1:25 pm, Monday, 9 March 2026

মাঠের সাংবাদিকদের অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্ননীরব সংবাদ- যোদ্ধাদের প্রাপ্য কোথায়?

শরীফ আহমেদ: নীরব সংবাদ-যোদ্ধাদের প্রাপ্য কোথায়? নির্বাচন এলেই দেশ সরব হয়ে ওঠে। পোস্টার, মিছিল, শ্লোগান, প্রতিশ্রুতি- সবকিছু আলো পায়। রাজনৈতিক দলগুলোর কণ্ঠ উচ্চকিত হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম গরম থাকে, টেলিভিশনের পর্দা ব্যস্ত হয়ে পড়ে বিশ্লেষণে। কিন্তু এই আলোর আড়ালে যে মানুষগুলো সারাদিন ছুটে বেড়ান, তাদের কথা কথজন মনে রাখে? ভোরের কুয়াশা ভেদ করে শুরু হয় তাদের দিন। এক কেন্দ্র থেকে আরেক কেন্দ্রে ছুটে চলা। উত্তেজিত পরিবেশ, অনিশ্চিত পরিস্থিতি, কখনো ঝুঁকি, কখনো অপমান; সবকিছুকে সঙ্গী করেই সাংবাদিকরা সংগ্রহ করেন প্রতিটি খবর। কোথাও বিশৃঙ্খলা, কোথাও সংঘর্ষের আশঙ্কা, কোথাও প্রশাসনিক টানাপোড়েন সবকিছুর মাঝেই তারা খোঁজেন সত্য। জনগণের জানার অধিকার নিশ্চিত করাই তাদের একমাত্র লক্ষ্য।
খেয়ে না খেয়ে, বিশ্রাম ছাড়াই দায়িত্ব পালন করেন তারা। কখনো মোটরসাইকেলে, কখনো পায়ে হেঁটে, কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে একটি নির্ভুল তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা। মাঠের বাস্তবতা যাচাই না করলে যে সংবাদ পূর্ণতা পায় না, এই বোধ থেকেই তাদের অবিরাম ছুটে চলা।
কিন্তু দিনশেষে যখন শিরোনাম প্রকাশিত হয়, যখন পোর্টালে ভিউ বাড়ে, যখন প্রতিষ্ঠান বিজ্ঞাপনের হিসাব কষে, তখন সেই মাঠের সাংবাদিক কোথায় দাঁড়িয়ে থাকেন? আলোচনার কেন্দ্রে থাকেন সম্পাদক, টকশো বিশ্লেষক, স্টুডিও মুখ। অথচ যে মানুষটি রোদে পুড়ে, ঝুঁকি নিয়ে সংবাদটি সংগ্রহ করেছেন তাঁর নাম অনেক সময় খবরের ভেতরেই হারিয়ে যায়।
তাদের প্রাপ্য সম্মানী কি নিশ্চিত?
তাদের নিরাপত্তা কি সুনিশ্চিত?
তাদের শ্রমের ন্যায্য মূল্যায়ন কি সত্যিই হয়?

