1:32 am, Thursday, 26 March 2026

কমলগঞ্জে ৪২ বছর পর মনসা দেবীর নৌকা পূজা অনুষ্ঠিত

কমলগঞ্জ প্রতিনিধি: মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার মুন্সীবাজার ইউনিয়নের ধীতেশ্বর গ্রামে শুরু হয়েছে শ্রীশ্রী মনসা দেবীর ঐতিহ্যবাহী নৌকা পূজা। দীর্ঘ ৪২ বছর পর কমলগঞ্জে এই পূজা আয়োজনকে ঘিরে এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। সিলেটে নিযুক্ত ভারতীয় সহকারী হাই কমিশনার ও স্থানীয় সংসদ সদস্য পূজা মন্ডপ পরিদর্শন করেছেন।


গত ২২ মার্চ রাতে শুভ অধিবাসের মধ্য দিয়ে পূজার আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। ২৩ মার্চ সোমবার মূল পূজার দিনে পূজা-অর্চনা, আরতি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ধর্মীয় আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত হাজার হাজার সনাতনী ভক্ত ও বিভিন্ন শ্রেণি পেশার লোকজন অংশগ্রহণ করেন। ভক্তদের উপস্থিতিতে পুরো এলাকা পরিণত হয়েছে এক প্রাণের মিলনমেলায়।


এদিকে সোমবার বিকেলে মনসা দেবীর নৌকা পূজা পরিদর্শনে আসেন সিলেটে নিযুক্ত ভারতীয় সহকারী হাই কমিশনার শ্রী অনিরুদ্ধ দাশ। রাতে পূজামন্ডপ পরিদর্শন করে পূজারীদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও মৌলভীবাজার-৪ (শ্রীমঙ্গল -কমলগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী (হাজী মুজিব), কমলগঞ্জ থানার ওসি মো: আব্দুল আউয়াল, ওসি (তদন্ত) গোলাম মোস্তফা, জেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটির সদস্য দুরুদ আহমদ, স্বাগক কিশোর দাস চৌধুরী, জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মহিম দে মধু, জেলা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক নকুল দাশ, মুন্সীবাজার ইউপি চেয়ারম্যান নাহিদ আহমদ তরফদার, উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক মো: আবুল হোসেন, বিশ্ব কবি মঞ্চের আহবায়ক পুলক কান্তি ধর, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ বিভিন্ন গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
পূজা উপলক্ষে গত সোমবার দুপুরে অনুষ্ঠিত হয়েছে মহিষ বলি। পূজা উপলক্ষে বসেছে গ্রামীণ মেলা, যা দর্শনার্থীদের জন্য বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করেছে। আয়োজকরা জানান, হাজার হাজার ভক্তের মাঝে প্রসাদ বিতরণ করা হচ্ছে।


হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলা থেকে আগত ভক্ত উত্তম কুমার পাল হিমেল বলেন, “নৌকা পূজা আমি জীবনে এই প্রথম দেখলাম। এর আগে কখনো দেখিনি। এখানে এসে খুব ভালো লেগেছে। হাজার হাজার ভক্ত দেখে মনটা আরও আনন্দে ভরে উঠেছে।”
সিলেট থেকে পূজা দেখতে আসা গৃহিনী লাভলী রানী পাল বলেন, জীবনে প্রথম বার নৌকা পূজা দেখলাম, এতো লোকসমাগম আমি আর কোন পূজায় দেখিনি। সত্যিই ভাল লাগছে।
কমলগঞ্জ উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি ও পূজার সমন্বয়কারী শ্যামল চন্দ্র দাশ বলেন, “৪২ বছর পর নৌকা পূজার এই আয়োজন আমাদের ঐতিহ্যকে নতুন করে জীবিত করেছে। এটি ধর্মীয় চেতনা ও সামাজিক সম্প্রীতি জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।” তিন দিনব্যাপী এই আয়োজনের দ্বিতীয় দিনে সোমবার ভক্তদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণ এবং শেষ দিন মঙ্গলবার বিভিন্ন ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে পূজার সমাপ্তি হয়।


শ্রীশ্রী মনসা দেবীর নৌকা পূজা বাংলার প্রাচীন লোকজ ধর্মীয় সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সাপের দেবী হিসেবে পূজিত মনসা দেবীর কাছে ভক্তরা কল্যাণ, সুরক্ষা ও সমৃদ্ধি কামনা করেন। অনেকেই মনে করেন সর্প ভয় থেকে দূরে থাকতে এই মনসা দেবীর পূজা হয়ে থাকে। নদীমাতৃক বাংলার জীবনযাত্রার সঙ্গে এই পূজার রয়েছে গভীর সম্পর্ক। নৌকার মাধ্যমে দেবীর আরাধনা করে ভক্তরা প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা, ভালো ফসল এবং জীবনের নিরাপত্তা প্রার্থনা করেন।
ধর্মীয় এই আয়োজন কেবল পূজার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি গ্রামীণ ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আয়োজকরা জানান, সকলের অংশগ্রহণে এবারের নৌকা পূজা সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

