11:16 pm, Thursday, 9 July 2026

সিলেট বিভাগের ৬ নদীর পানি বিপৎসীমা ছাড়িয়েছে

ডেস্ক রিপোর্ট : টানা বৃষ্টি ও ভারতের ত্রিপুরার উজান থেকে নেমে আসা ঢলে হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের বিভিন্ন নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। এতে দুই জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

হবিগঞ্জ শহর রক্ষা বাঁধসংলগ্ন খোয়াই নদীর পানিও বিপজ্জনকভাবে বেড়েছে। এতে শহর ও আশপাশের উপজেলার বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুই জেলার ছয়টি নদীর নয়টি পয়েন্টে পানি এখন বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাইদুর রহমান জানান, আজ সকাল ৯টায় খোয়াই নদীর পানি বাল্লা স্টেশনে বিপৎসীমার ২২০ সেন্টিমিটার, শায়েস্তাগঞ্জে ৯৯ সেন্টিমিটার এবং মাধবপুরের হরিপুর পয়েন্টে ১৩৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

কুশিয়ারা নদীর পানি শেওলারবাজার পয়েন্টে বিপৎসীমার ৩১ সেন্টিমিটার নিচে থাকলেও বাড়ছে। তবে মারকুলি পয়েন্টে নদীটির পানি বিপৎসীমার ১১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ ছাড়া, আজমিরীগঞ্জে কালনী-কুশিয়ারা নদীর পানি বিপৎসীমার ৬১ সেন্টিমিটার এবং শায়েস্তাগঞ্জের সুতাং সেতু পয়েন্টে সুতাং নদীর পানি ২৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

তবে মাধবপুরের মনতলা পয়েন্টে সোনাই নদীর পানি বিপৎসীমার ১৯৮ সেন্টিমিটার নিচে ছিল এবং কমছিল বলে জানান তিনি। গত ২৪ ঘণ্টায় হবিগঞ্জে ৬১ দশমিক ৫০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

সাইদুর রহমান বলেন, হাওরগুলো প্রায় সর্বোচ্চ পানি ধারণক্ষমতায় পৌঁছে গেছে। ফলে নতুন করে আসা পানি ধীরগতিতে নিষ্কাশিত হচ্ছে এবং খোয়াই নদীর ওপর চাপ আরও বাড়ছে। এতে নদীর দুই তীরের জনবসতি বন্যার ঝুঁকিতে পড়েছে।

হবিগঞ্জ শহরের মাছুলিয়া এলাকার বাসিন্দা সাদেক হোসেন বলেন, ‘খোয়াই নদীর বাঁধ অনেক জায়গায় দুর্বল। এ কারণে আমরা সব সময় আতঙ্কের মধ্যে থাকি।’

মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খালেদ বিন অলীদ বলেন, টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে জেলার অধিকাংশ নদ-নদীর পানি বাড়ছে। জেলার পাঁচটি পর্যবেক্ষণ পয়েন্টের মধ্যে তিনটিতে পানি বিপৎসীমার ওপরে এবং দুটিতে নিচে রয়েছে। তবে ওই দুই পয়েন্টেও পানি বাড়ছে।

আজ সকাল ৯টার তথ্য অনুযায়ী, মনু নদীর পানি রেলওয়ে ব্রিজ ও চাঁদনীঘাট—উভয় পয়েন্টে বিপৎসীমার ৫৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অন্যদিকে, রেলওয়ে ব্রিজ পয়েন্টে ধলাই নদীর পানি বিপৎসীমার ৩৩ সেন্টিমিটার ওপরে রয়েছে।

শেরপুর পয়েন্টে কুশিয়ারা নদীর পানি বিপৎসীমার ৩১ সেন্টিমিটার নিচে থাকলেও তা বাড়ছে।

খালেদ বিন অলীদ বলেন, মনু ও ধলাই নদীর পানি ইতোমধ্যে বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। কুশিয়ারা ও জুড়ী নদীর পানিও দ্রুত বাড়ছে। এতে নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

