বিশেষ প্রতিবদেক: প্রশাসনের নাকের ডগায় ১০বছর অবৈধ রাজত্ব: ‘হবিগঞ্জ-সিলেট এক্সপ্রেস’ সিন্ডিকেটের থমকে যাওয়ার মতো অনিয়ম দীর্ঘদিনের। তবুও ব্যবস্থা নিচ্ছেনা দায়িত্বপ্রাপ্তরা। তবে রহস্য একটাই মোটা অংকের বানিজ্য।
হবিগঞ্জ হতে সিলেট ভায়া মৌলভীবাজার রোডে চলাচলকারী “হবিগঞ্জ সিলেট এক্সপ্রেস” সার্ভিসের বাসগুলোর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে রুট পরিচালনার যে অভিযোগ ছিল, তা এবার দালিলিক প্রমাণসহ সত্য প্রমাণিত হয়েছে। সম্প্রতি উদ্ধারকৃত বিআরটিএ (BRTA) ও পরিবহন নথিপত্র যাচাই করে দেখা গেছে, এই রুটে চলাচলকারী সিংহভাগ বাসেরই কোনো বৈধ রুট পারমিট নেই। শুধু তাই নয়, চরম ফিটনেস সংকট ও ট্যাক্স ফাঁকি দিয়েই বছরের পর বছর ধরে প্রশাসনের নাকের ডগায় হাজার হাজার যাত্রীর জীবন ঝুঁকিতে ফেলে সগৌরবে চলছিল এই পরিবহন সিন্ডিকেট।
প্রাপ্ত নথির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই রুটে চলাচলকারী ৩২টি বাসের একটি বিরাট অংশের মৌলভীবাজার হয়ে চলাচলের কোনো আইনি বৈধতা নেই। অনেক গাড়ির ফিটনেস ও ট্যাক্স টোকেনের মেয়াদ বহু আগেই শেষ হয়ে গেছে। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, কিছু গাড়ির রুট পারমিট থাকলেও তা সম্পূর্ণ ভিন্ন রুটের (যেমন: সায়েদাবাদ-সোনাপুর, টাঙ্গাইল-মাঝদিহী, সায়েদাবাদ-হবিগঞ্জ, গাবতলী-পটুয়াখালী ইত্যাদি)। অর্থাৎ, দেশের বিভিন্ন দূরপাল্লার রুট থেকে বাতিল কিংবা অন্যত্র চলাচলের অনুমোদনপ্রাপ্ত লক্কড়-ঝক্কড় গাড়ি এনে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে “হবিগঞ্জ – সিলেট ভায়া মৌলভীবাজার” রুটে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
পরিবহন খাতের এই নৈরাজ্য ও অবৈধ চলাচলের প্রতিবাদে গত ১০ মে মৌলভীবাজার জেলা পরিবহন শ্রমিক–মালিক ঐক্য একটি শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করে। তবে অভিযোগ উঠেছে, এই কর্মসূচির প্রতিক্রিয়া হিসেবে হবিগঞ্জ মোটর মালিক সমিতির ইন্ধনে কিছু উশৃঙ্খল শ্রমিক মূল সড়কে এলোপাতাড়িভাবে গাড়ি আড়াআড়ি করে রেখে তীব্র জনদুর্ভোগের সৃষ্টি করে। এতে সিলেটের এই গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে কয়েক ঘণ্টার জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়ে।
পরবর্তীতে জননিরাপত্তা রক্ষার্থে সেনাবাহিনী এবং স্থানীয় প্রশাসনের দ্রুত ও কঠোর হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। এরপর মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসকের (ডিসি) বিশেষ নির্দেশনায় আটকে থাকা বাসগুলোর নথিপত্র বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (BRTA)-এর মাধ্যমে কঠোরভাবে যাচাই করা হয়। বিআরটিএ-র এই চিরুনি তল্লাশিতেই বেরিয়ে আসে পরিবহন খাতের থমকে যাওয়ার মতো এই অনিয়মের খতিয়ান।
জব্দকৃত নথির তথ্যানুযায়ী, তদন্তকৃত মোট ৩২টি বাসের মধ্যে মাত্র ১৮টি বাসের ফিটনেস ও ট্যাক্স টোকেনের মেয়াদ পাওয়া গেছে। বাকি ১৪টি বাসই সম্পূর্ণ মেয়াদোত্তীর্ণ বা অবৈধ কাগজপত্রে চলছিল। এছাড়া রুট পারমিটের ক্ষেত্রে জালিয়াতির চিত্র আরও ভয়াবহ:-
ঢাকা মেট্রো-ব-১৪-৪৬৪৭: রুট পারমিট মূলত সায়েদাবাদ-সোনাপুর রুটের (মেয়াদ শেষ ০১/১০/২০২১)।
ঢাকা মেট্রো-ব-১৪-১৭২০: রুট পারমিট টাঙ্গাইল-মাঝদিহী রুটের (মেয়াদ শেষ ২৭/০৫/২০익)।
ঢাকা মেট্রো-ব-১৪-৪৮৯১: এই বাসটির ফিটনেস এবং ট্যাক্স টোকেন দুটোরই মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০১৫ সালে! অর্থাৎ গত ১০ বছর ধরে কোনো বৈধ কাগজ ছাড়াই এটি সড়কে চলছে।
ঢাকা মেট্রো-ব-১৪-৪০৪৯: এই বাসটির ফিটনেস রেকর্ড অনুযায়ী মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০০৪ সালে!
