জামাল হোসেন তারেক : বাংলাদেশের উত্তর–পূর্ব সীমান্তঘেঁষা মৌলভীবাজার জেলার সবচেয়ে বড় ও ঐতিহাসিক উপজেলা কুলাউড়া—মনু নদী, হাকালুকি হাওর ও সবুজ টিলার ছোঁয়ায় সমৃদ্ধ। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জনপদ আজও উন্নয়নের মানচিত্রে যেন “অপেক্ষমাণ তালিকায়” পড়ে আছে।
১৮৭৫ সালে থানা হিসেবে আত্মপ্রকাশ এবং ১৯৮২ সালে উপজেলা প্রতিষ্ঠার পর শত বছরেরও বেশি প্রশাসনিক ইতিহাসে কুলাউড়ার অর্জনের তালিকা হাতে গোনা। অথচ ব্রিটিশরা যখন এই অঞ্চলে আসে, তখন তারা রেললাইন বসিয়েছিল, চা বাগান গড়েছিল, বানিয়েছিল অর্থনীতির প্রাণচক্র। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের ৫০ বছর পরও এই জনপদের উন্নয়নের রেলগাড়ি প্ল্যাটফর্মে ঢুকতে পারেনি—কারণ একটাই, নেতৃত্বের অভাব।
১৮৯৬ সালে ব্রিটিশরা কুলাউড়ার উপর দিয়ে রেললাইন স্থাপন করে, তখন থেকেই এটি বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। টিলাময় জমি ও মনোরম জলবায়ু দেখে ব্রিটিশ প্ল্যান্টাররা একে চা শিল্পের রাজধানী বানাতে চেয়েছিল। তখনকার চা, কাঠ, মাছ ও কৃষিপণ্য এখান থেকেই এক্সপোর্ট হতো। আজও সেই রেললাইন, হাওর ও চা-বাগান আছে—কিন্তু নেই উন্নয়নের “চা”। রেল চলে, কিন্তু উন্নয়ন থেমে আছে।
মৌলভীবাজার-২ (কুলাউড়া) আসনে ১৯৮৬ সাল থেকে একাধিক সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। দল বদলেছে, প্রতিশ্রুতি পাল্টেছে—কিন্তু উন্নয়নের চিত্র একই রয়ে গেছে, যেন “ভোটের পর ভোলার খাতায়”।
২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে কুলাউড়ায় কিছুটা উন্নয়নের ছোঁয়া লাগলেও পরবর্তী সময়ে সেই চিত্র থেমে যায়। এরপর কুলাউড়ায় “মহাজন” বদলেছে, কিন্তু ভাগ্যের পরিবর্তন থেমে আছে।
১৯৮৪ সালের আগে সিলেট-১৩ আসন হিসেবে কুলাউড়ার সাংসদ ছিলেন আব্দুল মুত্তাকিম, যিনি বেশ কিছু উন্নয়নমূলক কাজ করেন। পরবর্তীতে আব্দুর জব্বার এই আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
তিনি ছিলেন ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা, ১৯৭০ সালের নির্বাচন ও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও যোদ্ধা। কুলাউড়াবাসীর মুখে এখনো গল্প শোনা যায়—এই সেই এমপি যিনি জমিতে হাল চাষের পর সংসদে যেতেন! সাধারণ মানুষ যখন প্রয়োজনে তার কাছে যেতেন, তখনও তাকে কৃষিজমিতে কাজে পাওয়া যেত। তাঁর জনপ্রিয়তা ও কর্মীসমর্থন ছিল তুলনাহীন।
১৯৮৬ সালে এ. এন. এম. ইউসুফ বাংলাদেশ মুসলিম লীগের ব্যানারে নির্বাচিত হয়ে শিক্ষা ও সামাজিক খাতে অবদান রাখেন। এরপর ১৯৮৮ ও ১৯৯১ সালে টানা দুইবার জাতীয় পার্টির নবাব আলী আব্বাছ খান বিজয়ী হন। তাঁর আমলে কুলাউড়ার সড়ক, অবকাঠামো ও সামাজিক উন্নয়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি ঘটে।
১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপির তরুণ নেতা এম. এম. শাহীন নির্বাচিত হলেও একই বছরের জুনে আওয়ামী লীগের সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ পুনরায় আসনটি দখল করেন। তৎকালীন সরকারের উচ্চপর্যায়ে তার শক্তিশালী যোগাযোগের কারণে ১৯৯৬–২০০১ মেয়াদে কুলাউড়ায় ব্যাপক উন্নয়ন হয়।
২০০১ সালে এম. এম. শাহীন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জয়ী হন। সাংবাদিক ও প্রশাসনিক মহলে সম্পর্ক থাকায় তিনিও উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন।
২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির নবাব আলী আব্বাছ খান তৃতীয়বারের মতো বিজয়ী হলেও এরপর থেকেই কুলাউড়ার উন্নয়নের রেলগাড়ি থেমে যেতে থাকে।
