1:36 pm, Thursday, 22 October 2026

সীমান্ত হত্যা শূন্যের কোটায় নামবে কবে?

ডেস্ক রিপোর্ট : চলতি বছরের মে মাসে ভারত সীমান্তে অন্তত পাঁচজন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। গত ১৪ মে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার আমঝোল সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে খাদেমুল হক নামে এক বাংলাদেশি যুবক নিহত হন।

এর আগে ১১ মে ত্রিপুরা সীমান্তে ‘সন্দেহভাজন বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ অভিযোগে বিএসএফের গুলিতে দুইজন নিহত হন।
এছাড়া ৮ মে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার পাথারিয়াদ্বার সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে আরও দুই বাংলাদেশি নিহত এবং কয়েকজন আহত হয়েছেন।

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত পৃথিবীর অন্যতম দীর্ঘ স্থলসীমান্ত। প্রায় ৪ হাজার ১৫৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সীমান্তকে অতীতে দুই দেশের সরকার ‘বন্ধুত্বের সীমান্ত হিসেবে তুলে ধরলেও বাস্তবে এটি বহু বছর ধরে প্রাণহানির এক ভয়াবহ করিডোরে পরিণত হয়েছে।

সীমান্তে গুলি, নির্যাতন, আটক, অপহরণ এবং কাঁটাতারে ঝুলন্ত লাশের মতো ঘটনা দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে সংবেদনশীল ইস্যুগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, সীমান্ত হত্যা কমানোর বহু প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতি হয়নি।

বিশেষ করে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং দায়মুক্তির সংস্কৃতির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। উভয় দেশই বহুবার সীমান্ত হত্যা ‘শূন্যের কোটায়’ নামিয়ে আনার অঙ্গীকার করেছে। তবে বাস্তব চিত্র এখনও সেই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সীমান্তে মৃত্যুর পরিসংখ্যান কী বলছে
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে বিএসএফের হাতে অন্তত ৩০৫ বাংলাদেশি নিহত এবং ২৮২ জন আহত হয়েছেন। শুধু ২০২৪ সালেই নিহত হন ২৬ জন বাংলাদেশি।

অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বহু বছর ধরেই অভিযোগ করে আসছে যে, সীমান্ত এলাকায় বিএসএফ অবাধে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করছে। সংস্থাটির ২০১০ সালের বহুল আলোচিত ‘ট্রিগার হ্যাপি’ প্রতিবেদনে বলা হয়, সন্দেহভাজন চোরাকারবারি বা অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধেও প্রায়ই প্রাণঘাতী গুলি ব্যবহার করা হয়েছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিএসএফের হাতে ৩৪ বাংলাদেশি নিহত হন, যা আগের পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। সংস্থাটির তথ্যে আরও দেখা যায়, ২০২৪ সালে নিহত হন ৩০ জন, ২০২৩ সালে ৩১ জন, ২০২২ সালে ২৩ জন এবং ২০২১ সালে ১৮ জন। আর ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত সীমান্তে অন্তত ৯ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

কেন ঘটে সীমান্ত হত্যা
সীমান্তে প্রাণহানির পেছনে কয়েকটি কারণ বারবার সামনে এসেছে। গরু ও পণ্যের চোরাচালান, অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগ, মাদক পাচার, সীমান্তের অস্পষ্ট চিহ্ন এবং সীমান্তনির্ভর দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবিকা—এসব বিষয়কে কেন্দ্র করেই উত্তেজনা তৈরি হয়।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার দাবি, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিহতরা নিরস্ত্র সাধারণ মানুষ। অনেক সময় কৃষিকাজ, গরু আনা-নেওয়া কিংবা আত্মীয়ের বাড়িতে যাতায়াতের সময়ও তারা গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।

তবে ভারতের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, সীমান্তরক্ষীরা আত্মরক্ষার্থে কিংবা চোরাকারবারিদের হামলার মুখে গুলি চালাতে বাধ্য হন। বিএসএফ প্রায়ই সীমান্ত অপরাধ, পাচার এবং অবৈধ অনুপ্রবেশকে কঠোর অবস্থানের কারণ হিসেবে তুলে ধরে।