অন্যান্য রুট থেকে আসা বাস: সায়েদাবাদ-জাফলং, ঢাকা-বরিশাল, ঢাকা-ঈশ্বরদী, কক্সবাজার-সিলেট এবং ঢাকা-হবিগঞ্জ রুটের পারমিট ব্যবহার করে অবলীলায় বাস চালানো হচ্ছিল এই অন্য রুটে।
এছাড়া ৩, ৪, ৫, ৬, ১১, ১২, ১৪, ১৫ ও ২৫ নম্বর ক্রমিকে থাকা বাসগুলোর কোনো রুট পারমিটই নেই (নথিতে সরাসরি ‘রোড পারমিট নাই’ উল্লেখ)। মোট তদন্তকৃত বাস সংখ্যা: ৩২ টি ও ফিটনেস ও ট্যাক্স টোকেনের মেয়াদ আছে: ১৮টি বাস এবং ফিটনেস ও ট্যাক্স টোকেন মেয়াদোত্তীর্ণ/অবৈধ: ১৪টি বাস।
আপগ্রেডেড মডেল (মডেল আপ): ১২টি বাস।
এই চাঞ্চল্যকর অনিয়ম প্রকাশের পর সাধারণ যাত্রী এবং স্থানীয় সচেতন মহলের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। রাস্তায় নিয়মিত হাইওয়ে পুলিশ এবং বিআরটিএ-র চেকপোস্ট থাকা সত্ত্বেও কীভাবে বছরের পর বছর ধরে এসব ভুয়া ও মেয়াদোত্তীর্ণ রুট পারমিটের গাড়ি প্রকাশ্যে চলাচল করল, তা নিয়ে এখন বিশাল প্রশ্নচিহ্ন দেখা দিয়েছে।
সাধারণ মানুষের ৫টি জ্বলন্ত প্রশ্ন:
১. যদি এত বিপুল সংখ্যক গাড়ির বৈধ কাগজপত্র না থাকে, তবে কার সায় বা ‘ম্যানেজ’ প্রক্রিয়ায় বছরের পর বছর এই রুটে প্রকাশ্যে বাসগুলো চলেছে?
২. প্রশাসনের নাকের ডগায় এত বড় অবৈধ রুট সিন্ডিকেট সচল রাখতে কোন প্রভাবশালী মহল ছত্রছায়া জুগিয়েছে?
৩. নিয়মিত মহাসড়কে চেকিং হওয়া সত্ত্বেও এই ফিটনেসবিহীন ও পারমিটবিহীন বাসগুলো কেন কখনো আটক করা হয়নি?
৪. সাধারণ যাত্রীদের জীবনকে এভাবে মৃ/ত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার পেছনে সংশ্লিষ্ট তদারকি কর্তৃপক্ষের নীরবতার রহস্য কী?
৫. যারা আইন প্রয়োগকারী সংস্থায় থেকে এই অবৈধ কার্যক্রমকে পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছে, তাদের কেন তদন্তের আওতায় আনা হচ্ছে না?
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রতিদিন হাজার হাজার সাধারণ যাত্রী না জেনেই এই অনিরাপদ ও রুট পারমিটহীন বাসগুলোতে যাতায়াত করছেন। অতীতে এই রুটে ঘটে যাওয়া একাধিক ভয়াবহ সড়ক দু/র্ঘটনার পেছনে এই ফিটনেসবিহীন ও অননুমোদিত বাসগুলোর দায় রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা, যার ফলে অনেক পরিবার আজ নিঃস্ব হয়েছে। এর ফলে একদিকে যেমন যাত্রী নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়েছে, অন্যদিকে সরকারের লাখ লাখ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে বৈধ উপায়ে ব্যবসা করা সৎ পরিবহন মালিকরাও চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
স্থানীয় সচেতন সমাজ ও সাধারণ যাত্রীদের দাবি—অবিলম্বে এই তদন্তের পরিধি বাড়িয়ে দোষী পরিবহন মালিক ও তাদের সহায়তাকারী অসাধু কর্মকর্তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা হোক ও এই গুরুত্বপূর্ণ রুটে শতভাগ বৈধ ও নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হোক।।
4:00 am, Saturday, 16 May 2026
News Title :
“প্রভাবশালী হবিগঞ্জ সিলেট এক্সপ্রেস “র বিরুদ্ধে অবৈধভাবে রুট পরিচালনা ও সরকারের রাজস্ব ফাঁকি নিয়ে তোলপাড়
-
নিজস্ব প্রতিবেদক - Update Time : 10:25:52 am, Friday, 15 May 2026
- 165 Time View
Tag :
Popular Post


