শ্রীমঙ্গল আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের পর্যবেক্ষক আনিসুর রহমান জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় ৯৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগের দিন বৃষ্টিপাত হয়েছিল ৯১ মিলিমিটার।

ক্ষয়ক্ষতির হিসাব কষছেন গ্রামবাসী

মৌলভীবাজারের ছনগাঁও গ্রামের বাসিন্দা শ্যামসুন্দর বিশ্বাস বলেন, ‘পানি এত দ্রুত বাড়বে, তা কখনও ভাবিনি। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আমাদের উঠান ও আশপাশের জমি পানিতে তলিয়ে গেছে।’

মাঝেরগাঁও গ্রামের কৃষক সাদ্দাম হোসেন বলেন, আকস্মিক বন্যায় তার সব ফসল নষ্ট হয়ে গেছে।

তিনি বলেন, ‘কৃষিই আমাদের একমাত্র জীবিকা। সরকারি সহায়তা ছাড়া এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে।’

কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদাল হোসেন বলেন, আকস্মিক বন্যায় ইউনিয়নের অন্তত ১২০ থেকে ১৫০টি পরিবারের উঠান ও আশপাশের এলাকা প্লাবিত হয়েছে। কৃষিজমিরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনকে জানানো হয়েছে।

ঝুঁকি বাড়াচ্ছে অবৈধ বালু উত্তোলন

খোয়াই রিভার ওয়াটারকিপার তোফাজ্জল সোহেল বলেন, ভারি বৃষ্টিপাত বন্যার একটি প্রাকৃতিক কারণ হলেও মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে।

তিনি বলেন, খোয়াই নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে নদীতীরের বিভিন্ন অংশ দুর্বল হয়ে পড়েছে। অপরিকল্পিত দখল ও বাঁধের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবও নদীর বন্যা প্রতিরোধব্যবস্থাকে আরও দুর্বল করেছে।

জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার ব্যবস্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে বাঁধ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই নদী ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রণয়নের আহ্বান জানান তিনি।

Tag :
About Author Information

Sirajul Islam

বড়লেখায় বাঁশের বেড়ায় রাস্তা বন্ধ : প্রতিবাদ করায় হামলা ও শ্লীলতাহানি

সিলেট বিভাগের ৬ নদীর পানি বিপৎসীমা ছাড়িয়েছে

Update Time : 09:42:54 am, Thursday, 9 July 2026

ডেস্ক রিপোর্ট : টানা বৃষ্টি ও ভারতের ত্রিপুরার উজান থেকে নেমে আসা ঢলে হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের বিভিন্ন নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। এতে দুই জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

হবিগঞ্জ শহর রক্ষা বাঁধসংলগ্ন খোয়াই নদীর পানিও বিপজ্জনকভাবে বেড়েছে। এতে শহর ও আশপাশের উপজেলার বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুই জেলার ছয়টি নদীর নয়টি পয়েন্টে পানি এখন বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাইদুর রহমান জানান, আজ সকাল ৯টায় খোয়াই নদীর পানি বাল্লা স্টেশনে বিপৎসীমার ২২০ সেন্টিমিটার, শায়েস্তাগঞ্জে ৯৯ সেন্টিমিটার এবং মাধবপুরের হরিপুর পয়েন্টে ১৩৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

কুশিয়ারা নদীর পানি শেওলারবাজার পয়েন্টে বিপৎসীমার ৩১ সেন্টিমিটার নিচে থাকলেও বাড়ছে। তবে মারকুলি পয়েন্টে নদীটির পানি বিপৎসীমার ১১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ ছাড়া, আজমিরীগঞ্জে কালনী-কুশিয়ারা নদীর পানি বিপৎসীমার ৬১ সেন্টিমিটার এবং শায়েস্তাগঞ্জের সুতাং সেতু পয়েন্টে সুতাং নদীর পানি ২৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

তবে মাধবপুরের মনতলা পয়েন্টে সোনাই নদীর পানি বিপৎসীমার ১৯৮ সেন্টিমিটার নিচে ছিল এবং কমছিল বলে জানান তিনি। গত ২৪ ঘণ্টায় হবিগঞ্জে ৬১ দশমিক ৫০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

