10:49 am, Thursday, 22 October 2026

মানুষের সঙ্গে প্রতারণা ঠেকাতে কঠিন শাস্তি

চলতি বছরেই দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে অন্তত দুই ডজন এনজিওর বিরুদ্ধে গ্রাহকের কোটি কোটি টাকা নিয়ে উধাও হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। দিনমজুর, কৃষক, ভ্যানচালক, বিধবা-কেউই রেহাই পায়নি এসব প্রতারকের খপ্পর থেকে। এ নিয়ে থানায় অভিযোগ, সংবাদ সম্মেলন, মানববন্ধন সবকিছুই করেছেন ভুক্তভোগীরা। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মেলেনি হারিয়ে যাওয়া অর্থ। ছোটখাটো অনেক অভিযোগ আলোচনায়ই আসেনি।

জানা গেছে, গত দশ বছরে গ্রাহকের টাকা নিয়ে উধাও হয়েছে শতাধিক ভুয়া এনজিও। পর্যলোচনায় দেখা যায়, মূলত গ্রামের দরিদ্র, কম শিক্ষিত মানুষদের টার্গেট করেই গজিয়ে উঠছে এসব এনজিও। চাকরি, প্রশিক্ষণের পাশাপাশি কাজের ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা, অল্পসুদে বড় অঙ্কের ঋণ, টাকা জমা রাখলে ব্যাংকের চেয়ে দুই-তিন গুণ মুনাফা নেওয়া ইত্যাদি প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ হাতিয়ে নিয়েই লাপাত্তা হচ্ছে এসব এনজিও।

যেখানে দারিদ্র্য বেশি, শিক্ষার হার কম, সেখানেই ভুয়া এনজিওর ছড়াছড়ি। ধরা পড়ার আশংকায় কিছু প্রতিষ্ঠান দুই সপ্তাহের মধ্যেই অফিস গুটিয়ে গা ঢাকা দিচ্ছে। প্রতারিত গ্রাহকরা বলছেন, ভুয়া এনজিওগুলো নকল কাগজপত্র দেখাচ্ছে, যা যাচাই করা গ্রামের কম শিক্ষিত দরিদ্র মানুষগুলোর পক্ষে সম্ভব নয়। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর চোখের সামনেই এসব প্রতিষ্ঠানের অফিস গড়ে ওঠায় সেগুলো বৈধ বলেই মনে করছেন গ্রাহকরা।

সমাজে প্রতারণার ঘটনা মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইদানিং প্রতারণা নানা কায়দায় ও মাত্রায় হচ্ছে। এক শ্রেণির অসহায় মানুষ জিম্মি হয়ে পড়েছে প্রতারকদের কাছে। সঞ্চয়ের নামে, চাকরি দেয়ার নামে, বিনিয়োগের নামে ইত্যাদি নানা উপায়ে নানা ধরনের হায় হায় কোম্পানি এসব আত্মসাৎ ঘটনার সঙ্গে জড়িত। কেউ কেউ সর্বস্ব খোয়াচ্ছে। এক প্রতিবেদনে প্রকাশ, রিটেইল চেইনশপ স্বপ্নতে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণা করার অভিযোগে চারজনকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এর সিটি সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিম। এ সময় তাদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন ও সিমসহ বেশ কিছু কাগজ জব্দ করা হয়। এর আগে প্রতারণা করে মানুষের ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেওয়া চক্রের মূলহোতাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। প্রতারণার শিকার এক ব্যক্তির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সিআইডি অভিযান পরিচালনা করে।

এমন প্রতারণার ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। বর্তমানে বাংলাদেশের আর্থ সামাজিক, রাজনৈতিক ও পারিবারিক অবস্থা এমন, মানুষ খুব সহজেই একে অপরের সঙ্গে প্রতারণা করতে পারে। প্রতারণার মাত্রা এখন এতটাই প্রবল যে, এটা বড় ধরনের অপরাধ হিসেবে গণ্য। এর ফলে মানুষ যেমন একে অপরের প্রতি বিশ্বাস হারিয়েছে। দিনে দিনে বৈষম্য ও অস্থিরতা বাড়ছে।

