1. newsmkp@gmail.com : Admin : sk Sirajul Islam siraj siraj
  2. info@fxdailyinfo.com : admi2017 :
  3. admin@mkantho.com : Sk Sirajul Islam Siraj : Sk Sirajul Islam Siraj
ব্রেকিং নিউজ :
* বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শনে সিলেটে প্রধানমন্ত্রী   *  বন্যা নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই, সরকার সব ব্যবস্থা নিয়েছে : প্রধানমন্ত্রী

নবীন লেখক গল্প প্রতিযোগিতা দ্বিতীয় পর্বে প্রথম সেরা গল্প ‘জীবন কথা’ -শাকিল ইরাদ

  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৭ মে, ২০২২
  • ৫৬২ বার পঠিত

জীবন সায়াহ্নে এসে আজ কত কথাই না মনে পরে মাইশার । অপরূপ সুন্দরী ছিল না ঠিকই।কিন্তু কারোর থেকে কম ছিলো না। বাড়ির সবাইকে সব সময় মাতিয়ে রাখতো।

যৌথ পরিবারে জন্ম । সবাই মিলে চব্বিশ জনের পরিবার । জ্যাঠা কাকা মিলেই পাঁচ জন । জ্যেঠি কাকী মিলে পাঁচ । চোদ্দ জন ভাই বোন । মাইশার বাবা দ্বিতীয় ভাই । তাই বলা যায় বাকি তিন কাকার ছেলে মেয়েদের জন্মাতে দেখেছে মাইশা । একমাত্র জ্যাঠার দুই ছেলে ও এক মেয়ে । তাই মাইশার জ্যাঠাতো দুই ভাই । কিন্তু জ্যাঠার মেয়ে মাইশার থেকে এক বছরের ছোটো । তাই মাইশাই এই পরিবারের জেষ্ঠা কন্যা । মাইশার নিজের কোনো ভাই বোন নেই। একটা ভাই হয়েছিল । কিন্তু জন্মের তিনদিনের মাথায় মারা যায় । তাই মাইশা ওর বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান ছিল । এবং বলাই বাহুল্য যে খুব আদুরে কন্যা ছিলো । বড্ড চঞ্চল আর ছটফটে মেয়ে ছিল মাইশা । পড়াশোনায়ও খুবই ভালো ছিল ।

গ্রামের বাড়ি । যৌথ পরিবার । জমিজমাও ছিল অনেক বাবা কাকাদের । নিজেদের পুকুর, বাগানে কি ছিলো না ? সব ভাইবোন মিলে দস্যিপনার সীমা ছিলো না । আর নাটের গুরু ছিল মাইশা । গাছে চড়া, মাছ ধরা, সাঁতার কাটা সর্বদাই বাড়ির বড়রা তঠস্থ হয়ে থাকত ।

মাধ্যমিক পাস করার পর জ্যাঠাতো দুই ভাইয়ের কাছে ঢাকায় চলে আসে কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য । ভাইয়েরা বাড়ি ভাড়া নিয়ে সাভারের কাছে থাকত । সামনেই ছিল মেয়েদের কলেজ । সেখানেই ভর্তি করা হলো মাইশাকে । নতুন পরিবেশ, মাইশার ভালো লাগতো না । দুই ভাই মিলে বোনকে বোঝাতে লাগলো । বনের হরিণ কি খাঁচায় পোষ মানাতে পারে ? কিন্তু উপায়ও ছিলো না । গ্রামে ভালো কলেজ ছিলো না । যাওবা একটা আছে, সেটাও নয় কিলোমিটার দূরে । গাড়ি ঘোড়াও সেই সময় তেমন একটা ছিলো না । অগত্যা থেকে যেতে হলো ।

দু’বেলা রান্না আর পড়াশোনা । সাথে কলেজ । রুটিন হয়ে গেলো । সেসময় না ছিলো টেলিভিশন না অন্য কিছু । রেডিওই তখন ছিল বিলাসিতা । কারোর বাড়িতে রেডিও আছে মানে সে ধনী লোক । সিনেমা হল ছিলো । মাঝে মধ্যে ভাইদের ইচ্ছা হলে নিয়ে যেত । আর তাকিয়ে থাকতো কবে গরমের ছুটি হবে, কবে ঈদের ছুটি হবে । ছুটি হওয়া মানেই গ্রামের বাড়ি । আবার সবাই একসাথে । আবার সেই সব ফেলে আসা দিন ।

দেখতে দেখতে মাইশার বিয়ের দিন ঠিক হলো । মাইশা তখন বিএ পাস করা যুবতী । বড় ভাইয়ের এক বন্ধু সেসময় সবে মাত্র ডাক্তারি পাশ করেছে । তো তার মাইশাকে ভীষণ পছন্দ । একদিন বড়ভাই এসে বললো, “মাইশা তুই আমার বন্ধু হাসিব কে চিনিস তো ?” দু’একবার ভাইয়ের সাথে বাড়িতে আসায় দেখেছিল অবশ্য । বললো, “কেনো বলতো ভাই ?” ভাই বলে ছিলো, “তোকে হাসিবের খুব পছন্দ । বাবার এক ছেলে । ওদের তেল কল আছে । বনেদী বাড়ী । কিন্তু হাসিবের বাপজেঠার তেলের ব্যাবসায় না গিয়ে ডাক্তার হয়েছে । তুই যদি রাজি থাকিস তো আমি কাকা কাকীর সাথে কথা বলি ।”