ফেলানী: যে ছবি বদলে দিয়েছিল বিশ্বদৃষ্টি
২০১১ সালে কুড়িগ্রাম সীমান্তে কিশোরী ফেলানী খাতুনের কাঁটাতারে ঝুলন্ত লাশের ছবি আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ওই ঘটনা সীমান্ত হত্যার প্রতীক হয়ে ওঠে। আজও ফেলানীর ছবি বাংলাদেশের মানুষের কাছে সীমান্ত বাস্তবতার এক নির্মম স্মারক।

এরপর বহুবার দুই দেশের শীর্ষ পর্যায় থেকে সীমান্ত হত্যা ‘শূন্যের কোটায়’ নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি এলেও হত্যাকাণ্ড পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব
সীমান্ত হত্যা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অন্যতম জটিল কূটনৈতিক ইস্যু। প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের পর ঢাকার পক্ষ থেকে কড়া প্রতিবাদ জানানো হয়। বিজিবি-বিএসএফের পতাকা বৈঠক হয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং ভারত তদন্তের আশ্বাস দেয়। তবে অধিকাংশ ঘটনায় দৃশ্যমান বিচার বা জবাবদিহি না থাকায় সমালোচনা রয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে, দায়মুক্তির সংস্কৃতিই এই সহিংসতাকে টিকিয়ে রেখেছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সীমান্ত হত্যার ঘটনায় ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনারকে তলব করা হয়। এ নিয়ে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কেও উত্তেজনা তৈরি হয়।

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে নতুন বাস্তবতা
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া ও নজরদারি ইস্যুতে নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তে নতুন করে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের ঘোষণাও দিয়েছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্তে বাড়তি সামরিকীকরণ পরিস্থিতিকে আরও উত্তেজনাপূর্ণ করে তুলতে পারে। কারণ এর সরাসরি প্রভাব পড়ে সীমান্তবাসীর জীবন-জীবিকা, কৃষিজমি ও স্বাভাবিক যাতায়াতের ওপর।

সীমান্তে বিজিবির হাতে ভারতীয় নিহত
ভারতীয় সীমান্ত বাহিনী বিএসএফের হাতে প্রতিনিয়ত বাংলাদেশি নাগরিকের প্রাণহানি হলেও বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবির হাতে ভারতীয় নাগরিক নিহতের ঘটনা খুব বিরল। তবে অতীতে এমন কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাও ঘটেছে।

২০২০ সালে ময়মনসিংয়ের হালুয়াঘাট সীমান্তে বিজিবির গুলিতে ভারতীয় নাগরিক থিদিয়ান মোমিন, ২০১৯ সালে রাজশাহী সীমান্তে বিজিবির গুলিতে ভারতীয় জওয়ান বিজয় ভান সিং নিহত হন।

ভারতের অন্যান্য সীমান্তে ভিন্ন বাস্তবতা
দক্ষিণ এশিয়ায় দীর্ঘ সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, অনুপ্রবেশ প্রতিরোধ, চোরাচালান ও নিরাপত্তা ইস্যুকে কেন্দ্র করে ভারতের প্রায় সব প্রতিবেশী দেশের সঙ্গেই কমবেশি সীমান্ত উত্তেজনা রয়েছে। তবে প্রাণহানির চিত্র সব সীমান্তে এক নয়।

বিশেষ করে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সবচেয়ে বেশি আলোচিত হলেও পাকিস্তান, মিয়ানমার, চীনসহ অন্যান্য সীমান্তেও বিচ্ছিন্ন প্রাণহানির ঘটনা ঘটে থাকে।

১০ বছরে ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে হতাহতের পরিসংখ্যান
গত এক দশকে ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত ও কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণরেখা ঘিরে সংঘর্ষে উভয় দেশের শতাধিক সেনা ও বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। বিশেষ করে ২০১৬ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। তবে ২০২১ সালের যুদ্ধবিরতি পুনর্বহালের পর হতাহতের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে।

ভারতের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮, ২০১৯ ও ২০২০ এই তিন বছরে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে ১০ হাজার ৭৫২ বার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে। এতে ভারতীয় ৭২ নিরাপত্তা সদস্য ও ৭০ বেসামরিক নাগরিক নিহত হন।

ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, ২০২০ সালে ২৪ ভারতীয় সেনা ও ২২ বেসামরিক ব্যক্তি নিহত হন। ২০২১ সালে নিহত হন ৪ সেনা সদস্য। ২০২২ ও ২০২৩ সালে কার্যত কোনো বড় প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি।