প্রশ্ন হচ্ছে আমরা নিজেদের এই অধঃপতনের জায়গায় কীভাবে নিয়ে এলাম। এটা এক দিনে গড়ে ওঠেনি। কথায় বলে দুর্জনের ছলের অভাব নেই। পোশাকের বাহার, কথার বাহার, ক্ষমতা ও টাকার জাদু এবং নানা রকম প্রলোভন সামনে এলে মানুষকে মোহগ্রস্ত করে ফেলে প্রতারকরা। এরা বিভিন্ন নামে ও পেশায় তাদের পরিচয় দেয়। প্রশাসন বা ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে, সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠতা এটাও প্রমাণ করতে চায় এবং মানুষকে বিশ্বাসও করায়। এরা এলাকায় দাতা ও জনদরিদ হিসেবে পরিচিত ও সমাদৃত। এর শিকার হয় দেশের অসহায় মানুষ। প্রতারকদের পাল্লায় পড়ে এ দেশের অনেকেই নিঃস্ব হয়ে পথে বসেছে। আসলে আমরা আজ যে সমাজে বাস করছি সে সমাজ আমাদের নিরাপত্তা দিতে পারছে না, আসলে যে রাষ্ট্রে বাস করছি সে রাষ্ট্রও নিরাপত্তাদানে অপারগ। আমরা নানারকম সামাজিক এবং রাষ্ট্রিক সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করেও বারবার ব্যর্থ হচ্ছি।

পা পিছলে ক্রমান্বয়ে নিচের দিকে গড়িয়ে পড়ে যাচ্ছি। সমাজের একজন সুস্থ এবং বিবেকগণ মানুষ হিসেবে এমন পরিস্থিতিতে আমাদের করণীয় কী তা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। কি সামাজিক ক্ষেত্রে, কি রাজনৈতিক ক্ষেত্রে-সবক্ষেত্রেই অবক্ষয় চোখে পড়ছে। এজন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে সুশাসন প্রতিষ্ঠা দরকার। সবাইকে জবাবদিহিতার মধ্যে আনতে হবে। মনে রাখতে হবে, দেশের সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করা গর্হিত অপরাধ। এসব প্রতারণার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত।

Tag :
About Author Information

Sirajul Islam

Popular Post

দলীয় নীতি,আদর্শ ভঙ্গের অভিযোগে শ্যামলী সূত্রধরকে বিএনপি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

মানুষের সঙ্গে প্রতারণা ঠেকাতে কঠিন শাস্তি

Update Time : 02:02:30 pm, Tuesday, 6 December 2022
চলতি বছরেই দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে অন্তত দুই ডজন এনজিওর বিরুদ্ধে গ্রাহকের কোটি কোটি টাকা নিয়ে উধাও হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। দিনমজুর, কৃষক, ভ্যানচালক, বিধবা-কেউই রেহাই পায়নি এসব প্রতারকের খপ্পর থেকে। এ নিয়ে থানায় অভিযোগ, সংবাদ সম্মেলন, মানববন্ধন সবকিছুই করেছেন ভুক্তভোগীরা। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মেলেনি হারিয়ে যাওয়া অর্থ। ছোটখাটো অনেক অভিযোগ আলোচনায়ই আসেনি।

জানা গেছে, গত দশ বছরে গ্রাহকের টাকা নিয়ে উধাও হয়েছে শতাধিক ভুয়া এনজিও। পর্যলোচনায় দেখা যায়, মূলত গ্রামের দরিদ্র, কম শিক্ষিত মানুষদের টার্গেট করেই গজিয়ে উঠছে এসব এনজিও। চাকরি, প্রশিক্ষণের পাশাপাশি কাজের ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা, অল্পসুদে বড় অঙ্কের ঋণ, টাকা জমা রাখলে ব্যাংকের চেয়ে দুই-তিন গুণ মুনাফা নেওয়া ইত্যাদি প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ হাতিয়ে নিয়েই লাপাত্তা হচ্ছে এসব এনজিও।

যেখানে দারিদ্র্য বেশি, শিক্ষার হার কম, সেখানেই ভুয়া এনজিওর ছড়াছড়ি। ধরা পড়ার আশংকায় কিছু প্রতিষ্ঠান দুই সপ্তাহের মধ্যেই অফিস গুটিয়ে গা ঢাকা দিচ্ছে। প্রতারিত গ্রাহকরা বলছেন, ভুয়া এনজিওগুলো নকল কাগজপত্র দেখাচ্ছে, যা যাচাই করা গ্রামের কম শিক্ষিত দরিদ্র মানুষগুলোর পক্ষে সম্ভব নয়। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর চোখের সামনেই এসব প্রতিষ্ঠানের অফিস গড়ে ওঠায় সেগুলো বৈধ বলেই মনে করছেন গ্রাহকরা।

