2:58 am, Friday, 5 June 2026

১০জনের বিরুদ্ধে মামলা, আটক ২: কুলাউড়ায় গারো পুঞ্জিতে দুই সহস্রাধিক পান গাছ কর্তনের অভিযোগ

কুলাউড়া প্রতিনিধি: কুলাউড়া উপজেলার কর্মধা ইউনিয়নে অবস্থিত সাহেবটিলা গারো পুঞ্জিতে পান গাছ কর্তনের অভিযোগে জড়িত দুইজনকে আটক করেছে পুলিশ। বুধবার দুপুরে আটক মাসুক মিয়া (৫০) ও খালিক মিয়া (৪৫) নামের দুইজনকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে প্রেরন করেছে পুলিশ। এর আগে পুঞ্জিতে পান গাছ কর্তনের অভিযোগে জড়িত ১০ জনের বিরুদ্ধে গারোদের পক্ষ থেকে পুঞ্জির বাসিন্দা মলয় রংদী বাদী হয়ে মঙ্গলবার একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার আসামীরা হলেন- কর্মধা ইউনিয়নের নলডরি গ্রামের বাসিন্দা শাহিন আহমদ (৪০), সুন্দর আলী (৬০), ফেরদৌস মোল­া (৪০), ফারুক মিয়া (৪০), দুলন মিয়া (৩৫), মাসুক মিয়া (৫০), আমজাদ মিয়া (৫০), রকিব মিয়া (৫০), জয়নাল মিয়া (৪৫), খালিক মিয়া (৪৫), টিলাবাড়ি গ্রামের হুসন আলী (৪০), সইফুল ইসলাম (৫০) সহ অজ্ঞাত আরো ২৫/৩০ জন।
জানা যায়, গত সোমবার দুপুরে স্থানীয় বনবিটের কর্মকর্তার সহযোগিতায় একদল বহিরাগত লোক সামাজিক বনায়নের নামে হামলা চালিয়ে সাহেব টিলা গারো পুঞ্জির তিনটি পান জুমের প্রায় দুই সহস্রাধিক পান গাছ কর্তন করেন। এর আগে গত এপ্রিল মাসে দুই দফায় ওই পুঞ্জির বাগানের বেশ কিছু পানগাছ কেটে ফেলা হয়েছিল। তবে এ ঘটনায় স্থানীয় গারো স¤প্রদায়ের লোকজনের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
পুঞ্জির লোকজন বলছেন, সোমবার দুপুর ১২টার দিকে তাঁরা বাগান থেকে পান সংগ্রহ করে বাড়ি ফেরেন। হঠাৎ করে তারা শুনতে পান কর্মধা ইউনিয়নের নলডরী গ্রামের শাহিন আহমদ, সুন্দর আলী, ফেরদৌস মোল­া, সইফুল, দুলন ও ফারুক মিয়ার নেতৃত্বে ৩০-৩৫ জন বহিরাগত লোক পুঞ্জিতে প্রবেশ করেন। এসময় তারা পুঞ্জির বাসিন্দা মলয় রংদীর পানের বাগান থেকে ১৫০০ পান গাছ, অলবিট রাংসার পানের বাগান থেকে ৫০০ পান গাছ ও জানু রাংসার পানের জুমের নতুন চারাসহ মোট তিন লক্ষাধিক টাকার ক্ষতিসাধন করেন। এসময় পুঞ্জির নারী-পুরুষ সংঘবদ্ধ হয়ে ধাওয়া করলে তারা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পান গাছ কাটার সত্যতা পায়।
পুঞ্জির মন্ত্রী গ্রিনাল রংদী বলেন, ‘ পুঞ্জির তিন জুমে দুই হাজারের বেশি পানগাছ কেটে ফেলা হয়েছে। পান গাছ কাটার সময় আমরা কয়েকজনকে চিনতে পেরেছি। তাঁদের বাড়ি আশপাশের বিভিন্ন এলাকায়। পুলিশকে তাঁদের নাম-ঠিকানা দিয়েছি। বন বিভাগের সামাজিক বনায়ন কার্যক্রমের সঙ্গে এসব লোক জড়িত। তাঁদের বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।
