মৃত্যুর যন্ত্রণা সহ্য করে একমাত্র সন্তানের মুখ দেখলেন রেহানা সুলতানা। দশমাস দশদিন পেটে ধরে তাকে পৃথিবীর আলো দেখালেন তিনি। প্রসব বেদনায় এত কষ্ট অনুভব হয়েছিল তার, তিনি ভেবেই নিয়েছিলেন তাকে এবার হয়তো তার স্বামীর কাছে চলে যেতে হবে। বাচ্চার মুখ হয়তো আর তার দেখা হবে। মাস দুয়েক আগে একটি সড়ক দূর্ঘটনায় তার স্বামী রহমান মারা যান। দিনমজুরের কাজ করতো তার স্বামী। এই তাদের প্রথম সন্তান ছিল। কত স্বপন ছিল বাচ্চাটাকে নিয়ে তাদের দুইজনের। রেহানার মনে হয় সুন্দর পৃথিবীতে তার আর থাকা হলো না। সে মরে গেলে তার বাচ্চার কি হবে? সে তো এতিম হয়ে যাবে। কিন্তু সৃষ্টিকর্তার অন্য পরিকল্পনা ছিল। এ যাত্রায় রেহানা বেঁচে ফিরলো। সন্তানের নাম রাখলেন রিয়াজ। সন্তানকে দেখে স্বামী হারানো দুঃখ ভুলে বাঁচার নতুন আসা জাগলো তার মনে।
সন্তান বড় হয় তার পরিবর্তন গুলো সে অপলকে দেখে। অনেকেই তাকে বিয়ে করার কথা বলে কিন্তু সে তাদের মুখে উপর বলে আল্লাহ্ যদি রহম করে এই সন্তান আমাকে দেখবে। আর আমি যদি বিয়ে করি তাহলে আমার সন্তানের কি হবে? তাকে কে দেখবে? আমি তাকে ছেড়ে যেতে পারি না সে তো কোনো অন্যায় করেনি।
কিছু একটা করতেই হবে। স্বামীর আত্মীয়দের মধ্য এই গ্রামে এক চাচা আছেন। আর রেহানার বাবা-মা ও অনেক কষ্ট দিন কাঁটাতেন। তাই সেই চাচার কাছে চলে গেলেন। কিছু টাকা ধার করে আর তার কাছে যা ছিল তাই দিয়ে একটা সেলাই মেশিন কিনলেন।
শুরু হলো সেলাই কাজ করে আর স্বামীর ছোট্ট কাঁচা ঘরে থেকে জীবন যৌবন ত্যাগ করে মাটি কামড়ে বেঁচে থাকার লড়াই। অনেক কষ্টে পড়ালেখা শিখালেন ছেলেকে। কখনো কখনো আধ পেটা খেয়ে আবার না খেয়ে থাকতেন। কিন্তু ছেলের কাছে কখনো প্রকাশ করতেন না। গ্রামের কিছু পড়াশোনা করা লোক রেহানাকে বললো শহরে ছেলেকে পড়ানোর জন্য। রিয়াজের পরীক্ষার ফলাফল ও অনেক ভালো।
রিয়াজ চলে এলো ঢাকা শহরে,ভালো একটা পাবলিক ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সুযোগ পেল। এদিকে মায়ের দিন নেই রাত নেই সেলাই করে যাচ্ছে, ছেলেকে পড়া লেখা শেখাতে হবে। আস্তে আস্তে অতিরিক্ত কাজের চাপে চোখে সমস্যা হতে লাগলো, মাজা যন্ত্রণা করতে লাগলো। না খেয়ে খেয়ে পেটের মধ্যে ঘাঁ হতে লাগলো শরীর ও খারাপ হলো। কিন্তু তার কাছে এটা তুচ্ছ ব্যাপার মাত্র ছেলের জন্য কাজ করতে হবে। দুছরে দুই একবার বাড়িতে আসতো রিয়াজ।
বছর চারেক পর ছেলে বিয়ে করলো ইউনিভার্সিটিতে তার সাথে পড়ুয়া এক বড়লোকে মেয়েকে। একমাত্র মেয়ে তাই বাবা মেয়ের সুখের জন্য জামাইকে অঢেল সম্পত্তির মালিক বানালেন। তার জীবনে কিছুর অভাব নেই।