Tag :
About Author Information

Sirajul Islam

কমলগঞ্জে ৪২ বছর পর মনসা দেবীর নৌকা পূজা অনুষ্ঠিত

Update Time : 11:33:58 am, Tuesday, 24 March 2026

কমলগঞ্জ প্রতিনিধি: মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার মুন্সীবাজার ইউনিয়নের ধীতেশ্বর গ্রামে শুরু হয়েছে শ্রীশ্রী মনসা দেবীর ঐতিহ্যবাহী নৌকা পূজা। দীর্ঘ ৪২ বছর পর কমলগঞ্জে এই পূজা আয়োজনকে ঘিরে এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। সিলেটে নিযুক্ত ভারতীয় সহকারী হাই কমিশনার ও স্থানীয় সংসদ সদস্য পূজা মন্ডপ পরিদর্শন করেছেন।


গত ২২ মার্চ রাতে শুভ অধিবাসের মধ্য দিয়ে পূজার আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। ২৩ মার্চ সোমবার মূল পূজার দিনে পূজা-অর্চনা, আরতি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ধর্মীয় আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত হাজার হাজার সনাতনী ভক্ত ও বিভিন্ন শ্রেণি পেশার লোকজন অংশগ্রহণ করেন। ভক্তদের উপস্থিতিতে পুরো এলাকা পরিণত হয়েছে এক প্রাণের মিলনমেলায়।


এদিকে সোমবার বিকেলে মনসা দেবীর নৌকা পূজা পরিদর্শনে আসেন সিলেটে নিযুক্ত ভারতীয় সহকারী হাই কমিশনার শ্রী অনিরুদ্ধ দাশ। রাতে পূজামন্ডপ পরিদর্শন করে পূজারীদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও মৌলভীবাজার-৪ (শ্রীমঙ্গল -কমলগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী (হাজী মুজিব), কমলগঞ্জ থানার ওসি মো: আব্দুল আউয়াল, ওসি (তদন্ত) গোলাম মোস্তফা, জেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটির সদস্য দুরুদ আহমদ, স্বাগক কিশোর দাস চৌধুরী, জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মহিম দে মধু, জেলা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক নকুল দাশ, মুন্সীবাজার ইউপি চেয়ারম্যান নাহিদ আহমদ তরফদার, উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক মো: আবুল হোসেন, বিশ্ব কবি মঞ্চের আহবায়ক পুলক কান্তি ধর, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ বিভিন্ন গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
পূজা উপলক্ষে গত সোমবার দুপুরে অনুষ্ঠিত হয়েছে মহিষ বলি। পূজা উপলক্ষে বসেছে গ্রামীণ মেলা, যা দর্শনার্থীদের জন্য বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করেছে। আয়োজকরা জানান, হাজার হাজার ভক্তের মাঝে প্রসাদ বিতরণ করা হচ্ছে।


হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলা থেকে আগত ভক্ত উত্তম কুমার পাল হিমেল বলেন, “নৌকা পূজা আমি জীবনে এই প্রথম দেখলাম। এর আগে কখনো দেখিনি। এখানে এসে খুব ভালো লেগেছে। হাজার হাজার ভক্ত দেখে মনটা আরও আনন্দে ভরে উঠেছে।”
সিলেট থেকে পূজা দেখতে আসা গৃহিনী লাভলী রানী পাল বলেন, জীবনে প্রথম বার নৌকা পূজা দেখলাম, এতো লোকসমাগম আমি আর কোন পূজায় দেখিনি। সত্যিই ভাল লাগছে।
কমলগঞ্জ উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি ও পূজার সমন্বয়কারী শ্যামল চন্দ্র দাশ বলেন, “৪২ বছর পর নৌকা পূজার এই আয়োজন আমাদের ঐতিহ্যকে নতুন করে জীবিত করেছে। এটি ধর্মীয় চেতনা ও সামাজিক সম্প্রীতি জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।” তিন দিনব্যাপী এই আয়োজনের দ্বিতীয় দিনে সোমবার ভক্তদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণ এবং শেষ দিন মঙ্গলবার বিভিন্ন ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে পূজার সমাপ্তি হয়।


শ্রীশ্রী মনসা দেবীর নৌকা পূজা বাংলার প্রাচীন লোকজ ধর্মীয় সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সাপের দেবী হিসেবে পূজিত মনসা দেবীর কাছে ভক্তরা কল্যাণ, সুরক্ষা ও সমৃদ্ধি কামনা করেন। অনেকেই মনে করেন সর্প ভয় থেকে দূরে থাকতে এই মনসা দেবীর পূজা হয়ে থাকে। নদীমাতৃক বাংলার জীবনযাত্রার সঙ্গে এই পূজার রয়েছে গভীর সম্পর্ক। নৌকার মাধ্যমে দেবীর আরাধনা করে ভক্তরা প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা, ভালো ফসল এবং জীবনের নিরাপত্তা প্রার্থনা করেন।
ধর্মীয় এই আয়োজন কেবল পূজার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি গ্রামীণ ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আয়োজকরা জানান, সকলের অংশগ্রহণে এবারের নৌকা পূজা সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে।