ডেস্ক রিপোর্ট : বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কিংবদন্তি কৌতুক অভিনেতাদের একজন দিলদার। একটা সময় যার উপস্থিতিতে প্রেক্ষাগৃহে বইতো হাসির ঝরনাধারা, দর্শকদের উচ্ছ্বাস। কমেডিয়ান হলেও বাংলা সিনেমার আর পাঁচজন নায়কদের মতোই ছিল তার জনপ্রিয়তা। কিন্তু ২০০৩ সালের আজকের এই দিনে (১৩ জুলাই) দর্শকের মুখের হাসি কেড়ে নিয়ে পাড়ি দেন না ফেরার দেশে। এই কিংবদন্তির মৃত্যর ২২ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনও তাকে স্মরণ করেন দর্শকেরা। দিলদার শুধু পর্দায় নয়, বাস্তব জীবনেও ছিলেন সকলের মন জয় করা একজন মানুষ। চাঁদপুরে জন্ম নেওয়া এই শিল্পীর প্রকৃত নাম দেলোয়ার হোসেন।
সিনেমায় এসে হয়ে গেলেন ‘দিলদার’। মাত্র ২০ বছর বয়সে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো এই মানুষটি প্রথম বড় পর্দায় সুযোগ পান ১৯৭২ সালে, ‘কেন এমন হয়’ সিনেমার মাধ্যমে। এরপর তিনি হয়ে ওঠেন ঢালিউডের অবিচ্ছেদ্য অংশ; যার অনুপস্থিতি বার বার বুঝিয়ে দিয়েছে তার শূন্যতা কতখানি।
দিলদার শুধু অভিনেতা ছিলেন না, ছিলেন প্রাণবন্ত একজন মানুষও। শুটিং সেটে থাকতেন প্রাণখোলা হাসিতে ভরা, সহশিল্পীদের উৎসাহ দিতেন, সাহস জোগাতেন। এমনকি একবার মালেক আফসারীর ‘লাল বাদশা’ ছবির জন্য ‘শুধু ডিম দিয়ে পরিচয়’ গানটিও নিজেই গেয়েছিলেন, যেটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
দিলদারের জনপ্রিয়তা এতটাই তুঙ্গে ছিল যে, তাকে নায়ক করেই নির্মাণ করা হয়েছিল ‘আব্দুল্লাহ’ নামে একটি চলচ্চিত্র। তোজাম্মেল হক বকুলের কাছ থেকে ছবিতে নায়ক হওয়ার প্রস্তাব পেয়ে অবাক হয়েছিলেন দিলদার।
বলেছিলেন, ‘আপনি কি আমার পেটে লাথি দিতে আসছেন?’ অনেক অনুরোধের পর রাজি হন তিনি। তবে তার বিপরীতে কে হবেন নায়িকা? এ নিয়ে সৃষ্টি হয়েছিল জটিলতা। প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন মৌসুমী, শাবনূরসহ বেশ কয়েকজন নায়িকা। এরপর নূতনের কাছে প্রস্তাব গেলে সম্মতি জানান তিনি। এরপর থেকে নূতনের কাছে অনেক ফোন আসতে শুরু করে, তিনি যেন সিনেমাটি না করেন! কিন্তু দমে যাননি নূতন।
সিনেমাটি তৈরির পরেও নির্মাতা ও প্রযোজক ছিলেন ভয়ের মধ্যে। কেন দিলদারকে নিয়ে এই ঝুঁকি নিয়েছেন, হলমালিকদের কাছ থেকেও শুনতে হয়েছে এমন প্রশ্ন। তবে মুক্তির পর বদলে যায় দৃশ্যপট। প্রথম দিন থেকে হলে ভিড় জমায় দর্শক। প্রথম এবং শেষবারের মতো কোনো সিনেমায় নায়ক হয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছিলেন ‘কমেডি কিং’ দিলদার।
প্রযোজক জানান, সে সময় আব্দুল্লাহ প্রায় ৫ কোটি টাকার ব্যবসা করেছিল। শুধু দিলদারকে দেখতেই হলে ছুটে এসেছিলেন দর্শক।
সিনেমায় ব্যস্ত থাকলেও পরিবারের প্রতি সমান দায়িত্বশীল ছিলেন দিলদার। কখনোই রাত ১০টার পরে শুটিং সেটে থাকতেন না। ফিরে যেতেন বাড়িতে।
পরিবারের অর্থনৈতিক দিকটাও সব সময় মাথায় রাখতেন। এই অভিনেতা দুই কন্যা সন্তানের জনক। দিলদারের স্ত্রী রোকেয়া বেগম সুস্থ আছেন। বর্তমানে তিনি স্বামীর রেখে যাওয়া বাড়িতেই থাকেন।
দিলদারের প্রতি দর্শকের ভালোবাসা তো ছিলোই, পাশাপাশি ‘তুমি শুধু আমার’ ছবির জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন । এই পুরস্কার শুধু তার প্রতিভার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি হলেও আসল সম্মান তিনি পেয়েছেন জনমানুষের হৃদয় থেকেই।
১৯৭২ সালের ‘কেন এমন হয়’ সিনেমার পর ‘বেদের মেয়ে জোসনা’, ‘বিক্ষোভ’, ‘চাওয়া থেকে পাওয়া, ‘অন্তরে অন্তরে’, ‘শুধু তুমি’, ‘আনন্দ অশ্রু’, ‘অজান্তে’, ‘প্রিয়জন’, ‘স্বপ্নের নায়ক’, ‘প্রাণের চেয়ে প্রিয়’, ‘নাচনেওয়ালী’ ইত্যাদি সিনেমায় অভিনয় করে দর্শক মাতিয়েছেন দিলদার।

নিজস্ব প্রতিবেদক 



