বড়ভাইও তখন বাংলাদেশ বেতারে চাকরি করছে । মেজো ভাই রেলে । বড় ভাইয়ের বিয়েও হয়ে গিয়েছিল । টুকটুকে ভাবী ছিলো মাইশার । ভারী মিষ্টি হাসি খুশি মেয়ে ছিল ভাবী । সে যাই হোক । মাইশা বিয়ে হয়ে গেলো হাসিবের সাথে । হাসিব মাইশাকে খুবই ভালোবাসতো। কিন্তু মাইশার শাশুড়ি ছিলেন বড্ড মুখোরা ও দাজ্জাল মহিলা ।

মুক্তবিহঙ্গের মতো যার জীবন শুরু হয়েছিলো তাকেই কিনা পরতে হলো বদ্ধ খাঁচায় । “মেয়ে হয়ে জন্মেছ, এটাই তোমার নিয়তি” – সবার কাছে এই উপদেশ সারাজীবন শুনে এসেছে । এটাই ভবিতব্য ভেবে মেনেও নিয়েছে ।

স্বামী ডাক্তার । বাড়িতে তার দর্শন পাওয়াই ভার । দিন রাত শাশুড়ির ফরমায়েস । বাড়িতে ঝি চাকরের অভাব ছিল না । তবুও ঘরের বউ, সে ঝি চাকরেরও অধম । তাই তাদের সামনে ছোটো বড়ো কথা বলতেও তিনি একটুও দ্বিধা করতেন না । শ্বশুর বাবা ফেরেশতা তুল্য মানুষ ছিলেন । কিন্তু শাশুরি মাতাই ছিলেন হত্তা কত্তা বিধাতা । শুতে যাওয়ার আগে স্বামীর সাথে একান্তে কথা বলা ছিলো বাচালতা । বেহায়াপনা ।

পঞ্চান্ন বছর বয়সে শ্বশুর ইন্তেকাল করলেন । শাশুড়ি হলেন সর্বেসর্বা । মাইশার তখন এক ছেলে আর এক মেয়ে । একে একে অধিকাংশ ঝি চাকরের ছুটি হয়ে গেলো । শাশুড়ির ফারমায়েস, বাড়ি ঘর পরিষ্কার, ছেলে মেয়ের দেখাশোনা, অতপরঃ স্বামী, সব কিছুর জন্য একজন লোক বরাদ্দ হলো । তিনি হলেন মাইশা । রক্ত মাংসের মানুষ । তাই রাগ, দুঃখ, অভিমান সবকিছুই ছিলো । কিন্তু তার বহিঃপ্রকাশ ছিলো না । সর্বদা যে সবকিছু হাসিমুখে সামাল দিয়েছে এমনটা না হলেও অবহেলাও কখনো করেনি মাইশা ।

মাইশার মেয়ের যখন বিয়ে দিলো, শাশুড়ি মা তখন দিনের চোদ্দ ঘণ্টা আরাম কেদারায় বসে থাকেন । হাঁটা চলা বন্ধ । আর ছেলের বিয়ের সময় সেই শাশুড়ি বিছানায় শয্যাশায়ী । হেগে মুতে পরে থাকেন । মাইশা পরিষ্কার না করলে আর কেউ করার নেই । মাইশা ছাড়া আর কারোর উনার ঘরে প্রবেশের অধিকার নেই । আর মাইশারও কোনো বিঘ্নি নেই। আগেও মুখ বুঝে সব কাজ করে গেছে, আর আজও করে চলেছে ।

সেদিন মাইশার মনটা ভালো ছিল না । শাশুড়ি গত হয়েছেন চার মাস হয়েছে । এতবড়ো বাড়ি । দুজন মাত্র প্রাণী । হাসিব আর মাইশা । বয়স হচ্ছে দেখে হাসিব দু’জন লোক রেখেছে । মাইশার ভাই বোনেরাও যে যার জগতে । কাছে কেউ নেই । আর সত্যি কথা বলতে কি শাশুড়ি যতকাল বেঁচে ছিলেন কাউকে এবাড়ি আসতে বলতে পারেনি কখনো মাইশা । তাই তারাও আর কেউ মাইশার খোঁজ খবর রাখে না ।

মাইশার মেয়ের বিয়ে হয়ে জামাইকে নিয়ে থাকে কানাডায় । ছেলে ডাক্তার । সেও আছে লন্ডনে । ডাকলেই যে আসবে সে উপায় নেই । হাসিবের শরীরটাও দু’একদিন হলো ভালো যাচ্ছিল না । কত করে বললো, “ওগো, একবার চলো ডাক্তার দেখিয়ে আসি ।” হাসিব বললো, “আমি নিজে ডাক্তার হয়ে ডাক্তার দেখাতে যাবো ? আমার কিছু হয়নি ।”

