাটতি এবং নাগরিক সুবিধা নিশ্চিতে জবাবদিহির ঘাটতি থাকলে তা দুর্নীতির আওতায় পড়ে। তবে দুর্নীতি সমাজের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লেও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্নীতির জন্য বেশি দায়ী করা হয়।কেননা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান গুলো জনগণের প্রদত্ত করের টাকায় পরিচালিত হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে জনগণের কাছে দায়বদ্ধতার বিষয়টি থাকায় আন্তর্জাতিকভাবেও রাষ্ট্রগুলোর সরকারি প্রতিষ্ঠান পরিচালনাসংক্রান্ত স্বচ্ছতার বিষয়ে জোর দেয়া হয়।জবাবদিহিতা সুশাসনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সুশাসনে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি নাগরিক সেবাদান- কারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতাকেও অন্তর্ভুক্ত করে। জবাবদিহিতা বলতে বোঝায় দায়বদ্ধতার প্রতিশ্রুতি ও দায়-দায়িত্বের স্বীকারোক্তি। জবাবদিহিতার সঙ্গে মানবাধিকার যুক্ত। জবাবদিহিতার মাধ্যমে গড়ে ওঠে রাষ্ট্র,প্রশাসন ও জনগণেরমধ্যে নিবিড় আন্তঃসম্পর্ক বাংলাদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতার অভাবের জন্য দায়ী কিছু বিষয় আছে। এগুলো হলো প্রশাসনিক জটিলতা, দুর্বল সংসদ, অনুন্নত রাজনৈতিক দল, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার অভাব এবং দুর্বল নির্বাচন ব্যবস্থা। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময় থেকে এ পর্যন্ত কয়েকটি সংসদে কোনো শক্তিশালী বিরোধী দল ছিল না। এ কারণে সংসদ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারছে না। স্বৈরশাসনও জবাবদিহিতার সংস্কৃতিতে আঘাত হেনেছে। তাছাড়া আমলারা অনেক সময় জনগণের সামনে সত্য তথ্য প্রচার করতে চায় না।তাই প্রবল নজরধারী অত্যান্ত প্রোয়জন মনে করি। দায়িত্ব নেওয়া সরকার আশাকরি জনগোষ্ঠীর কল্যাণে কাজ করে সুশাসন নিশ্চিত করবে ইনশাআল্লাহ।
মতিন বকশ
সমাজকর্মী এবং সাংবাদিক।

নিজস্ব প্রতিবেদক 


