পাকিস্তানের হতাহতের চিত্র
পাকিস্তান সরকার ভারতীয় হামলা ও পাল্টা গোলাগুলিতে হতাহতের পূর্ণাঙ্গ সরকারি পরিসংখ্যান নিয়মিত প্রকাশ করে না। তবে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বিবৃতিতে জানা যায়, গত ১০ বছরে পাকিস্তান অংশেও উল্লেখযোগ্য প্রাণহানি ঘটেছে। বিশেষ করে ২০১৭–২০২০ সময়কালে নিয়ন্ত্রণরেখায় ভারতীয় পাল্টা হামলায় পাকিস্তানি সেনা ও বেসামরিক মিলিয়ে কয়েকশ হতাহতের দাবি করা হয়। তবে এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন।

২০২৫ সালের সাম্প্রতিক বড় সংঘর্ষে পাকিস্তানের অন্তত ১১ সামরিক সদস্য ও ৪০ বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার তথ্য প্রকাশ করে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী।

ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত হত্যা ঠেকাতে একাধিক চুক্তি
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সীমান্তে গোলাগুলি ও হতাহতের ঘটনা কমাতে গত কয়েক দশকে একাধিক চুক্তি ও সমঝোতা হয়েছে। বিশেষ করে কাশ্মীরের লাইন অব কন্ট্রোল-এলওসি এলাকায় সংঘর্ষ ঠেকাতে দুই দেশ যুদ্ধবিরতি চুক্তিও করেছে। তবে এসব চুক্তি থাকা সত্ত্বেও সেখানে সীমান্তে প্রাণহানির ঘটনা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

১৯৭২ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত শিমলা চুক্তি ছিল দুই দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শান্তি চুক্তি। এই চুক্তির মাধ্যমে কাশ্মীরের ‘সিজফায়ার লাইন’-কে ‘লাইন অব কন্ট্রোল’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। উভয় দেশ বিরোধ শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের অঙ্গীকার করে।

এরপর ২০০৩ সালে ভারত ও পাকিস্তান আন্তর্জাতিক সীমান্তে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের বিষয়ে সম্মত হয়। ওই চুক্তির লক্ষ্য ছিল সীমান্তে গোলাগুলি বন্ধ করা এবং বেসামরিক হতাহতের ঘটনা কমানো।

২০১৮ সালে দুই দেশের ডিরেক্টর জেনারেল অব মিলিটারি অপারেশনস আবারও ২০০৩ সালের যুদ্ধবিরতি চুক্তি ‘পূর্ণভাবে বাস্তবায়নের’ ঘোষণা দেন। তখন উভয় পক্ষ সীমান্তে সংযম দেখানো এবং হটলাইন ও ফ্ল্যাগ মিটিংয়ের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানে সম্মত হয়।

পরে ২০২১ সালেও ভারত ও পাকিস্তানের সেনাবাহিনী যৌথ বিবৃতিতে এলওসি’তে সব ধরনের গোলাগুলি বন্ধ রাখার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে।

তবে বাস্তবে সীমান্তে সংঘর্ষ পুরোপুরি থামেনি। ভারত প্রায়ই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাসী অনুপ্রবেশে সহায়তার’ অভিযোগ তোলে। অন্যদিকে পাকিস্তান অভিযোগ করে, ভারতীয় বাহিনী বিনা উসকানিতে গুলি চালায়। এর ফলে দুই দেশের সেনা সদস্যদের পাশাপাশি সীমান্তবর্তী বেসামরিক লোকজনও হতাহত হন।

ভারত-চীন সীমান্তে অপ্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারে চুক্তি
ভারত ও চীনের মধ্যে সীমান্তে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার সীমিত করার বিষয়ে একাধিক চুক্তি রয়েছে। বিশেষ করে ১৯৯৬ সালের একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিতে দুই দেশ নিয়ন্ত্রণরেখা থেকে দুই কিলোমিটারের মধ্যে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার না করার বিষয়ে সম্মত হয়।

