এক মুঠ চিনিতে কিছু একটা পড়ে ফু দিলেন লোকটি। এরপর একটা কাগজে মুড়িয়ে প্রিয়ার দিকে বাড়িয়ে দিলেন।
“এটা তোর স্বামীকে অল্প অল্প করে এক মাস খাওয়াবি। এরপর তোর স্বামী তোর কথায় উঠবে, বসবে।”
প্রিয়া বলল,
“না, না। আমার কথা মত উঠা বসার দরকার নেই। সেসব সে নিজের ইচ্ছেতেই করুক। আমাদের শুধু ঝগড়াটা মিটমাট হলেই হয়। আর এটা এমনিতেই ঠিক হয়ে যাবে।”
রুবিনা একটা খোঁচা মেরে ফিসফিস করে বলল,
“বেশি কথা বলিস না। বাবা বেশি কথা বলা একদম সহ্য করে না।”
প্রিয়া ভীষণ রকমের বিরক্ত হলো। সে এখানে আসতে চায়নি। সাবিতের সাথে তার ঝগড়ার বিষয়টা শেয়ার করতেই রুবিনা তাকে এই বাবার কাছে নিয়ে এসেছে।
লোকটি বললেন,
“সেজন্যই দিচ্ছি। এটা নিয়মিত খাওয়ালে আর ঝগড়া হবে না। তবে সাবধান! চুলার আগুনে এই চিনি দিবি না। তাহলে কিন্তু জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে যাবি। এবার এটার হাদিয়া দে, পাঁচ হাজার।”
প্রিয়া এবার অবাকের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে বলল,
“কিহ! সামান্য এক মুঠ চিনির দাম পাঁচ হাজার!”
লোকটি এক রহস্যময় হেসে বলল,
“এটাকে সাধারণ চিনি ভাবছিস নাকি? এটার কাজ কিন্তু লাখ টাকার।”
কথা বলার সময় লোকটার পান খাওয়া লালচে দাঁতগুলো দেখা গেল।
………..
রুবিনার জন্য এক প্রকার বাধ্য হয়ে পাঁচ হাজার দিয়ে এক মুঠ চিনি নিয়ে বাসায় ফিরল প্রিয়া। তার এসবে মন সায় দিচ্ছে না। রুবিনা তাকে বারবার বলেছে, “যদি কাজ না হয় তাহলে আমি টাকা ফিরিয়ে দেবো, কথা দিচ্ছি।”
কোথাকার কোন বাবার উপর এত অগাদ বিশ্বাস দেখে খাবি খাওয়ার উপক্রম প্রিয়ার। প্রিয়াকে একা ছাড়লো না রুবিনা। সেও তার বাসায় আসলো।
…………
দরজা খুলে দিলো সাবিত। আজকে তার অফিস বন্ধ। সকালের ঝগড়াটা নিয়ে এখনো রেগে আছে সে। দরজা খুলে দিয়ে দরজার সামনে আর বেশিক্ষণ দাঁড়ালো না সাবিত। প্রিয়া, রুবিনার সামনেই সাবিতকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আমি জানি তুমি আমার উপর ভীষণ রেগে আছো। আসলে ভুলটা আমারই। আমি বেশি চেঁচামেচি করে ফেলেছি। আই এম স্যরি।”
সাবিত ঘুরে প্রিয়ার দিকে তাকাল। এরপর লজ্জিত কন্ঠে বলল,
“না, আমিই তো ঝগড়া শুরু করেছিলাম। তাই তুমিও রাগারাগি করেছো। ভুলটা আমারই।”
এরপর ঘরে ঢুকতে ঢুকতে প্রিয়া বলল,
“আচ্ছা, এখন এসব বাদ দাও। কিছু খাবে বলো? আর আজকে রুবিনাও এসেছে।”
সাবিত এতক্ষণ খেয়ালই করেনি সেটা। রুবিনার সাথে কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে প্রিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
“ফিরনি বানাবে আজকে?”
প্রিয়া হেসে বলল,
“এক্ষুনি বানিয়ে আনছি।”
……….
রুবিনা উচ্ছ্বাসিত ভঙ্গিতে বলল,
“দেখলি, চিনি নিয়ে আনার সাথে সাথেই রাগ পড়ে গেছে। এটা খেলে তো তোর পায়ের কাছে পড়ে থাকবে।”
“স্বামী কি পায়ের কাছে পড়ে থাকার মত কেউ?”