পরবর্তীতে ২০১৪ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী আব্দুল মতিন, ২০১৮ সালে গণফোরাম (ঐক্যফ্রন্ট)-এর প্রার্থী সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগের শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল নির্বাচিত হন। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ছয় মাসের মাথায় সংসদ ভেঙে যাওয়ায় তাঁর কার্যকাল সংক্ষিপ্ত হয়।
২০০৮-এর পর শুরু হয় “বক্তৃতা-নির্ভর উন্নয়ন যুগ”—যেখানে পরিকল্পনার চেয়ে পোস্টার বেশি, কাজের চেয়ে কথার জোরই বড়।
এমপি আসে, কাজ নয়—আশা দেয়।
এক তরুণের ভাষায়, “কুলাউড়ায় এখন রাজনীতি মানে উন্নয়নের স্লোগান আর স্বার্থের হিসাব। জনগণের সমস্যা নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই।”
কুলাউড়া এখন শুধু ভোটের মাঠ, উন্নয়নের মাঠ নয়।
জুড়ীতে নতুন সেতু, বড়লেখায় পর্যটন উন্নয়ন প্রকল্প, রাজনগরে কৃষি সম্প্রসারণ—কিন্তু কুলাউড়ায়? এখনও কাঁচা রাস্তায় ধুলো উড়ে, পৌর শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যবস্থা ‘ঔষধ শেষ’ সাইনবোর্ডে সীমাবদ্ধ। তরুণদের কর্মসংস্থান নেই, সংস্কৃতি কেন্দ্র বা লাইব্রেরি নেই—শুধু আছে প্রতিশ্রুতির স্তুপ।
প্রতি নির্বাচনে কুলাউড়ার মাঠে যেন এমপি প্রার্থীর বন্যা বয়ে যায়। যাদের রাজনৈতিক পরিচয় এলাকাবাসী কখনো শোনেনি, তারাও “নেতা” পরিচয়ে ব্যানার টানান। যোগ্যতা থাকুক বা না থাকুক, প্রতি নির্বাচনে কয়েক ডজন “ভবিষ্যৎ এমপি” ভোটের আশায় নামে। ফলে কুলাউড়ার নির্বাচন পরিণত হয় এক রাজনৈতিক কৌতুক উৎসবে—যেখানে ভোটাররা হাসেন, সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন, আর প্রার্থীরা হন সেই হাসির পাত্র।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেন, “এখানকার অনেক নেতা জনগণের জন্য নয়, নিজের আখের গোছাতে রাজনীতি করেন। ভোটের সময় হাত পেতে ভোট চান, কিন্তু জিতে গেলে জনগণকে ভুলে যান।”
তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। মাঠে নেমেছে Gen Z—সচেতন তরুণ ভোটাররা। তারা জানে কে উন্নয়ন করবে, আর কে শুধু বুলি আওড়াবে। এই প্রজন্ম রাজনীতির মুখোশধারী নেতাদের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হতে যাচ্ছে। যারা বছর বছর দল পাল্টে পল্টিবাজিতে অভ্যস্ত, যারা ভোটের আগে অভিনয় করে জনগণের দরজায় যায়—তাদের সময় ফুরিয়ে আসছে।
বিশ্লেষকদের মতে, “এই নির্বাচনে কথার বুলি নয়, কাজের ইতিহাসই নির্ধারণ করবে কুলাউড়ার ভবিষ্যৎ।” তরুণরা এখন বুঝে গেছে—উন্নয়ন মানে শুধু ফিতা কাটা নয়, বরং বাস্তব পরিবর্তন।
তরুণ প্রজন্ম এখন এমন নেতা চায় না, যারা শুধু নিজেদের আখের গুছাতে ব্যস্ত। তারা চায় সাইফুর রহমান, আব্দুর রহমান, এম. ইলিয়াস আলী কিংবা এম. এস. কিবরিয়ার মতো নিবেদিতপ্রাণ নেতৃত্ব—যারা কাজ করেন মানবতার জন্য, দেশ ও সমাজের কল্যাণে। তারা সেই নেতাদের স্বপ্ন দেখে, যারা জনগণের স্বার্থে, দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে হাসিমুখে মৃত্যুকেও আলিঙ্গন করতে পারেন; কিন্তু জনগণের আস্থা, ভোট ও দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে এক ইঞ্চিও পিছিয়ে যান না।
চা শিল্প, রেলপথ, নদী, হাওর, সীমান্ত—সবই আছে কুলাউড়ার হাতে, নেই শুধু কার্যকর নেতৃত্ব।
এমন অঞ্চলের উন্নয়ন না হওয়া কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়; এটি এক দীর্ঘ রাজনৈতিক ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।
১৮৯৬ সালে ব্রিটিশরা যেভাবে রেল বসিয়ে এই জনপদের অর্থনীতি চালু করেছিল, আজকের প্রজন্মও ঠিক তেমনি আশা করে—কেউ একজন আসবেন, যিনি কথার ট্রেন নয়, কাজের রেল চালাবেন।
যিনি ভোটের পরও জনগণকে মনে রাখবেন—শুধু ব্যানারে নয়, উন্নয়নের বাস্তবতায়।

নিজস্ব প্রতিবেদক 






