হয়তো কিছু সুবিধাভোগী ব্যতিক্রম আছেন। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ মাঠের সংবাদকর্মীরা আজও অবহেলিত। বিশেষ করে মফস্বল সাংবাদিকদের সংগ্রাম আরও কঠিন। সীমিত সুযোগ-সুবিধা, অনিশ্চিত পারিশ্রমিক, প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির অভাব; সব মিলিয়ে তারা লড়াই করেন নীরবে। মূল অফিসে বসে থাকা বিভিন্ন বিটের সম্পাদকদের যে কষ্ট করতে হয় না, সেই কষ্টটাই প্রতিদিন বহন করেন মাঠের রিপোর্টাররা। এডিটর সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেন তা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যে সংবাদটি মাঠে-ঘাটে ঘুরে, তথ্য যাচাই করে, ঝুঁকি নিয়ে তৈরি করা হয়, তার মূল্যায়ন কতটুকু?
অনেক ক্ষেত্রেই মাঠ পর্যায়ের সংবাদকর্মীদের কাজ চলে ‘মর্জি’র ওপর। নির্দিষ্ট বেতন নেই, চুক্তি নেই, নিরাপত্তা নেই। কখনো সম্মানীরড় আশ্বাস, কখনো বিজ্ঞাপন আনার চাপ, কখনো প্রভাবশালীদের বিরাগভাজন হওয়ার ভয়- সব মিলিয়ে এক অনিশ্চিত পেশাজীবন। অথচ সংবাদ পরিবেশন করে তারাই গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করেন। তারা রাষ্ট্র ও জনগণের মাঝে তথ্যের সেতুবন্ধন রচনা করেন। তাদের নির্ভীক উপস্থিতি না থাকলে ভোটকেন্দ্রের বাস্তবতা, প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠ, অনিয়মের খবর কিছুই প্রকাশ্যে আসত না। কিন্তু পরিহাস এই যে, গণতন্ত্রের প্রহরী হয়েও নিজেরাই থাকেন অনিরাপদ, অনিশ্চিত ও অবমূল্যায়িত।
খবরের কাগজে রাজনীতির জয়-পরাজয় বিশ্লেষিত হয়, জোট-ভাঙাগড়া নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলে, কিন্তু সাংবাদিকের ন্যায্য অধিকার নিয়ে আলোচনা হয় কথবার? তাদের শ্রমঘণ্টা, ঝুঁকি ভাতা, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, আইনি সহায়তা.. এসব কি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত?
সময় এসেছে স্পষ্ট করে বলার-
গণমাধ্যমের শক্ত ভিত গড়ে ওঠে মাঠের সাংবাদিকদের ঘাম, ত্যাগ ও সততার উপর। তাদের প্রাপ্য মর্যাদা, সুরক্ষা ও ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত না করে শক্তিশালী গণতন্ত্রের কথা বলা কেবলই ভান। নীরব এই সংবাদ-যোদ্ধাদের প্রাপ্য সম্মান ফিরিয়ে দেওয়া এখন আর দয়া নয়, এটি ন্যায্য অধিকার। এ দাবি শুধু সাংবাদিকদের নয়, এটি গণতন্ত্রে বিশ্বাসী প্রতিটি নাগরিকের দাবি।
শরীফ আহমেদ,লেখক ও সাংবাদিক।
মোবাইল : ০১৭১১ ৬৫৩২৪১

Tag :
About Author Information

Sirajul Islam

শ্রীমঙ্গলের রাজনীতিতে ফিরছেন যোশেফ দাশ গুপ্ত যশো: চেয়ারম্যান পদে লড়ার ঘোষণা

মাঠের সাংবাদিকদের অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্ননীরব সংবাদ- যোদ্ধাদের প্রাপ্য কোথায়?

Update Time : 05:52:52 pm, Thursday, 5 March 2026

শরীফ আহমেদ: নীরব সংবাদ-যোদ্ধাদের প্রাপ্য কোথায়? নির্বাচন এলেই দেশ সরব হয়ে ওঠে। পোস্টার, মিছিল, শ্লোগান, প্রতিশ্রুতি- সবকিছু আলো পায়। রাজনৈতিক দলগুলোর কণ্ঠ উচ্চকিত হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম গরম থাকে, টেলিভিশনের পর্দা ব্যস্ত হয়ে পড়ে বিশ্লেষণে। কিন্তু এই আলোর আড়ালে যে মানুষগুলো সারাদিন ছুটে বেড়ান, তাদের কথা কথজন মনে রাখে? ভোরের কুয়াশা ভেদ করে শুরু হয় তাদের দিন। এক কেন্দ্র থেকে আরেক কেন্দ্রে ছুটে চলা। উত্তেজিত পরিবেশ, অনিশ্চিত পরিস্থিতি, কখনো ঝুঁকি, কখনো অপমান; সবকিছুকে সঙ্গী করেই সাংবাদিকরা সংগ্রহ করেন প্রতিটি খবর। কোথাও বিশৃঙ্খলা, কোথাও সংঘর্ষের আশঙ্কা, কোথাও প্রশাসনিক টানাপোড়েন সবকিছুর মাঝেই তারা খোঁজেন সত্য। জনগণের জানার অধিকার নিশ্চিত করাই তাদের একমাত্র লক্ষ্য।
খেয়ে না খেয়ে, বিশ্রাম ছাড়াই দায়িত্ব পালন করেন তারা। কখনো মোটরসাইকেলে, কখনো পায়ে হেঁটে, কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে একটি নির্ভুল তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা। মাঠের বাস্তবতা যাচাই না করলে যে সংবাদ পূর্ণতা পায় না, এই বোধ থেকেই তাদের অবিরাম ছুটে চলা।
কিন্তু দিনশেষে যখন শিরোনাম প্রকাশিত হয়, যখন পোর্টালে ভিউ বাড়ে, যখন প্রতিষ্ঠান বিজ্ঞাপনের হিসাব কষে, তখন সেই মাঠের সাংবাদিক কোথায় দাঁড়িয়ে থাকেন? আলোচনার কেন্দ্রে থাকেন সম্পাদক, টকশো বিশ্লেষক, স্টুডিও মুখ। অথচ যে মানুষটি রোদে পুড়ে, ঝুঁকি নিয়ে সংবাদটি সংগ্রহ করেছেন তাঁর নাম অনেক সময় খবরের ভেতরেই হারিয়ে যায়।
তাদের প্রাপ্য সম্মানী কি নিশ্চিত?
তাদের নিরাপত্তা কি সুনিশ্চিত?
তাদের শ্রমের ন্যায্য মূল্যায়ন কি সত্যিই হয়?