সাইদুর রহমান বলেন, হাওরগুলো প্রায় সর্বোচ্চ পানি ধারণক্ষমতায় পৌঁছে গেছে। ফলে নতুন করে আসা পানি ধীরগতিতে নিষ্কাশিত হচ্ছে এবং খোয়াই নদীর ওপর চাপ আরও বাড়ছে। এতে নদীর দুই তীরের জনবসতি বন্যার ঝুঁকিতে পড়েছে।

হবিগঞ্জ শহরের মাছুলিয়া এলাকার বাসিন্দা সাদেক হোসেন বলেন, ‘খোয়াই নদীর বাঁধ অনেক জায়গায় দুর্বল। এ কারণে আমরা সব সময় আতঙ্কের মধ্যে থাকি।’

মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খালেদ বিন অলীদ বলেন, টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে জেলার অধিকাংশ নদ-নদীর পানি বাড়ছে। জেলার পাঁচটি পর্যবেক্ষণ পয়েন্টের মধ্যে তিনটিতে পানি বিপৎসীমার ওপরে এবং দুটিতে নিচে রয়েছে। তবে ওই দুই পয়েন্টেও পানি বাড়ছে।

আজ সকাল ৯টার তথ্য অনুযায়ী, মনু নদীর পানি রেলওয়ে ব্রিজ ও চাঁদনীঘাট—উভয় পয়েন্টে বিপৎসীমার ৫৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অন্যদিকে, রেলওয়ে ব্রিজ পয়েন্টে ধলাই নদীর পানি বিপৎসীমার ৩৩ সেন্টিমিটার ওপরে রয়েছে।

শেরপুর পয়েন্টে কুশিয়ারা নদীর পানি বিপৎসীমার ৩১ সেন্টিমিটার নিচে থাকলেও তা বাড়ছে।

খালেদ বিন অলীদ বলেন, মনু ও ধলাই নদীর পানি ইতোমধ্যে বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। কুশিয়ারা ও জুড়ী নদীর পানিও দ্রুত বাড়ছে। এতে নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

শ্রীমঙ্গল আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের পর্যবেক্ষক আনিসুর রহমান জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় ৯৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগের দিন বৃষ্টিপাত হয়েছিল ৯১ মিলিমিটার।

ক্ষয়ক্ষতির হিসাব কষছেন গ্রামবাসী

মৌলভীবাজারের ছনগাঁও গ্রামের বাসিন্দা শ্যামসুন্দর বিশ্বাস বলেন, ‘পানি এত দ্রুত বাড়বে, তা কখনও ভাবিনি। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আমাদের উঠান ও আশপাশের জমি পানিতে তলিয়ে গেছে।’

মাঝেরগাঁও গ্রামের কৃষক সাদ্দাম হোসেন বলেন, আকস্মিক বন্যায় তার সব ফসল নষ্ট হয়ে গেছে।

তিনি বলেন, ‘কৃষিই আমাদের একমাত্র জীবিকা। সরকারি সহায়তা ছাড়া এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে।’

কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদাল হোসেন বলেন, আকস্মিক বন্যায় ইউনিয়নের অন্তত ১২০ থেকে ১৫০টি পরিবারের উঠান ও আশপাশের এলাকা প্লাবিত হয়েছে। কৃষিজমিরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনকে জানানো হয়েছে।

ঝুঁকি বাড়াচ্ছে অবৈধ বালু উত্তোলন

খোয়াই রিভার ওয়াটারকিপার তোফাজ্জল সোহেল বলেন, ভারি বৃষ্টিপাত বন্যার একটি প্রাকৃতিক কারণ হলেও মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে।

তিনি বলেন, খোয়াই নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে নদীতীরের বিভিন্ন অংশ দুর্বল হয়ে পড়েছে। অপরিকল্পিত দখল ও বাঁধের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবও নদীর বন্যা প্রতিরোধব্যবস্থাকে আরও দুর্বল করেছে।

জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার ব্যবস্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে বাঁধ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই নদী ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রণয়নের আহ্বান জানান তিনি।