১৯৯৬ সালের ২৯ নভেম্বর এই চুক্তি সই হয়। চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধারা অনুযায়ী—কোনো পক্ষ সীমান্তের কাছে গুলি চালাবে না, বিস্ফোরক ব্যবহার করবে না, বিপজ্জনক রাসায়নিক ব্যবহার করবে না, উসকানিমূলক সামরিক আচরণ থেকে বিরত থাকবে। ২০০৫ সালে আরও একটি প্রটোকল সই হয়, যেখানে মুখোমুখি অবস্থায় আত্মসংযম দেখানোর কথা বলা হয় এবং পরিস্থিতি উত্তেজনাকর না করার নির্দেশনা যুক্ত করা হয়।

এই কারণেই ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষে দুই দেশের সেনারা আগ্নেয়াস্ত্রের বদলে লাঠি, কাঁটাতারের মোড়ানো রড ও অন্যান্য অপ্রচলিত অস্ত্র ব্যবহার করেছিল বলে আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক আলোচনা হয়।

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চুক্তিতে পুরোপুরি অস্ত্র নিষিদ্ধ করা হয়নি; মূলত আগ্নেয়াস্ত্র ও বিস্ফোরক ব্যবহার সীমিত করা হয়েছিল, যাতে সীমান্ত সংঘর্ষ পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ না নেয়।

ভারতের অন্যান্য সীমান্তের চিত্র
ভারত-মিয়ানমার সীমান্তে ভারতের প্রধান উদ্বেগ বিদ্রোহী গোষ্ঠীর তৎপরতা, অস্ত্র ও মাদক চোরাচালান। এ সীমান্তে নিরাপত্তা অভিযান ও সংঘাতের ঘটনা ঘটলেও সাধারণ বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির খবর তুলনামূলকভাবে কম পাওয়া যায়।

নেপাল ও ভুটান সীমান্তকে তুলনামূলক শান্ত বলেই বিবেচনা করা হয়। ভারতীয় সরকারের বিভিন্ন তথ্যে দেখা যায়, এই দুই সীমান্তে অনুপ্রবেশ ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঘটনা তুলনামূলক কম। তবে মাঝেমধ্যে চোরাচালান, অপরাধীদের পালিয়ে যাওয়া কিংবা সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত হত্যা, বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. ওবায়দুল হক বাংলানিউজকে বলেন, সীমান্ত হত্যা নিয়ে বাংলাদেশ বরাবরই ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেছে। তবে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকারের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ ও বোঝাপড়ারও প্রয়োজন রয়েছে।

তিনি বলেন, সীমান্ত হত্যা নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগ ভারতকে আরও স্পষ্টভাবে বোঝাতে হবে এবং আলোচনাও অব্যাহত রাখতে হবে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ ও ভারত প্রতিবেশী দেশ। উভয় দেশকেই প্রতিবেশীসুলভ আচরণ করতে হবে। দুই দেশের জনগণের একাংশের মধ্যে ধর্মীয় উন্মাদনা ও বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য সীমান্ত পরিস্থিতিতেও প্রভাব ফেলছে।

তার মতে, দুই দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক না থাকলে সীমান্ত হত্যা পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন।

একই সঙ্গে তিনি সীমান্ত হত্যা বন্ধে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারে কঠোর নিয়ন্ত্রণ, যৌথ তদন্ত ব্যবস্থা, সীমান্ত এলাকায় অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিজিবি-বিএসএফের জবাবদিহি বৃদ্ধি, মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের প্রবেশাধিকার এবং নিয়মিত উচ্চপর্যায়ের সংলাপের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টার বক্তব্য
সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেছেন, সীমান্তে হত্যাকাণ্ড পুরোপুরি বন্ধ হওয়া অনেকাংশে ভারতের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করছে।

তিনি বলেন, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের উন্নতির প্রমাণ হিসেবে ভারত সীমান্ত হত্যা শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনবে বলে আমরা আশা করি।

জাহেদ উর রহমান আরও জানান, বর্তমান সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি এবং প্রযুক্তিনির্ভর সীমান্ত ব্যবস্থাপনার ফলে গত দুই মাসে বিজিবি উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে।

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টার দাবি অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় সীমান্তে সন্ত্রাসী কার্যক্রম দমনে গ্রেপ্তারের হার প্রায় ৭০০ শতাংশ বেড়েছে, সীমান্ত হত্যা প্রায় ৭৫ শতাংশ কমেছে এবং মাদক ও চোরাচালানবিরোধী অভিযানে জব্দের পরিমাণ ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

Tag :
About Author Information

Sirajul Islam

দলীয় নীতি,আদর্শ ভঙ্গের অভিযোগে শ্যামলী সূত্রধরকে বিএনপি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

সীমান্ত হত্যা শূন্যের কোটায় নামবে কবে?

Update Time : 12:47:55 pm, Thursday, 21 May 2026

ডেস্ক রিপোর্ট : চলতি বছরের মে মাসে ভারত সীমান্তে অন্তত পাঁচজন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। গত ১৪ মে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার আমঝোল সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে খাদেমুল হক নামে এক বাংলাদেশি যুবক নিহত হন।

এর আগে ১১ মে ত্রিপুরা সীমান্তে ‘সন্দেহভাজন বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ অভিযোগে বিএসএফের গুলিতে দুইজন নিহত হন।
এছাড়া ৮ মে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার পাথারিয়াদ্বার সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে আরও দুই বাংলাদেশি নিহত এবং কয়েকজন আহত হয়েছেন।

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত পৃথিবীর অন্যতম দীর্ঘ স্থলসীমান্ত। প্রায় ৪ হাজার ১৫৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সীমান্তকে অতীতে দুই দেশের সরকার ‘বন্ধুত্বের সীমান্ত হিসেবে তুলে ধরলেও বাস্তবে এটি বহু বছর ধরে প্রাণহানির এক ভয়াবহ করিডোরে পরিণত হয়েছে।

সীমান্তে গুলি, নির্যাতন, আটক, অপহরণ এবং কাঁটাতারে ঝুলন্ত লাশের মতো ঘটনা দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে সংবেদনশীল ইস্যুগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, সীমান্ত হত্যা কমানোর বহু প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতি হয়নি।

বিশেষ করে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং দায়মুক্তির সংস্কৃতির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। উভয় দেশই বহুবার সীমান্ত হত্যা ‘শূন্যের কোটায়’ নামিয়ে আনার অঙ্গীকার করেছে। তবে বাস্তব চিত্র এখনও সেই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সীমান্তে মৃত্যুর পরিসংখ্যান কী বলছে
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে বিএসএফের হাতে অন্তত ৩০৫ বাংলাদেশি নিহত এবং ২৮২ জন আহত হয়েছেন। শুধু ২০২৪ সালেই নিহত হন ২৬ জন বাংলাদেশি।

অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বহু বছর ধরেই অভিযোগ করে আসছে যে, সীমান্ত এলাকায় বিএসএফ অবাধে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করছে। সংস্থাটির ২০১০ সালের বহুল আলোচিত ‘ট্রিগার হ্যাপি’ প্রতিবেদনে বলা হয়, সন্দেহভাজন চোরাকারবারি বা অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধেও প্রায়ই প্রাণঘাতী গুলি ব্যবহার করা হয়েছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিএসএফের হাতে ৩৪ বাংলাদেশি নিহত হন, যা আগের পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। সংস্থাটির তথ্যে আরও দেখা যায়, ২০২৪ সালে নিহত হন ৩০ জন, ২০২৩ সালে ৩১ জন, ২০২২ সালে ২৩ জন এবং ২০২১ সালে ১৮ জন। আর ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত সীমান্তে অন্তত ৯ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

কেন ঘটে সীমান্ত হত্যা
সীমান্তে প্রাণহানির পেছনে কয়েকটি কারণ বারবার সামনে এসেছে। গরু ও পণ্যের চোরাচালান, অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগ, মাদক পাচার, সীমান্তের অস্পষ্ট চিহ্ন এবং সীমান্তনির্ভর দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবিকা—এসব বিষয়কে কেন্দ্র করেই উত্তেজনা তৈরি হয়।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার দাবি, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিহতরা নিরস্ত্র সাধারণ মানুষ। অনেক সময় কৃষিকাজ, গরু আনা-নেওয়া কিংবা আত্মীয়ের বাড়িতে যাতায়াতের সময়ও তারা গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।

তবে ভারতের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, সীমান্তরক্ষীরা আত্মরক্ষার্থে কিংবা চোরাকারবারিদের হামলার মুখে গুলি চালাতে বাধ্য হন। বিএসএফ প্রায়ই সীমান্ত অপরাধ, পাচার এবং অবৈধ অনুপ্রবেশকে কঠোর অবস্থানের কারণ হিসেবে তুলে ধরে।

