ডেস্ক রিপোর্ট : পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও ১৯৯২ বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক ইমরান খানের কারাবাস নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি তার সাবেক সতীর্থ জাভেদ মিয়াঁদাদ। কাঁদতে কাঁদতে ইমরানের মুক্তির আহ্বান জানিয়েছেন পাকিস্তানের সাবেক এই ব্যাটিং কিংবদন্তি।
একই সঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, ইমরান কোনো দুর্নীতিবাজ মানুষ নন।
মিয়াঁদাদের এই মন্তব্য এসেছে কারাগারে ইমরানের স্বাস্থ্য ও তার সঙ্গে আচরণ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হওয়ার মধ্যে।
২০২৩ সালের আগস্ট থেকে কারাবন্দী ইমরান সম্প্রতি ইসলামাবাদে একটি মেডিকেল পরীক্ষা করানোর পর রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে ফিরেছেন।
তবে ওই মেডিকেল পরীক্ষা কীভাবে করা হয়েছে, তা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে ইমরানের দল।
পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট তাকে শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে পরীক্ষা করানোর পাশাপাশি ব্যক্তিগত চিকিৎসকসহ অন্য চিকিৎসকদের তার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল।
এরই মধ্যে চলতি সপ্তাহে বিষয়টি ক্রিকেট অঙ্গনেও আলোচনায় আসে।
লর্ডসে ইংল্যান্ড-পাকিস্তান টেস্টের স্কাই স্পোর্টসের সম্প্রচারে মাইকেল আথারটনের নেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইমরানের দুই ছেলে সুলেইমান ও কাসিম তাদের বাবার স্বাস্থ্য ও কারাগারের পরিবেশ নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তারা অভিযোগ করেন, ইমরানকে দিনে ২৩ ঘণ্টারও বেশি সময় একা রাখা হচ্ছে এবং তাকে কারাগারে আটকে রেখে নীরব করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তবে পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, ইমরান যথাযথ চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছেন।
এর একদিন পরই সাবেক সতীর্থের পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন মিয়াঁদাদ। ‘ন্যারেটিভ’ ইউটিউব চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘তিনি একজন সৎ মানুষ। তিনি এমন কেউ নন, যিনি দুর্নীতিতে জড়িত। তা হলে তিনি অনেক কিছুই করতে পারতেন।’
ইমরানকে কারাগারে রেখে কী অর্জন হচ্ছে, সেই প্রশ্নও তোলেন মিয়াঁদাদ। তিনি বলেন, ‘তাকে ছেড়ে দিলে কী হবে? তিনি কি কাউকে খেয়ে ফেলবেন, নাকি কারও ক্ষতি করবেন? তিনিও তো কারও সন্তান। আমি সব সময় ভাবি, ভেতরে তিনি কী করছেন।’
ইমরানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা তুলে ধরে মিয়াঁদাদ বলেন, পাকিস্তানের হয়ে একসঙ্গে খেলা এবং কাউন্টি ক্রিকেটে পাশাপাশি সময় কাটানোর কারণে তিনি সাবেক অধিনায়ককে ভালোভাবেই চেনেন। আর সেই অভিজ্ঞতা থেকেই ইমরানের সততা নিয়ে তার কোনো সন্দেহ নেই।
কথা বলতে বলতে ইমরানের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আরও আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন মিয়াঁদাদ। তিনি বলেন, কারাগারের ভেতরে ইমরান কী অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, সেটি ভাবলেই তার খুব কষ্ট হয়। একপর্যায়ে আবেগ সামলাতে না পেরে তিনি বলেন, বিষয়টি তাকে খুব আবেগপ্রবণ করে তুলেছে এবং সাবেক সতীর্থের জন্য প্রার্থনা করা ছাড়া তার আর কিছু করার নেই।
ইমরানের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের সম্পর্ককে কেবল প্রতিদ্বন্দ্বিতার দৃষ্টিতে দেখার বিরুদ্ধেও কথা বলেন মিয়াঁদাদ। খেলোয়াড়ি জীবনে এবং পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান ক্রিকেট নিয়ে দুজনের মধ্যে মতপার্থক্য ও বিরোধ থাকলেও তাদের মধ্যে কোনো প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল না বলে দাবি করেন তিনি।
‘আমাদের মধ্যে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল না,’ বলেন মিয়াঁদাদ। তার ভাষ্য, মতপার্থক্য যা-ই থাকুক না কেন, খেলোয়াড় হিসেবে দুজনের লক্ষ্য ছিল একটাই; পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করা এবং দেশের জন্য লড়াই করা।
মিয়াঁদাদ ও ইমরান পাকিস্তান ক্রিকেটের সবচেয়ে সফল সময়গুলোর অন্যতম দুই প্রধান চরিত্র। ১৯৮০-এর দশক থেকে ১৯৯০-এর দশকের শুরু পর্যন্ত তারা একসঙ্গে পাকিস্তান দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। সেই পথের সবচেয়ে বড় সাফল্য আসে ১৯৯২ সালের বিশ্বকাপে।
অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ফাইনালে ২৪ রানে ২ উইকেট হারিয়ে চাপে পড়েছিল পাকিস্তান। তখন ইমরান ও মিয়াঁদাদ তৃতীয় উইকেটে ১৩৯ রানের জুটি গড়েন। ইমরান করেন ৭২ রান, মিয়াঁদাদের ব্যাট থেকে আসে ৫৮ রান। তাদের সেই জুটিই পাকিস্তানের শিরোপা জয়ের ভিত গড়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত সেটিই হয়ে আছে পাকিস্তানের পুরুষদের একমাত্র ওয়ানডে বিশ্বকাপ জয়।
তিন দশকেরও বেশি সময় পর সেই ক্রিকেটীয় স্মৃতি এখন মিয়াঁদাদের কাছে আর মুখ্য নয়। সাবেক সতীর্থের বর্তমান পরিস্থিতিই তার কাছে বড় হয়ে উঠেছে। ইমরানকে জাতীয় বীর হিসেবে উল্লেখ করে তিনি তার পরিস্থিতির সমাধান এবং যথাযথ সম্মান নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
ইমরানের চিকিৎসা নিয়ে উদ্বেগ অবশ্য শুধু পাকিস্তানেই সীমাবদ্ধ নেই। সাবেক আন্তর্জাতিক অধিনায়কদের একটি দল, যার মধ্যে সুনীল গাভাস্কার, কপিল দেব ও গ্রেগ চ্যাপেলের মতো কিংবদন্তিরাও রয়েছেন, সম্প্রতি কারাবন্দী সাবেক এই ক্রিকেটারের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার বর্তমান অধিনায়ক প্যাট কামিন্সও প্রকাশ্যে ইমরানকে মর্যাদার সঙ্গে আচরণ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে মিয়াঁদাদের আবেদনটি ছিল আরও ব্যক্তিগত। কয়েক দশক ধরে যাকে সতীর্থ, অধিনায়ক এবং কখনো কখনো মতবিরোধের সঙ্গী হিসেবে কাছ থেকে দেখেছেন, সেই মানুষটির বর্তমান পরিস্থিতির কথা বলতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারেননি পাকিস্তানের এই ক্রিকেট কিংবদন্তি।

নিজস্ব প্রতিবেদক 





















