বিশেষ প্রতিবেদক: চূড়ান্ত আন্দোলনের সময়সীমা ও সরকারবিরোধী যুগপৎ কর্মসূচির যৌথ ঘোষণাপত্র নিয়ে আচমকা ইউটার্ন নিয়েছে বিএনপি। গতকাল মঙ্গলবার রাতে দলটির স্থায়ী কমিটির সভায় কয়েক ঘণ্টার বৈঠকেও কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি শীর্ষ নেতারা। বিএনপির এই অবস্থা জেনে ক্ষুব্ধ হয়েছেন দলটির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা বিরোধী দলগুলোর নেতারা। পাশাপাশি যৌথ রূপরেখা নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যরা ঐকমত্যে না আসায় এর ঘোষণা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠক শেষে গত সোমবার দিবাগত মধ্যরাতে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে একাধিক নেতার আলাপ হয়। তারা জানান, কমিটির বৈঠকে সরকার পতনের কর্মসূচি ও যুগপৎ আন্দোলনের যৌথ ঘোষণাপত্র নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। ওই আলোচনায় বেশ কিছু বিষয়ে কয়েকজন সদস্য আপত্তি তুলেছেন।
স্থায়ী কমিটির গুরুত্বপূর্ণ একজন সদস্য এ প্রতিবেদককে জানান, সোমবারের বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। সহসাই কোনও সিদ্ধান্ত নিতে নারাজ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যরা। তারা আরও আলোচনা করবেন দাবি ও কর্মসূচি ঠিক করার জন্য; এক্ষেত্রে আরও সময় লাগবে।
যদিও গণতন্ত্র মঞ্চ থেকে আশা করা হয়েছিল, চলতি মাসেই যৌথ রূপরেখা ও কর্মসূচি ঘোষণা করবে বিএনপি।
বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা গণতন্ত্র মঞ্চের দুই জন শীর্ষনেতা উল্লেখ করেছেন, বিএনপি ও গণতন্ত্র মঞ্চের দুই লিয়াঁজো কমিটির সমন্বয়ে তৈরি ৩০-৩৫ দফার যৌথ ঘোষণাপত্র নিয়ে সোমবার স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিএনপির নেতাদের ঐকমত্য হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গণতন্ত্র মঞ্চের সমন্বয়ক সাইফুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা একটা প্রাথমিক ধারণা পেয়েছি, বিস্তারিত ধারণা পাইনি। আপনি যেভাবে প্রশ্ন করেছেন, তাহলে ব্যাপারটা উদ্বেগের। আমরা যখন জাতীয়ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ—আমরা সম্ভব স্বল্প সময়ের মধ্যে যৌথ ইশতেহার ঘোষণা করবো; চূড়ান্ত আন্দোলনের লক্ষ্যে ধারাবাহিক কর্মসূচি ঘোষণা করবো; তখন আপনি যেভাবে বললেন—সেটা উদ্বেগের, দুশ্চিন্তারও।
সাইফুল হক বলেন, ‘আশা করি তাদের (বিএনপির) সঙ্গে দেখা হবে, পুরো জিনিসটা জানা-বোঝার চেষ্টা করবো। নিশ্চয়ই তাদের দিক থেকেও উদ্যোগ থাকবে। আমরা আলাপ-আলোচনা করে এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে পারবো।’
আরেক নেতার মন্তব্য, ‘আমাদের অবহিত করা হয়েছে। আমরা ভীত, ক্ষুব্ধ। আশা করছি আমরা এটাকে ব্রেক-থ্রু করতে পারবো, দ্রুত সমাধানের আশা করছি।
গণতন্ত্র মঞ্চের আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা বলেছেন, বিএনপি কী করবে, সেটা এখনও নিশ্চিত না। প্রথমত আন্দোলন ও পরবর্তী নিরপেক্ষ সরকার নিয়ে বিএনপির নেতারা চিন্তিত। তারা ঠিক বুঝতেও পারছেন না কী করণীয়।’
যৌথ রূপরেখা নিয়ে ঐকমত্য না হওয়া প্রসঙ্গে এই নেতা বলেন, ‘যৌথ রূপরেখার নানা কিছু নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। কারণ, তাদের কেউ কেউ মনে করে, কীভাবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ বাস্তবায়ন সম্ভব? কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন নিয়েও।’
যুগপৎ আন্দোলনে যুক্ত থাকা নেতাদের কেউ কেউ জানান, মঙ্গলবার রাতে বৈঠকের পর আজ বুধবার কারও কারও সঙ্গে বিএনপির পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়েছে। তবে বিস্তারিত কিছু বলা হয়নি।
তবে বিএনপির একজন নেতা জানান, খুব দ্রুত গণতন্ত্র মঞ্চের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিকভাবে বৈঠক করবে বিএনপি। ওই বৈঠকে পুরো বিষয়টি ব্যাখ্যা করা হবে।যৌথ রূপরেখার আপত্তির বিষয়ে মঞ্চের একজন নেতার ভাষ্য, বিএনপি মূলত নির্দলীয় সরকার নিয়ে মৌলিকভাবে চিন্তিত। সেই সরকার কতদিনের হবে, সেখানে তাদের সঙ্গে কী আচরণ করা হবে, আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সেই সরকার আসার পথ সুগম করবে কিনা—এসব নিয়ে দুশ্চিন্তা ও ভয়ে রয়েছে বিএনপি। স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বলেন, ‘আন্দোলন ও যৌথ ঘোষণাপত্র পিছাইতে পারে। কবে করবো, সেটা আমরাই ঠিক করবো। বিএনপির একজন প্রভাবশালী ভাইস চেয়ারম্যান মনে করেন, যৌথ ঘোষণাপত্র বিলম্বিত করার কারণ এই উদ্যোগটিকে আটকানোর উদ্দেশ্য কিনা, এই প্রশ্নটি এখন বড় হয়ে দেখা দেবে। বিএনপির একজন প্রভাবশালী দায়িত্বশীল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বকে বরাবরই এক-এগারোর অভিজ্ঞতা তাড়া করে ফেরে। সে কারণে যেকোনও সিদ্ধান্ত গ্রহণে তারা নানাদিক বিবেচনা করেন। একইসঙ্গে গুণগত পরিবর্তনের জন্য গণতন্ত্র মঞ্চের সঙ্গে যে আলোচনা, প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে, তা নিশ্চিতভাবে সময়সাপেক্ষ। কোনোরকম তাড়াহুড়া রাজনৈতিকভাবে পিছিয়ে দিতে পারে।
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘আমি এগুলো জানি না, বলতে পারবো না। লিয়াঁজো কমিটির সদস্যরা এসব বিষয় তুলে ধরবেন। আর কর্মসূচি কবে দেওয়া হবে, যখন ঠিক করা হবে সেটা তখনই গণমাধ্যমে জানানো হবে।’
পরে এ প্রসঙ্গে ফোন করা হলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘আমরা আলোচনা করছি। আন্দোলন আর যৌথ ঘোষণাপত্রের টাইমিং নিয়ে আলোচনা হবে। আমরা তো কারও সুবিধার জন্য আন্দোলন করছি না। কার জন্য সুবিধা হবে, সেটা তো আমাদের দেখার বিষয় না। আন্দোলন কবে চূড়ায় যাবে, সেটা আমরা হিসাব করে দেবো। কোনটা সঠিক, কোনটা সঠিক নয়—সেটাও আমরা সিদ্ধান্ত নেবো।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটি ও গণতন্ত্র মঞ্চের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নেতা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ইতোমধ্যে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে আন্দোলন নিয়ে তাড়াহুড়ো না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সরকার জোর করে নির্বাচন করার উদ্যোগ নিলে সেই উদ্যোগে যেন বিএনপি যুক্ত না হয়, সেই কথাও তিনি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছেন।
গণতন্ত্র মঞ্চের কয়েকজন নেতা মনে করছেন, বিএনপি সংক্ষিপ্ত সময় কর্মসূচি তুঙ্গে রাখার পক্ষে। সেক্ষেত্রে কোরবানির ঈদের আগে নিয়মরক্ষার কর্মসূচি দিয়ে সময় পার করতে চায় তারা।
মঞ্চের একজন সাবেক সমন্বয়ক দাবি করেন, বিএনপি বড় সময় নিয়ে আন্দোলন করতে চায় না। আর দীর্ঘদিন ধরে কর্মসূচি দিয়ে জনসম্পৃক্ততা কতখানি ধরে রাখা যাবে—সে বিষয়টি তাদের প্রধান বিবেচনাধীন। তারা চাইছে নির্বাচনকালীন পরিস্থিতি তৈরির আগ মুহূর্তে অর্থাৎ সেপ্টেম্বরে একটি সংক্ষিপ্ত ও বড় আন্দোলন গড়ে তুলতে।
এ প্রসঙ্গে গণতন্ত্র মঞ্চের সঙ্গে বিএনপির লিয়াঁজো কমিটির টিম লিডার আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘ওইটা বলতে পারবো না। এটা দলের সিদ্ধান্ত আর যারা যারা আন্দোলনে আছি, তাদের সিদ্ধান্ত।’
7:57 am, Friday, 22 May 2026
News Title :
বিএনপির ইউটার্ন: যৌথ ঘোষণাপত্র নিয়ে বিরোধ: সঙ্গীরা ক্ষুব্ধ যুগপৎ
-
নিজস্ব প্রতিবেদক - Update Time : 01:42:32 pm, Wednesday, 10 May 2023
- 320 Time View
Tag :
Popular Post

























