ডেস্ক রিপোর্ট : : কৃষি, কৃষক ও গবেষকদের যথাযথ মূল্যায়ন না করলে দেশ কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে না বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।
তিনি বলেন, আমরা মুখে বলি, কৃষিনির্ভর দেশ, কৃষি আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে।
কিন্তু দিনশেষে কৃষি, কৃষক এবং কৃষি নিয়ে যারা গবেষণা করেন, তাদের জন্য আমরা কতটুকু করেছি, তা ভাবার সময় এসেছে।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) রাজধানীর আন্তর্জাতিক কনভেনশন সিটি বসুন্ধরার (আইসিসিবি) হল-৪-এ ‘১৪তম আন্তর্জাতিক কৃষি প্রযুক্তি মেলা ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
রুরাল ডেভেলপমেন্ট একাডেমি (আরডিএ), বগুড়া এবং লিমরা এক্সিবিশনস, ঢাকার যৌথ আয়োজনে এ মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ কৃষিনির্ভর দেশ।
কৃষি, কৃষক ও কৃষি গবেষকদের অবদানেই দেশের খাদ্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তবে কৃষির ওপর নির্ভরতার কথা বলার পাশাপাশি কৃষক ও গবেষকদের জন্য বাস্তবে কতটুকু করা হয়েছে, তা মূল্যায়নের সময় এসেছে।
তিনি বলেন, এবারের মেলায় ১৪টি দেশের প্রায় ২৫০টি প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে। ৫০০টি স্টলে বিভিন্ন ধরনের কৃষিপ্রযুক্তি ও উদ্ভাবন প্রদর্শন করা হচ্ছে। এ ধরনের আয়োজন কৃষিপ্রযুক্তির প্রসার, নতুন পণ্যের সঙ্গে পরিচিতি এবং দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যোগাযোগ ও বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি করবে।
কৃষির আধুনিকায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়ে মীর শাহে আলম বলেন, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে কৃষির যান্ত্রিকীকরণ, উন্নত বীজ উৎপাদন, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। এর মাধ্যমে উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব।
তিনি বলেন, অনেক কৃষক জমির প্রয়োজন অনুযায়ী সার ব্যবহারের বিষয়ে সচেতন নন। অতিরিক্ত সার ব্যবহারের ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি পরিবেশেরও ক্ষতি হচ্ছে। মাটি পরীক্ষা করে সুষম সার প্রয়োগ এবং জৈব সারের ব্যবহার বাড়াতে হবে। বর্তমানে সার খাতে সরকারকে বছরে প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এ ব্যয় কমানো সম্ভব।
আরডিএর গবেষণার উদাহরণ তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ভূগর্ভস্থ পাইপলাইনের মাধ্যমে সেচের পানি সরবরাহের প্রযুক্তি কৃষকের খরচ কমাতে এবং পানির অপচয় রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এ ধরনের উদ্ভাবন সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে হবে।
কৃষিপণ্যের বহুমুখী ব্যবহার ও আমদানিনির্ভরতা কমানোর বিষয়ে তিনি বলেন, দেশে আলুর উদ্বৃত্ত উৎপাদন হলেও অনেক সময় তা নষ্ট হয়। অথচ আলু থেকে স্টার্চ তৈরি করা সম্ভব, যা বেকারি, ওষুধ ও বস্ত্রশিল্পসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। প্রতিবছর প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকার স্টার্চ আমদানি করতে হয় বাংলাদেশকে। দেশে আলুভিত্তিক স্টার্চ উৎপাদনশিল্প গড়ে তোলা গেলে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।
তিনি বলেন, এ লক্ষ্যে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে আট থেকে ১০টি স্টার্চ উৎপাদন কারখানা স্থাপনের সম্ভাবনা নিয়ে সরকার কাজ করছে।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, বগুড়া বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উন্নীত করে কার্গো সুবিধা চালুর মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের আলু ও সবজি রপ্তানি বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
গ্যাস সংকট প্রসঙ্গে মীর শাহে আলম বলেন, দেশে নতুন গ্যাসকূপ খননে দীর্ঘদিন যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বর্তমান সরকার বিভিন্ন গ্যাসক্ষেত্রে ৫২টি কূপ খননের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইতোমধ্যে ৩১ ও ৩২ নম্বর কূপ খননের প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। নোয়াখালী ও ত্রিশালে নতুন গ্যাসের সন্ধান পাওয়া গেছে। প্রয়োজনীয় সংযোগ স্থাপন করা গেলে এসব গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার বিষয়টিও সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট নিরসনে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে।
শাহে আলম
প্রতিমন্ত্রী বলেন, আটা-ময়দায় ১০ ধরনের ভিটামিন মেশানোর ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করতে আইন প্রণয়নের প্রস্তুতি চলছে। পাশাপাশি চালকে পুষ্টিসমৃদ্ধ করার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। আয়োডিনযুক্ত লবণ ও ভোজ্যতেলে ভিটামিন এ সংযোজনের মতো এসব উদ্যোগ জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।
কৃষি উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পাশাপাশি ভোজ্যতেলের আমদানিনির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, আরডিএর মাধ্যমে বগুড়া, গোপালগঞ্জ, রংপুর ও জামালপুরে সূর্যমুখী ও সয়াবিনের বীজ থেকে তেল উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ জন্য সরকারি পর্যায়ে প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে কৃষকরা এসব ফসল উৎপাদনে উৎসাহিত হবেন এবং আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে।
রাজনৈতিক প্রসঙ্গে মীর শাহে আলম বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার হিসেবে আগামী পাঁচ বছর দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জনকল্যাণে কাজ করতে চায় সরকার। সরকারের কোনো ব্যর্থতা থাকলে তা স্বীকার করে সমাধানে কাজ করা হবে। বিরোধী দলকে আন্দোলনের পরিবর্তে সংসদে এসে গঠনমূলক পরামর্শ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, লংমার্চ করে গ্যাস-বিদ্যুৎ পাওয়া গেলে আমরাই সবচেয়ে বড় লংমার্চ করতাম। কিন্তু দেশের সমস্যার সমাধান করতে হলে বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানে আরডিএর মহাপরিচালক আব্দুল মজিদ প্রামাণিক এবং পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের সচিব ড. রফিকুল ই মোহাম্মদ উপস্থিত ছিলেন। তারা গবেষণালব্ধ উদ্ভাবনগুলো মাঠপর্যায়ে কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং টেকসই কৃষি উন্নয়নে এ ধরনের প্রদর্শনীর গুরুত্ব তুলে ধরেন।

নিজস্ব প্রতিবেদক 





