সমাজে প্রতারণার ঘটনা মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইদানিং প্রতারণা নানা কায়দায় ও মাত্রায় হচ্ছে। এক শ্রেণির অসহায় মানুষ জিম্মি হয়ে পড়েছে প্রতারকদের কাছে। সঞ্চয়ের নামে, চাকরি দেয়ার নামে, বিনিয়োগের নামে ইত্যাদি নানা উপায়ে নানা ধরনের হায় হায় কোম্পানি এসব আত্মসাৎ ঘটনার সঙ্গে জড়িত। কেউ কেউ সর্বস্ব খোয়াচ্ছে। এক প্রতিবেদনে প্রকাশ, রিটেইল চেইনশপ স্বপ্নতে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণা করার অভিযোগে চারজনকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এর সিটি সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিম। এ সময় তাদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন ও সিমসহ বেশ কিছু কাগজ জব্দ করা হয়। এর আগে প্রতারণা করে মানুষের ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেওয়া চক্রের মূলহোতাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। প্রতারণার শিকার এক ব্যক্তির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সিআইডি অভিযান পরিচালনা করে।

এমন প্রতারণার ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। বর্তমানে বাংলাদেশের আর্থ সামাজিক, রাজনৈতিক ও পারিবারিক অবস্থা এমন, মানুষ খুব সহজেই একে অপরের সঙ্গে প্রতারণা করতে পারে। প্রতারণার মাত্রা এখন এতটাই প্রবল যে, এটা বড় ধরনের অপরাধ হিসেবে গণ্য। এর ফলে মানুষ যেমন একে অপরের প্রতি বিশ্বাস হারিয়েছে। দিনে দিনে বৈষম্য ও অস্থিরতা বাড়ছে।

প্রশ্ন হচ্ছে আমরা নিজেদের এই অধঃপতনের জায়গায় কীভাবে নিয়ে এলাম। এটা এক দিনে গড়ে ওঠেনি। কথায় বলে দুর্জনের ছলের অভাব নেই। পোশাকের বাহার, কথার বাহার, ক্ষমতা ও টাকার জাদু এবং নানা রকম প্রলোভন সামনে এলে মানুষকে মোহগ্রস্ত করে ফেলে প্রতারকরা। এরা বিভিন্ন নামে ও পেশায় তাদের পরিচয় দেয়। প্রশাসন বা ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে, সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠতা এটাও প্রমাণ করতে চায় এবং মানুষকে বিশ্বাসও করায়। এরা এলাকায় দাতা ও জনদরিদ হিসেবে পরিচিত ও সমাদৃত। এর শিকার হয় দেশের অসহায় মানুষ। প্রতারকদের পাল্লায় পড়ে এ দেশের অনেকেই নিঃস্ব হয়ে পথে বসেছে। আসলে আমরা আজ যে সমাজে বাস করছি সে সমাজ আমাদের নিরাপত্তা দিতে পারছে না, আসলে যে রাষ্ট্রে বাস করছি সে রাষ্ট্রও নিরাপত্তাদানে অপারগ। আমরা নানারকম সামাজিক এবং রাষ্ট্রিক সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করেও বারবার ব্যর্থ হচ্ছি।

পা পিছলে ক্রমান্বয়ে নিচের দিকে গড়িয়ে পড়ে যাচ্ছি। সমাজের একজন সুস্থ এবং বিবেকগণ মানুষ হিসেবে এমন পরিস্থিতিতে আমাদের করণীয় কী তা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। কি সামাজিক ক্ষেত্রে, কি রাজনৈতিক ক্ষেত্রে-সবক্ষেত্রেই অবক্ষয় চোখে পড়ছে। এজন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে সুশাসন প্রতিষ্ঠা দরকার। সবাইকে জবাবদিহিতার মধ্যে আনতে হবে। মনে রাখতে হবে, দেশের সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করা গর্হিত অপরাধ। এসব প্রতারণার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত।