অনলাইন ডেস্ক: মহামারি করোনাভাইরাসের প্রকোপ যখন কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না তখন এর থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার প্রধান মাধ্যম মনে করা হচ্ছে টিকাকে। প্রথমে এই টিকা নেওয়ার প্রতি সাধারণ মানুষের অনীহা থাকলেও এখন তা পাওয়ার জন্য চলছে তীব্র আকাঙ্ক্ষা। কার আগে কে টিকা নিতে পারবে সেটা নিয়ে চলছে প্রতিযোগিতা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে টিকা নিচ্ছে দেশের মানুষ। এক কোটির বেশি মানুষ আছেন টিকার জন্য অপেক্ষায়। টিকা প্রয়োগের ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলার ঘটনাও ঘটছে। এমনকি কোথাও কোথাও হাতাহাতির খবরও পাওয়া গেছে। সরকার গণটিকাদানের ছয় দিনের যে কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল সেটা শেষ হয়েছে বৃহস্পতিবার (১২ আগস্ট)। এদিন লাইনে দাঁড়িয়েও অনেকেই টিকা পাননি। এতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন তারা। গণটিকাদান কর্মসূচি ঘোষণা করলেও কাঙ্ক্ষিত জনগোষ্ঠীকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এখনও দেশে টিকার পর্যাপ্ত মজুদ না থাকায় সেটা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন তারা। তবে চলতি মাসে প্রায় এক কোটি টিকা দেশে আসার কথা। এতে টিকার চাহিদা অনেকটা পূরণ হবে বলে জানিয়েছেন দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা।
এদিকে বৃহস্পতিবার একটি অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, আমরা একবারেই সবাইকে টিকা দিতে পারবো না। আমরা সাধ্যমতো টিকা কিনে আনার চেষ্টা করছি। সবাই টিকা পাবেন। ধৈর্য ধরতে হবে। করোনার টিকা নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতি চলছে এমন অভিযোগ করে জাহিদ মালেক বলেন, ‘টিকা নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতি চলছে। বড় বড় দেশগুলো তাদের জনসংখ্যার চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি টিকা বানিয়ে মজুদ করেছে। করোনার বিরুদ্ধে সুরক্ষা বলয় তৈরি করতে গত শনিবার থেকে দেশজুড়ে ছয় দিনের গণটিকাদান কর্মসূচি শুরু করে সরকার। শেষ দিন বৃহস্পতিবার টিকা নিতে আগ্রহী অনেক মানুষই ভিড় করেছিলেন রাজধানীর টিকাদান কেন্দ্রগুলোতে। কিন্তু অনেককে টিকা না পেয়ে ফিরে আসতে হয়েছে।
রাজধানীর বারিধারার একটি কেন্দ্রে টিকার জন্য লাইনে অপেক্ষা করছিলেন হাসান উদ্দিন। তিন ঘণ্টা পর জানতে পারলেন, সামনের অন্তত একশ লোক টিকা পাবেন না। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘টিকার যথেষ্ট মজুদ না রেখে এভাবে মানুষকে লাইনে এনে দাঁড় করিয়ে রাখার কী মানে। এতে তো করোনা সংক্রমণের আরও বেশি ভয় থাকে। লাইনে দাঁড়ানো জাহানারা হোসনা জানান, সাড়ে তিন ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে টিকা নিতে পেরেছেন। তবে তার সঙ্গে আসা অনেকেই টিকা না পেয়ে ফেরত গেছেন।
এদিকে দেশে আজ পর্যন্ত দুই কোটি ৮৯ হাজার ১০৭ ডোজ করোনার টিকা প্রয়োগ হয়েছে। টিকা নিয়েছেন এক কোটি ৯৬ লাখ ৭১ হাজার ৬২০ জন মানুষ। এর মধ্যে করোনার টিকার প্রথম ডোজ নিয়েছেন এক কোটি ৫০ লাখ ২৩ হাজার ১৬২ জন ও দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছেন ৫০ লাখ ৬৫ হাজার ৯৪৫ জন। এ পর্যন্ত প্রথম ডোজ টিকা গ্রহীতাদের মধ্যে পুরুষ ৮৭ লাখ ৮৪ হাজার ৪৩০ জন। নারী ৬২ লাখ ৩৮ হাজার ৭৩২ জন। দ্বিতীয় ডোজ টিকা গ্রহীতাদের মধ্যে পুরুষ ৩১ লাখ ৯২ হাজার ৮৯৫ জন ও নারী ১৮ লাখ ৭৩ হাজার ৫০ জন। টিকার জন্য নিবন্ধন করেছেন, কিন্তু ম্যাসেজ পাননি এমন মানুষের সংখ্যা এক কোটি ৩০ লাখের উপরে। তারা কবে টিকা পাবেন সেটা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না। যদিও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, নিবন্ধনকারী প্রত্যেকেই টিকা পাবে। কেউ বঞ্চিত হবে না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমএনসিএইচ বিভাগের পরিচালক ডা. মো. শামসুল হক সংবাদমাধ্যমকে বলছেন, যারা টিকা নেওয়ার জন্য নিবন্ধন করেছেন, পর্যায়ক্রমে সবাই পাবেন। ম্যাসেজ না এলে একটু অপেক্ষা করতে হবে। তিনি বলন, ‘নিবন্ধনের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে সবাইকে ম্যাসেজ পাঠানো হয়। নিবন্ধন বেশি হওয়ায় একটু দেরি হতে পারে। কিন্তু পর্যায়ক্রমে সবাই টিকা পাবেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধ্যাপক ডা. মিজানুর রহমান বলেন, ‘টিকা নিবন্ধনের বয়সসীমা কমিয়ে আনার পর থেকেই নিবন্ধন অনেক বেড়ে গেছে। এই কারণে তালিকাও লম্বা হচ্ছে। একটি কেন্দ্রে টিকা দেয়ার যে সক্ষমতা থাকে, তার চেয়ে নিবন্ধন বেশি হচ্ছে। এই কারণে এসএমএস যেতে একটু সময় লাগতে পারে।’
দেশে গত ফেব্রুয়ারি মাসে গণটিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। তবে কিছু দিন চলার পর টিকা সংকটের কারণে তা বন্ধ হয়ে যায়। মূলত ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটে উৎপাদিত অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা সঠিক সময়ে না পাওয়ার কারণে দেশে টিকার সংকট দেখা দেয়। দেশে এখন চারটি কোম্পানির কোভিড-১৯ টিকা দেওয়া হচ্ছে। এগুলো হলো অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা, ফাইজার-বায়োএনটেক, মর্ডানা ও সিনোফার্মের টিকা। সরকার বিভিন্ন সোর্স থেকে টিকা আনার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। চলতি আগস্ট মাসে প্রায় এক কোটি টিকা আসার কথা রয়েছে। বৈশ্বিক উদ্যোগ কোভ্যাক্সের মাধ্যমে আগামী ডিসেম্বর নাগাদ প্রায় ছয় কোটি টিকা দেশে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক 






