ফেলানী: যে ছবি বদলে দিয়েছিল বিশ্বদৃষ্টি
২০১১ সালে কুড়িগ্রাম সীমান্তে কিশোরী ফেলানী খাতুনের কাঁটাতারে ঝুলন্ত লাশের ছবি আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ওই ঘটনা সীমান্ত হত্যার প্রতীক হয়ে ওঠে। আজও ফেলানীর ছবি বাংলাদেশের মানুষের কাছে সীমান্ত বাস্তবতার এক নির্মম স্মারক।

এরপর বহুবার দুই দেশের শীর্ষ পর্যায় থেকে সীমান্ত হত্যা ‘শূন্যের কোটায়’ নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি এলেও হত্যাকাণ্ড পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব
সীমান্ত হত্যা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অন্যতম জটিল কূটনৈতিক ইস্যু। প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের পর ঢাকার পক্ষ থেকে কড়া প্রতিবাদ জানানো হয়। বিজিবি-বিএসএফের পতাকা বৈঠক হয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং ভারত তদন্তের আশ্বাস দেয়। তবে অধিকাংশ ঘটনায় দৃশ্যমান বিচার বা জবাবদিহি না থাকায় সমালোচনা রয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে, দায়মুক্তির সংস্কৃতিই এই সহিংসতাকে টিকিয়ে রেখেছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সীমান্ত হত্যার ঘটনায় ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনারকে তলব করা হয়। এ নিয়ে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কেও উত্তেজনা তৈরি হয়।

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে নতুন বাস্তবতা
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া ও নজরদারি ইস্যুতে নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তে নতুন করে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের ঘোষণাও দিয়েছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্তে বাড়তি সামরিকীকরণ পরিস্থিতিকে আরও উত্তেজনাপূর্ণ করে তুলতে পারে। কারণ এর সরাসরি প্রভাব পড়ে সীমান্তবাসীর জীবন-জীবিকা, কৃষিজমি ও স্বাভাবিক যাতায়াতের ওপর।

সীমান্তে বিজিবির হাতে ভারতীয় নিহত
ভারতীয় সীমান্ত বাহিনী বিএসএফের হাতে প্রতিনিয়ত বাংলাদেশি নাগরিকের প্রাণহানি হলেও বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবির হাতে ভারতীয় নাগরিক নিহতের ঘটনা খুব বিরল। তবে অতীতে এমন কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাও ঘটেছে।

২০২০ সালে ময়মনসিংয়ের হালুয়াঘাট সীমান্তে বিজিবির গুলিতে ভারতীয় নাগরিক থিদিয়ান মোমিন, ২০১৯ সালে রাজশাহী সীমান্তে বিজিবির গুলিতে ভারতীয় জওয়ান বিজয় ভান সিং নিহত হন।

ভারতের অন্যান্য সীমান্তে ভিন্ন বাস্তবতা
দক্ষিণ এশিয়ায় দীর্ঘ সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, অনুপ্রবেশ প্রতিরোধ, চোরাচালান ও নিরাপত্তা ইস্যুকে কেন্দ্র করে ভারতের প্রায় সব প্রতিবেশী দেশের সঙ্গেই কমবেশি সীমান্ত উত্তেজনা রয়েছে। তবে প্রাণহানির চিত্র সব সীমান্তে এক নয়।

বিশেষ করে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সবচেয়ে বেশি আলোচিত হলেও পাকিস্তান, মিয়ানমার, চীনসহ অন্যান্য সীমান্তেও বিচ্ছিন্ন প্রাণহানির ঘটনা ঘটে থাকে।

১০ বছরে ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে হতাহতের পরিসংখ্যান
গত এক দশকে ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত ও কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণরেখা ঘিরে সংঘর্ষে উভয় দেশের শতাধিক সেনা ও বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। বিশেষ করে ২০১৬ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। তবে ২০২১ সালের যুদ্ধবিরতি পুনর্বহালের পর হতাহতের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে।

ভারতের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮, ২০১৯ ও ২০২০ এই তিন বছরে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে ১০ হাজার ৭৫২ বার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে। এতে ভারতীয় ৭২ নিরাপত্তা সদস্য ও ৭০ বেসামরিক নাগরিক নিহত হন।

ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, ২০২০ সালে ২৪ ভারতীয় সেনা ও ২২ বেসামরিক ব্যক্তি নিহত হন। ২০২১ সালে নিহত হন ৪ সেনা সদস্য। ২০২২ ও ২০২৩ সালে কার্যত কোনো বড় প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি।

পাকিস্তানের হতাহতের চিত্র
পাকিস্তান সরকার ভারতীয় হামলা ও পাল্টা গোলাগুলিতে হতাহতের পূর্ণাঙ্গ সরকারি পরিসংখ্যান নিয়মিত প্রকাশ করে না। তবে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বিবৃতিতে জানা যায়, গত ১০ বছরে পাকিস্তান অংশেও উল্লেখযোগ্য প্রাণহানি ঘটেছে। বিশেষ করে ২০১৭–২০২০ সময়কালে নিয়ন্ত্রণরেখায় ভারতীয় পাল্টা হামলায় পাকিস্তানি সেনা ও বেসামরিক মিলিয়ে কয়েকশ হতাহতের দাবি করা হয়। তবে এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন।

২০২৫ সালের সাম্প্রতিক বড় সংঘর্ষে পাকিস্তানের অন্তত ১১ সামরিক সদস্য ও ৪০ বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার তথ্য প্রকাশ করে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী।

ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত হত্যা ঠেকাতে একাধিক চুক্তি
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সীমান্তে গোলাগুলি ও হতাহতের ঘটনা কমাতে গত কয়েক দশকে একাধিক চুক্তি ও সমঝোতা হয়েছে। বিশেষ করে কাশ্মীরের লাইন অব কন্ট্রোল-এলওসি এলাকায় সংঘর্ষ ঠেকাতে দুই দেশ যুদ্ধবিরতি চুক্তিও করেছে। তবে এসব চুক্তি থাকা সত্ত্বেও সেখানে সীমান্তে প্রাণহানির ঘটনা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

১৯৭২ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত শিমলা চুক্তি ছিল দুই দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শান্তি চুক্তি। এই চুক্তির মাধ্যমে কাশ্মীরের ‘সিজফায়ার লাইন’-কে ‘লাইন অব কন্ট্রোল’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। উভয় দেশ বিরোধ শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের অঙ্গীকার করে।

এরপর ২০০৩ সালে ভারত ও পাকিস্তান আন্তর্জাতিক সীমান্তে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের বিষয়ে সম্মত হয়। ওই চুক্তির লক্ষ্য ছিল সীমান্তে গোলাগুলি বন্ধ করা এবং বেসামরিক হতাহতের ঘটনা কমানো।

২০১৮ সালে দুই দেশের ডিরেক্টর জেনারেল অব মিলিটারি অপারেশনস আবারও ২০০৩ সালের যুদ্ধবিরতি চুক্তি ‘পূর্ণভাবে বাস্তবায়নের’ ঘোষণা দেন। তখন উভয় পক্ষ সীমান্তে সংযম দেখানো এবং হটলাইন ও ফ্ল্যাগ মিটিংয়ের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানে সম্মত হয়।

পরে ২০২১ সালেও ভারত ও পাকিস্তানের সেনাবাহিনী যৌথ বিবৃতিতে এলওসি’তে সব ধরনের গোলাগুলি বন্ধ রাখার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে।

তবে বাস্তবে সীমান্তে সংঘর্ষ পুরোপুরি থামেনি। ভারত প্রায়ই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাসী অনুপ্রবেশে সহায়তার’ অভিযোগ তোলে। অন্যদিকে পাকিস্তান অভিযোগ করে, ভারতীয় বাহিনী বিনা উসকানিতে গুলি চালায়। এর ফলে দুই দেশের সেনা সদস্যদের পাশাপাশি সীমান্তবর্তী বেসামরিক লোকজনও হতাহত হন।

ভারত-চীন সীমান্তে অপ্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারে চুক্তি
ভারত ও চীনের মধ্যে সীমান্তে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার সীমিত করার বিষয়ে একাধিক চুক্তি রয়েছে। বিশেষ করে ১৯৯৬ সালের একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিতে দুই দেশ নিয়ন্ত্রণরেখা থেকে দুই কিলোমিটারের মধ্যে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার না করার বিষয়ে সম্মত হয়।