পুঞ্জির লোকজন আরো জানান, সাহেবটিলা পুঞ্জিতে ১৮ টি গারো পরিবারের বসবাস। পান চাষ করে তাঁদের জীবিকা নির্বাহ হয়। সেখানে প্রায় ৫৫ একর টিলাভূমি তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে ভোগদখল করছেন। ওই জমি নিয়ে বন বিভাগের সঙ্গে তাঁদের বিরোধ চলছে। এ অবস্থায় ১৩ এপ্রিল একদল বহিরাগত লোক পুঞ্জির বাগানে ঢুকে ১৫০টি পান এবং ২০ থেকে ২৫টি বনজ প্রজাতির গাছ কেটে ফেলেন। এ ব্যাপারে পুঞ্জিপ্রধান গ্রিনাল রংদী বাদী হয়ে ১৪ এপ্রিল কয়েকজনের বিরুদ্ধে কুলাউড়া থানায় লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগে বলা হয়, সামাজিক বনায়নের নামে তাঁদের জমি দখলের উদ্দেশ্যে স্থানীয় বন বিভাগ আশপাশের লোকজনের সহযোগিতায় এ কাজটি করায়। এরপর ১৬ এপ্রিল একইভাবে বহিরাগত লোকজন ঢুকে পুঞ্জির পানগাছ কাটতে থাকেন। এ সময় ধাওয়া করে দুই ব্যক্তিকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করা হয়। এ পরিস্থিতিতে ১৭ এপ্রিল উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য একটি বৈঠক হয়। বৈঠকে ঈদুল ফিতরের পর প্রশাসন, পুলিশ ও বন বিভাগের কর্মকর্তারা সরেজমিনে বিরোধপূর্ণ জায়গা পরিদর্শন করে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন বলে সিদ্ধান্ত হয়। এর আগ পর্যন্ত উভয় পক্ষকে শান্তিপূর্ণ অবস্থানে থাকতে বলা হয়। এর আগে বনবিভাগ কর্তৃক সামাজিক বনায়নের সকল কাজ বন্ধ রাখারও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
অভিযুক্ত শাহিন আহমদ পান কাটার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, ঘটনার দিন তিনি অসুস্থ ছিলেন তাহলে কিভাবে পান গাছ কাটতে যাবেন। এটা তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চালানো হচ্ছে।
এ ব্যাপারে কুলাউড়া থানার উপপরিদর্শক আব্দুর রহিম জিবান বলেন, তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পান গাছ কাটার সত্যতা পেয়েছেন। পুঞ্জির লোকদের পক্ষ থেকে জড়িত ১০ জনের বিরুদ্ধে থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। মঙ্গলবার সাড়াঁশি অভিযান চালিয়ে পান গাছ কাটার সাথে জড়িত দুইজনকে আটক করে বুধবার দুপুরে আদালতের মাধ্যমে তাদের জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়। বাকি আসামীদের আটকে পুলিশী অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
বন বিভাগের স্থানীয় নলডরি বিটের কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, এ ঘটনায় বন বিভাগ অথবা সামাজিক বনায়ন কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত কোনো উপকারভোগী জড়িত নন। পুঞ্জির লোকদের মধ্যে দু’পক্ষের বিরোধের কারণে এই ঘটনাটি ঘটেছে। তাছাড়া বনবিভাগের জায়গায় বনবিভাগ সামাজিক বনায়ন করবে এটাই নিয়ম। কিন্তুু পুঞ্জির লোকজন বনবিভাগের জমি দখল করে আছেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এটিএম ফরহাদ চৌধুরী বলেন, সাহেবটিলা পুঞ্জিতে পানগাছ কর্তনের বিষয়টি তিনি জেনেছেন। আগামী সপ্তাহে ওই এলাকায় পুলিশ ও বনবিভাগের কর্মকর্তাদের নিয়ে সরেজমিন পরিদর্শনপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে তিনি জানান।

Tag :
About Author Information

Sirajul Islam

ছুটি নেব কিনা? এত ব্যস্ত হওয়ার কিছু নেই: পররাষ্ট্রমন্ত্রী

১০জনের বিরুদ্ধে মামলা, আটক ২: কুলাউড়ায় গারো পুঞ্জিতে দুই সহস্রাধিক পান গাছ কর্তনের অভিযোগ

Update Time : 10:13:31 am, Wednesday, 19 May 2021

কুলাউড়া প্রতিনিধি: কুলাউড়া উপজেলার কর্মধা ইউনিয়নে অবস্থিত সাহেবটিলা গারো পুঞ্জিতে পান গাছ কর্তনের অভিযোগে জড়িত দুইজনকে আটক করেছে পুলিশ। বুধবার দুপুরে আটক মাসুক মিয়া (৫০) ও খালিক মিয়া (৪৫) নামের দুইজনকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে প্রেরন করেছে পুলিশ। এর আগে পুঞ্জিতে পান গাছ কর্তনের অভিযোগে জড়িত ১০ জনের বিরুদ্ধে গারোদের পক্ষ থেকে পুঞ্জির বাসিন্দা মলয় রংদী বাদী হয়ে মঙ্গলবার একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার আসামীরা হলেন- কর্মধা ইউনিয়নের নলডরি গ্রামের বাসিন্দা শাহিন আহমদ (৪০), সুন্দর আলী (৬০), ফেরদৌস মোল­া (৪০), ফারুক মিয়া (৪০), দুলন মিয়া (৩৫), মাসুক মিয়া (৫০), আমজাদ মিয়া (৫০), রকিব মিয়া (৫০), জয়নাল মিয়া (৪৫), খালিক মিয়া (৪৫), টিলাবাড়ি গ্রামের হুসন আলী (৪০), সইফুল ইসলাম (৫০) সহ অজ্ঞাত আরো ২৫/৩০ জন।
জানা যায়, গত সোমবার দুপুরে স্থানীয় বনবিটের কর্মকর্তার সহযোগিতায় একদল বহিরাগত লোক সামাজিক বনায়নের নামে হামলা চালিয়ে সাহেব টিলা গারো পুঞ্জির তিনটি পান জুমের প্রায় দুই সহস্রাধিক পান গাছ কর্তন করেন। এর আগে গত এপ্রিল মাসে দুই দফায় ওই পুঞ্জির বাগানের বেশ কিছু পানগাছ কেটে ফেলা হয়েছিল। তবে এ ঘটনায় স্থানীয় গারো স¤প্রদায়ের লোকজনের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
পুঞ্জির লোকজন বলছেন, সোমবার দুপুর ১২টার দিকে তাঁরা বাগান থেকে পান সংগ্রহ করে বাড়ি ফেরেন। হঠাৎ করে তারা শুনতে পান কর্মধা ইউনিয়নের নলডরী গ্রামের শাহিন আহমদ, সুন্দর আলী, ফেরদৌস মোল­া, সইফুল, দুলন ও ফারুক মিয়ার নেতৃত্বে ৩০-৩৫ জন বহিরাগত লোক পুঞ্জিতে প্রবেশ করেন। এসময় তারা পুঞ্জির বাসিন্দা মলয় রংদীর পানের বাগান থেকে ১৫০০ পান গাছ, অলবিট রাংসার পানের বাগান থেকে ৫০০ পান গাছ ও জানু রাংসার পানের জুমের নতুন চারাসহ মোট তিন লক্ষাধিক টাকার ক্ষতিসাধন করেন। এসময় পুঞ্জির নারী-পুরুষ সংঘবদ্ধ হয়ে ধাওয়া করলে তারা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পান গাছ কাটার সত্যতা পায়।
পুঞ্জির মন্ত্রী গ্রিনাল রংদী বলেন, ‘ পুঞ্জির তিন জুমে দুই হাজারের বেশি পানগাছ কেটে ফেলা হয়েছে। পান গাছ কাটার সময় আমরা কয়েকজনকে চিনতে পেরেছি। তাঁদের বাড়ি আশপাশের বিভিন্ন এলাকায়। পুলিশকে তাঁদের নাম-ঠিকানা দিয়েছি। বন বিভাগের সামাজিক বনায়ন কার্যক্রমের সঙ্গে এসব লোক জড়িত। তাঁদের বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।