হয়তো কিছু সুবিধাভোগী ব্যতিক্রম আছেন। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ মাঠের সংবাদকর্মীরা আজও অবহেলিত। বিশেষ করে মফস্বল সাংবাদিকদের সংগ্রাম আরও কঠিন। সীমিত সুযোগ-সুবিধা, অনিশ্চিত পারিশ্রমিক, প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির অভাব; সব মিলিয়ে তারা লড়াই করেন নীরবে। মূল অফিসে বসে থাকা বিভিন্ন বিটের সম্পাদকদের যে কষ্ট করতে হয় না, সেই কষ্টটাই প্রতিদিন বহন করেন মাঠের রিপোর্টাররা। এডিটর সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেন তা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যে সংবাদটি মাঠে-ঘাটে ঘুরে, তথ্য যাচাই করে, ঝুঁকি নিয়ে তৈরি করা হয়, তার মূল্যায়ন কতটুকু?
অনেক ক্ষেত্রেই মাঠ পর্যায়ের সংবাদকর্মীদের কাজ চলে ‘মর্জি’র ওপর। নির্দিষ্ট বেতন নেই, চুক্তি নেই, নিরাপত্তা নেই। কখনো সম্মানীরড় আশ্বাস, কখনো বিজ্ঞাপন আনার চাপ, কখনো প্রভাবশালীদের বিরাগভাজন হওয়ার ভয়- সব মিলিয়ে এক অনিশ্চিত পেশাজীবন। অথচ সংবাদ পরিবেশন করে তারাই গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করেন। তারা রাষ্ট্র ও জনগণের মাঝে তথ্যের সেতুবন্ধন রচনা করেন। তাদের নির্ভীক উপস্থিতি না থাকলে ভোটকেন্দ্রের বাস্তবতা, প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠ, অনিয়মের খবর কিছুই প্রকাশ্যে আসত না। কিন্তু পরিহাস এই যে, গণতন্ত্রের প্রহরী হয়েও নিজেরাই থাকেন অনিরাপদ, অনিশ্চিত ও অবমূল্যায়িত।
খবরের কাগজে রাজনীতির জয়-পরাজয় বিশ্লেষিত হয়, জোট-ভাঙাগড়া নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলে, কিন্তু সাংবাদিকের ন্যায্য অধিকার নিয়ে আলোচনা হয় কথবার? তাদের শ্রমঘণ্টা, ঝুঁকি ভাতা, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, আইনি সহায়তা.. এসব কি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত?
সময় এসেছে স্পষ্ট করে বলার-
গণমাধ্যমের শক্ত ভিত গড়ে ওঠে মাঠের সাংবাদিকদের ঘাম, ত্যাগ ও সততার উপর। তাদের প্রাপ্য মর্যাদা, সুরক্ষা ও ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত না করে শক্তিশালী গণতন্ত্রের কথা বলা কেবলই ভান। নীরব এই সংবাদ-যোদ্ধাদের প্রাপ্য সম্মান ফিরিয়ে দেওয়া এখন আর দয়া নয়, এটি ন্যায্য অধিকার। এ দাবি শুধু সাংবাদিকদের নয়, এটি গণতন্ত্রে বিশ্বাসী প্রতিটি নাগরিকের দাবি।
শরীফ আহমেদ,লেখক ও সাংবাদিক।
মোবাইল : ০১৭১১ ৬৫৩২৪১