১৯৯৬ সালের ২৯ নভেম্বর এই চুক্তি সই হয়। চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধারা অনুযায়ী—কোনো পক্ষ সীমান্তের কাছে গুলি চালাবে না, বিস্ফোরক ব্যবহার করবে না, বিপজ্জনক রাসায়নিক ব্যবহার করবে না, উসকানিমূলক সামরিক আচরণ থেকে বিরত থাকবে। ২০০৫ সালে আরও একটি প্রটোকল সই হয়, যেখানে মুখোমুখি অবস্থায় আত্মসংযম দেখানোর কথা বলা হয় এবং পরিস্থিতি উত্তেজনাকর না করার নির্দেশনা যুক্ত করা হয়।

এই কারণেই ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষে দুই দেশের সেনারা আগ্নেয়াস্ত্রের বদলে লাঠি, কাঁটাতারের মোড়ানো রড ও অন্যান্য অপ্রচলিত অস্ত্র ব্যবহার করেছিল বলে আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক আলোচনা হয়।

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চুক্তিতে পুরোপুরি অস্ত্র নিষিদ্ধ করা হয়নি; মূলত আগ্নেয়াস্ত্র ও বিস্ফোরক ব্যবহার সীমিত করা হয়েছিল, যাতে সীমান্ত সংঘর্ষ পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ না নেয়।

ভারতের অন্যান্য সীমান্তের চিত্র
ভারত-মিয়ানমার সীমান্তে ভারতের প্রধান উদ্বেগ বিদ্রোহী গোষ্ঠীর তৎপরতা, অস্ত্র ও মাদক চোরাচালান। এ সীমান্তে নিরাপত্তা অভিযান ও সংঘাতের ঘটনা ঘটলেও সাধারণ বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির খবর তুলনামূলকভাবে কম পাওয়া যায়।

নেপাল ও ভুটান সীমান্তকে তুলনামূলক শান্ত বলেই বিবেচনা করা হয়। ভারতীয় সরকারের বিভিন্ন তথ্যে দেখা যায়, এই দুই সীমান্তে অনুপ্রবেশ ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঘটনা তুলনামূলক কম। তবে মাঝেমধ্যে চোরাচালান, অপরাধীদের পালিয়ে যাওয়া কিংবা সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত হত্যা, বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. ওবায়দুল হক বাংলানিউজকে বলেন, সীমান্ত হত্যা নিয়ে বাংলাদেশ বরাবরই ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেছে। তবে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকারের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ ও বোঝাপড়ারও প্রয়োজন রয়েছে।

তিনি বলেন, সীমান্ত হত্যা নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগ ভারতকে আরও স্পষ্টভাবে বোঝাতে হবে এবং আলোচনাও অব্যাহত রাখতে হবে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ ও ভারত প্রতিবেশী দেশ। উভয় দেশকেই প্রতিবেশীসুলভ আচরণ করতে হবে। দুই দেশের জনগণের একাংশের মধ্যে ধর্মীয় উন্মাদনা ও বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য সীমান্ত পরিস্থিতিতেও প্রভাব ফেলছে।

তার মতে, দুই দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক না থাকলে সীমান্ত হত্যা পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন।

একই সঙ্গে তিনি সীমান্ত হত্যা বন্ধে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারে কঠোর নিয়ন্ত্রণ, যৌথ তদন্ত ব্যবস্থা, সীমান্ত এলাকায় অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিজিবি-বিএসএফের জবাবদিহি বৃদ্ধি, মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের প্রবেশাধিকার এবং নিয়মিত উচ্চপর্যায়ের সংলাপের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টার বক্তব্য
সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেছেন, সীমান্তে হত্যাকাণ্ড পুরোপুরি বন্ধ হওয়া অনেকাংশে ভারতের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করছে।

তিনি বলেন, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের উন্নতির প্রমাণ হিসেবে ভারত সীমান্ত হত্যা শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনবে বলে আমরা আশা করি।

জাহেদ উর রহমান আরও জানান, বর্তমান সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি এবং প্রযুক্তিনির্ভর সীমান্ত ব্যবস্থাপনার ফলে গত দুই মাসে বিজিবি উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে।

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টার দাবি অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় সীমান্তে সন্ত্রাসী কার্যক্রম দমনে গ্রেপ্তারের হার প্রায় ৭০০ শতাংশ বেড়েছে, সীমান্ত হত্যা প্রায় ৭৫ শতাংশ কমেছে এবং মাদক ও চোরাচালানবিরোধী অভিযানে জব্দের পরিমাণ ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।