“না সেটা বলতে চাইনি। শোন, খুব ভালো একটা সু্যোগ পেয়েছিস। বাবার দেয়া চিনি অল্প একটু মিশিয়ে দিস ফিরনিতে।”
প্রিয়া, রুবিনার দিকে তাকিয়ে একটু হেসে রান্নায় মনোযোগ দিলো। রান্নার এক পর্যায়ে কাগজে মুড়ানো সবটুকু চিনি ঢেলে দিলো ফিরনিতে। আঁতকে উঠল রুবিনা।
“কী করলি! চুলার উপরে কেন দিলি? চুলা থেকে নামানোর পর দিতে হতো তো।”
প্রিয়ার দিকে বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে আছে রুবিনা। সে আবার বলল,
“তোর শরীর জ্বালাপোড়া করছে না?”
প্রিয়া শান্তভঙ্গিতে বলল,
“এতটুকু চিনিতে হবে না। বাসায় যে কমদামি চিনি আছে সেখান থেকে কিছু দিতে হবে।”
পুরো রান্না শেষ করে তিনটি বাটিতে বাড়লো প্রিয়া। এক বাটি সাবিতকে দিয়ে আবার ফিরে আসলো রুবিনার কাছে। রুবিনার দিকে এক বাটি ফিরনি এগিয়ে দিয়ে বলল,
“আমি একদম ঠিক আছি। আমার কিছু হয়নি।”
এরপর এক চামচ ফিরনি মুখে দিয়ে প্রিয়া হেসে বলল,
“পাঁচ হাজার টাকা দামের চিনি দিয়ে ফিরনি খাচ্ছি। নিজেকে নিতা আম্বানি বলে মনে হচ্ছে।”
রুবিনা চিন্তিত স্বরে বলল,
“সত্যিই তোর কিছু হচ্ছে না?”
“নাহ হচ্ছে না। একটা কথা সত্যি করে বলবি?”
“কী?”
“তুই এই বাবার পিছে কত খরচ করেছিস?”
কিছুক্ষণ হিসেব করে রুবিনা উত্তর দিল,
“৩০ হাজার। আরো দুই হাজার দিতে বলেছে। আরো এক মাস চিনি খাওয়ালে নাকি আমাদের সম্পর্ক আগের মত হয়ে যাবে।”
প্রিয়া হাসল। এরপর বলল,
“আমার আর সাবিতের ঝগড়া মিটমাট হওয়ার জন্য কোনো চিনিপড়ার দরকার পড়েনি, রুবিনা। কারণ আমরা ঝগড়া হলে স্যরি বলে আবার মিটমাট করতে জানি। তুইও যদি এসব চিনিপড়ার পিছে না পড়ে আহাদ ভাইয়ের প্রতি আরেকটু সহানুভূতিশীল হতি, নিজের ভালোবাসা আরেকটু প্রকাশ করতি তাহলে আর এসবের পিছে ছুটতে হতো না।”
রুবিনা প্রিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। তার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না, যেই বাবাকে সে এত বিশ্বাস করেছে তার কথা ফলছে না। প্রিয়া আবার বলল,
“এতদিন তোকে বলেছি। তুই শুনিসনি। কমদিন তো হয়নি এই বাবার থেকে চিনিপড়া এনেছিস। কোনো লাভ হয়েছে?”
রুবিনা একটু চুপ থেকে বলল,
“নাহ, ওর আর আমার ঝগড়া তো মিটেনি। উল্টো বাবা শুধু চিনি খাওয়ানোর মেয়াদ বাড়িয়েই যাচ্ছে।”
প্রিয়া এবার উপহাসের সুরে বলল,
“এই মেয়াদ বেড়েই যাবে, রুবিনা। তুই একটু আহাদ ভাইয়ের সাথে চিনির মত মিষ্টি ব্যবহার কর, তাহলেই হবে। মরিচের মত ঝাল ব্যবহার করলে এসব চিনি, গুড়, রসগোল্লা কোনো পড়া খাইয়েই কাজ হবে না, বুঝলি?”
রুবিনা বলল,
“এখন কী করব আমি?”
“এখন ফিরনি খা।”
রুবিনা হেসে ফেলল। এক চামচ ফিরনি খেয়ে বলল,
“এই ফিরনিটা শেষ করে ওই ভন্ড বাবাকে জেলের ফিরনি খাওয়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে। আচ্ছা, জেলে কি ফিরনি পাওয়া যায়?”
প্রিয়া হাসতে হাসতে বলল,
“জানি না। আমি তো কখনো জেলে থাকিনি।”
তার হাসিতে রুবিনাও যোগ দিল। ভিতরের ঘর থেকে সাবিতের কন্ঠস্বর শুনা গেল,
“বান্ধবীকে পেয়ে কি আমাকে ভুলে গেলে নাকি? আরেক বাটি ফিরনি পাওয়া যাবে?”
প্রিয়া এখান থেকে উত্তরে বলল,
“হ্যা, আনছি।”

নিজস্ব প্রতিবেদক 




