পুঞ্জির লোকজন আরো জানান, সাহেবটিলা পুঞ্জিতে ১৮ টি গারো পরিবারের বসবাস। পান চাষ করে তাঁদের জীবিকা নির্বাহ হয়। সেখানে প্রায় ৫৫ একর টিলাভূমি তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে ভোগদখল করছেন। ওই জমি নিয়ে বন বিভাগের সঙ্গে তাঁদের বিরোধ চলছে। এ অবস্থায় ১৩ এপ্রিল একদল বহিরাগত লোক পুঞ্জির বাগানে ঢুকে ১৫০টি পান এবং ২০ থেকে ২৫টি বনজ প্রজাতির গাছ কেটে ফেলেন। এ ব্যাপারে পুঞ্জিপ্রধান গ্রিনাল রংদী বাদী হয়ে ১৪ এপ্রিল কয়েকজনের বিরুদ্ধে কুলাউড়া থানায় লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগে বলা হয়, সামাজিক বনায়নের নামে তাঁদের জমি দখলের উদ্দেশ্যে স্থানীয় বন বিভাগ আশপাশের লোকজনের সহযোগিতায় এ কাজটি করায়। এরপর ১৬ এপ্রিল একইভাবে বহিরাগত লোকজন ঢুকে পুঞ্জির পানগাছ কাটতে থাকেন। এ সময় ধাওয়া করে দুই ব্যক্তিকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করা হয়। এ পরিস্থিতিতে ১৭ এপ্রিল উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য একটি বৈঠক হয়। বৈঠকে ঈদুল ফিতরের পর প্রশাসন, পুলিশ ও বন বিভাগের কর্মকর্তারা সরেজমিনে বিরোধপূর্ণ জায়গা পরিদর্শন করে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন বলে সিদ্ধান্ত হয়। এর আগ পর্যন্ত উভয় পক্ষকে শান্তিপূর্ণ অবস্থানে থাকতে বলা হয়। এর আগে বনবিভাগ কর্তৃক সামাজিক বনায়নের সকল কাজ বন্ধ রাখারও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
অভিযুক্ত শাহিন আহমদ পান কাটার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, ঘটনার দিন তিনি অসুস্থ ছিলেন তাহলে কিভাবে পান গাছ কাটতে যাবেন। এটা তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চালানো হচ্ছে।
এ ব্যাপারে কুলাউড়া থানার উপপরিদর্শক আব্দুর রহিম জিবান বলেন, তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পান গাছ কাটার সত্যতা পেয়েছেন। পুঞ্জির লোকদের পক্ষ থেকে জড়িত ১০ জনের বিরুদ্ধে থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। মঙ্গলবার সাড়াঁশি অভিযান চালিয়ে পান গাছ কাটার সাথে জড়িত দুইজনকে আটক করে বুধবার দুপুরে আদালতের মাধ্যমে তাদের জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়। বাকি আসামীদের আটকে পুলিশী অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
বন বিভাগের স্থানীয় নলডরি বিটের কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, এ ঘটনায় বন বিভাগ অথবা সামাজিক বনায়ন কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত কোনো উপকারভোগী জড়িত নন। পুঞ্জির লোকদের মধ্যে দু’পক্ষের বিরোধের কারণে এই ঘটনাটি ঘটেছে। তাছাড়া বনবিভাগের জায়গায় বনবিভাগ সামাজিক বনায়ন করবে এটাই নিয়ম। কিন্তুু পুঞ্জির লোকজন বনবিভাগের জমি দখল করে আছেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এটিএম ফরহাদ চৌধুরী বলেন, সাহেবটিলা পুঞ্জিতে পানগাছ কর্তনের বিষয়টি তিনি জেনেছেন। আগামী সপ্তাহে ওই এলাকায় পুলিশ ও বনবিভাগের কর্মকর্তাদের নিয়ে সরেজমিন পরিদর্শনপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে তিনি জানান।