দু’দিনও সময় পেল না হাসিব । সকালে রোজ যেমন উঠে, সেদিনও তাই উঠেছিল । বাগানে পায়চারি করে এসে বললো, “চা দাও ।” মাইশা চা দিয়েছিল । চা খেতে খেতেই পেপার পড়ছিল । হঠাৎ বললো, “আমি একটু শুচ্ছি । ঘুমিয়ে পড়লে সাড়ে সাতটায় তুলে দিও ।” ব্যাস । আর ঘুম ভাঙলো না ।

সম্পূর্ণ একা মাইশা । ছেলে মেয়ে কে ডেকে পাঠালো । কবর দেওয়ার সময় ছেলে এলো । মেয়ে আসতে পারেনি । জামাই ছুটি পায়নি । ছেলেও এসেছে একা । বৌমা, নাতি নাতনীকে নিয়ে আসেনি । মনে হয় ভয়ে । যদি মা আর যেতে না দেয় । বুদ্ধিমান ছেলে কিনা ।

হাসিবের মৃত্যুর তিন দিন পরের খাবার অনুষ্ঠান এলাকায় হলো ঘটা করেই । মাইশাই খরচ করলো । ছেলে পাবে কোথায় ? যা দিনকাল পড়েছে । তাতে বিদেশ বিভুই । এখনো কিছুই জমাতে পারেনি । তাই যাবার সময় মায়ের থেকে মাত্র লাখ তিনেক টাকা নিয়ে গেলো । অবশ্যই গিয়েই ফিরিয়ে দেবে বলেছে ।

বছর তিনেক পর আবার মাইশা ছেলে মেয়েকে ফোনে বললো, “তোমাদের দাদার যে তেল কল ছিলো তা বহুদিন বন্ধ পরে থাকার দরুন বেহাত হবার লক্ষণ দেখা দিয়েছে । আর এই এতবড়ো বাড়ি আমার একার পক্ষে দেখভাল করা সম্ভবপর নয় । তোমরা যেটা উচিৎ মনে করো যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি করলে আমি ভার মুক্ত হই ।”

এক শীতের সকালে মাইশার বাড়ি আবার ছেলে বউ মেয়ে জামাই নাতি নাতনির আগমনে সরগরম হয়ে উঠলো । এখন ইন্টারনেটের যুগ । সুদূর লন্ডনে বসেই তেল কল ও বাড়ি বিক্রির কথা কোনো এক প্রোমোটারের সাথে হয়েই গিয়েছিলো । শুধু মায়ের সই আর টাকা পয়সার লেনদেন টাই বাকি ছিলো । সেটাও যখন হয়ে গেলো তখন “মা” নামক জরবস্তু টার একটা সদগতি চাই । আর সেটার জন্যে বেশিকিছু দৌড়ঝাঁপ করতে হলো না । এদেশে বৃদ্ধাশ্রম বলে নতুন এক কয়েদখানা আছে । যেখানে কিছু টাকা দিলেই বৃদ্ধ পিতা মাতার ভার থেকে অনায়াসে মুক্তি পাওয়া যায় । একবার সেই কয়েদখানায় বৃদ্ধ পিতা মাতাকে ঢুকিয়ে দিতে পারলেই আর ফিরে না তাকালেও চলবে । আর হলোও তাই ।

মেয়ে বললো, “কানাডায় ভীষণ ঠান্ডা । মা ওখানে বাঁচবে না ।” ছেলে বললো, “লন্ডনেও ঠান্ডা আছে । কিন্তু সব থেকে বড় অসুবিধা থাকার জায়গা নেই ।” বড্ড ছোটো ওর বাড়ি । মাকে রাখবে কোথায় ।

চার বছর হলো মাইশার ঠিকানা এই বৃদ্ধাশ্রম । এর মধ্যে একবারও না ছেলে, নাতো মেয়ে, কেউ একবারও কখনো ভুল করেও খোঁজ খবর করেনি মা টা বেঁচে আছে, না মরে গেছে । এখানের সব বাসিন্দাই বয়স্ক বয়স্কা । সকলেরই কিছু না কিছু অসুখ বিসুখ আছে । এখন ভয় হয় চারিদিকে কি সব করোনা ভাইরাস রোগের কথা সবাই বলছে ।

আজকাল জ্বর হচ্ছে । গলায় ব্যথা । শ্বাস নিতেও কেমন যেনো কষ্ট হচ্ছে । শুধু মাইশা নয় । এখানের প্রায় দশ বারো জনেরও একই অবস্থা ।

“কি হবে মাবুদ ? আর কি কখনো ছেলে মেয়ে নাতি নাতনির মুখ দেখতে পাবো ?” – মৃত্যুর আগে মাইশার শুধু এই একটা মাত্র চাওয়া ।

 

 

 

প্লিজ আপনি ও অপরকে নিউজটি শেয়ার করার জন্য অনুরোধ করছি

এ জাতীয় আরো খবর..