মায়ের শরীর এখন আর ভালো যায় না। চেহারায় মলিনতার ছাপ পরিষ্কার বোঝা যায়। চোখে ভালো দেখতে পায় না। অনেক দিন ছেলে তার ঘরে ফিরেছে, চোখে ভালো না দেখতে পেলেও গলা শুনে খাট থেকে নেমে দৌঁড়ে এলেন। দরজার গায়ে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যেতে লাগলেন পায়ে ব্যথা লাগলো কিন্তু সে ব্যথা যেন কিছুই না। ছেলে বাড়ি আসাটার আনন্দ তার কাছে অনেক মূল্যবান।
দু হাতে প্রাণ পণ জড়িয়ে ধরলেন ছেলেকে। তার খুশি আর দেখে কে? পৃথিবীর সব সুখ যে তার সুখের কাছে কম পড়ে যাবে।
রেহানা এখন তার ছেলে বাসায় এসি রুমের বাতাস খাচ্ছেন। নাতনির মুখ দেখলেন। ধরো আমাকে দাদি ধরো আমাকে করে সর্বত্র ঘরে বারান্দায় ঘুরে বেড়ায় সে।
খুব শান্তি অনুভব করছিলেন। খুশি তার মুখের সর্বত্র ফুটে উঠতো।
কিন্তু বিধাতা হয়তো অন্যকিছু লিখে রেখছিলেন তার কপালে। বেশি সুখি হওয়ার অধিকার তাকে কোনো দিনই দিলেন নাহ।
কিছু দিন যেতে না যেতে তার পেটের ব্যাথা শুরু হলো। কখনো বমি কখনো পেটে একঘেয়েমি ব্যাথা।
রিয়াজ তাকে নিয়ে চলে গেল ডাক্তার এর কাছে অনেক পরীক্ষা-নিরিক্ষা চললো। কিছুই ধরা পড়লো না।
অবশেষে একজন এসিডিটি বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো। তিনি এন্ডোসকপি দিলেন আর পেটের টিস্যু পরীক্ষার জন্য পাঠালেন।
তিন দিন পর ডাক্তারের কাছে গেলে ডাক্তার রিয়াজ কে যা বললেন তা মোটেও সুখকর খবর ছিলো নাহ।
রিয়াজের পায়ের তলার মাটি সরে গেল, মাথা ঘুরছে বন বন করে।
আলসার থেকে ক্যান্সার হয়ে গেছে। সময় বেশি নেই। কেমোথ্রাপি দিতে হবে প্রতি মাসে। না হলে বাঁচানো অসম্ভব। খুব দেরি হয়ে গেছে।
প্রাইভেট ক্লিনিকে তাকে ভর্তি করা হলো। বৌমাও তাকে দেখতে যেত স্যুপ আর ডাক্তারের দেওয়া খাবার নিয়ে। কেমো দেওয়া হতো সময় মতো।
কেটে গেল চার মাস। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে মরার খাটিয়া কাঁধে নিয়ে শতশত মানুষ সাথে চলছে রিয়াজ। কান্না করছে সে,সবাই নিষেধ করছে কান্না করো না রুহের কষ্ট হবে। কিন্তু এই অবাধ্য চোখ কারো কথা শোনে না। বার বার চোখ মুছছে সে কিন্তু বিনা শব্দে অশ্রু কনা ঝরে পড়ছে শ্রাবণের বৃষ্টি হয়ে।
কবরে শোয়ানো হলো রিয়াজকে কয়েক কোদাল মাটি দিতে বলা হলো। সে ও কাঠের পুতুলের ন্যায় সবার কথা মতো কাজ করলো।
চিরনিদ্রায় শায়িত হলো এক আত্মত্যাগী মা।
তার মৃত্যুর সাথে তার সন্তানের জন্য লুকানো আত্মত্যাগ চির আড়ালেই রয়ে গেল। প্রকাশিত হওয়া সময় তাকে দেওয়া হলো না….
পৃথিবীর প্রত্যেক সন্তানের জন্য সব মায়ের থাকে হাজারো অব্যক্ত আত্মত্যাগ যা আমাদের মতো সন্তানদের কাছে অদৃশ্য।
সমাপ্ত
2:36 am, Tuesday, 11 August 2026
News Title :
চিরকুটের গল্প প্রতিযোগিতার সপ্তাহের সেরা প্রথম গল্প “মায়ের লুকানো আত্মত্যাগ” – শিরিন আক্তার
-
নিজস্ব প্রতিবেদক - Update Time : 06:33:37 am, Friday, 22 July 2022
- 660 Time View
Tag :
Popular Post






























