1. [email protected] : Admin : sk Sirajul Islam siraj siraj
  2. [email protected] : admi2017 :
  3. [email protected] : Sk Sirajul Islam Siraj : Sk Sirajul Islam Siraj
  • E-paper
  • English Version
  • বৃহস্পতিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৪, ০৪:৪৩ পূর্বাহ্ন

ব্রেকিং নিউজ :
বিনোদন :: গান গাইতে গাইতে মঞ্চেই গায়কের মর্মান্তিক মৃত্যু!,  খেলার খবর : অনূর্ধ্ব-১৯ এশিয়া কাপ চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ, বিমানবন্দরে যুবাদের জানানো হবে উষ্ণ অভ্যর্থনা,

হারিয়ে যাচ্ছে বাংলার ঐতিহ্য ঢেঁকি – আফতাব চৌধুরী

  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৬ মে, ২০২২
  • ২৮১ বার পঠিত

ছিল গ্রাম বাংলার নব বধূদের কোথাও যাতায়াতের পালকি, গরুর গাড়ি । নৌকা ব্যবহারের প্রচলন ছিল সবচেয়ে বেশি। ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও প্রধান বাহন ছিল নৌকা ও গরুর গাড়ি। কিন্তু এসব শিল্প-সংস্কৃতি আজ আধুনিকতার ছোয়ায় সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্তির পথে। ঢেঁকি শিল্পও তার ব্যতিক্রম নয়। এমন একটা সময় ছিল ছিল গ্রাম বাংলার প্রায় প্রতিটি ঘরে ঢেঁকি শিল্পের প্রচলন ছিল। যে গৃহস্থের ঘরে ঢেঁকি থাকতো না তাকে পরিপূর্ণ গৃহস্থ বলা যেতো না। গোয়াল ভরা গরু, পুকুর ভরা মাছ, গোলা ভরা ধান আর রান্না ঘরের ঢেঁকিই ছিল একটি গৃহস্থ ঘরের পরিপূর্ণতা। ভোরে ফজরের আযানের পাশাপাশি স্তব্ধতা ভেঙে ঢেঁকির শব্দ ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। ঢেঁকির শব্দে প্রত্যেকের ঘুম ভাঙে এবং স্ব-স্ব কাজের ব্যস্ততায় প্রত্যেকে নিজেকে জড়িয়ে রাখে। আধুনিক সভ্যতার গ্যাড়াকলে এখন চারদিকে গড়ে উঠেছে রাইস মিল। অথচ কয়েক যুগ আগেও গ্রাম-বাংলার প্রায় প্রতিটি ঘরে ঢেঁকির ব্যবহার ছিল লক্ষণীয়। ধান থেকে শুরু করে গম, হলুদ, মরিচ, ধনিয়া, ডাল প্রভৃতি ঐ ঢেঁকিতেই গুড়ো করা হতো। বিয়ে শাদীর উৎসবে ঢেঁকি ছাটা চালের খিরের পায়েস রান্না এখন আর চোখে পড়ে না। অথচ একদিন ঢেঁকি ছাড়া গ্রাম কিংবা গ্রাম ব্যতীত ঢেঁকি কল্পনা করাও ছিল কঠিন ব্যাপার। যেখানেই বসতি সেখানেই ঢেঁকি। কিন্তু আজ তা আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য থেকে মুছে যেতে বসেছে চিরদিনের জন্য। এই ঢেঁকি সংস্কৃতি নিয়ে কবিরা রচনা করেছেন কবিতা, গল্পকার রচনা করেছেন গল্প আর বাউল শিল্পী গেয়ে গেছেন সুমধুর গান। আগেকার দিনে জীবিকা অর্জনের প্রধান বাহনও ছিল এই ঢেঁকি। অনেকে এ পেশার সাথে জড়িয়ে পরিবারের অভাব-অনটন মুছাতে চেষ্টা করতো। যান্ত্রিকতার করালগ্রাসে আজ এসব পেশার মানুষেরা পেশাচ্যুত। দেশের প্রতিটি অঞ্চলের গ্রামেও চাল, ডাল, ধান, গম প্রভৃতি ভাঙার জন্য ঢেঁকিই ছিল একমাত্র প্রযুক্তি বিশ্বয়ানের এ যুগে আধুনিকতার ছোঁয়ায় আজ হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম-বাংলার অনেক ঐতিহ্য। বিলুপ্তির পথে সবুজ বাংলার ঐতিহ্যবাহী খেলা হা-ডু-ডু। কানামাছি, কাবাডি, গোল­াছুট, পুতুল বিয়ে ও দাঁড়িয়াবান্ধা প্রভৃতি খেলা। সন্ধ্যাবেলায় পুঁথি পড়া, পাড়ায় পাড়ায় পালাকীর্তন, মঞ্চ নাটক এসব যেন এখন অলীক গল্প ছাড়া আর কিছুই নয়। এমন একটা সময় যন্ত্র। এক সময় বিভিন্ন গ্রামে বিদ্যুৎ না থাকার ফলে প্রায় প্রতিটি ঘরেই ঢেঁকির আওয়াজ শোনা যেতো। বর্তমানে প্রতিটি গ্রামে পৌঁছে গেছে বিদ্যুতের আলো। বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে রাইস মিল।

সভ্যতার প্রয়োজনে ঢেঁকির আবির্ভাব ঘটেছিল। আবার সভ্যতার গতিময়তার ফলে প্রযুক্তির উৎকর্ষে ঢেঁকি শিল্প বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আগেকার দিনে হেমন্তের ‘ধান উঠার সাথে সাথে ঢেঁকির ঢক্কর ঢক্কর শব্দ শোনা যেতো। মহিলারা সংসারের শত অভাব অনটনের ভিতরেও নিজেদের ক্লান্তি ঢাকার জন্য ঢেঁকি তালে তালে গান গেয়ে ধান ছাটাইয়ের কাজ করতেন। কয়েক দশক আগে গ্রামে গেলে প্রতিটি বাড়িতে ঢেঁকি চোখে পড়তো। গৃহস্থের বাড়িতে ঢেঁকি থাকতো একাধিক। ঘরের পাশে বাড়তি একটি ছাউনি দিয়ে ঢেঁকি ঘর তৈরি করা হতো। গ্রামের মহিলাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলতো কে কার আগে ভোরে ঘুম থেকে উঠে ঢেঁকিতে প্রথমে পা দিতে পারে। ঢেঁকির শব্দে ঘুম ভেঙে যেতো কৃষকের। কৃষক লাঙল কাঁধে নিয়ে ছুটতেন মাঠের পানে। গৃহিনীরা ঘরের হাঁস-মুরগি ছেড়ে দিতেন। হাঁস-মুরগিগুলো খাবারের সন্ধানে ঢেঁকিশালার দিকে ছুটে যেত। ধান ভানার সময় অনেক মহিলার হাতের চুড়ির ঝন ঝন শব্দ হতো। শব্দ হতো পায়ের নুপুরেরও। সব মিলে সৃষ্টি হতো এক সংগীত মুখর পরিবেশ। ঢেঁকি চিল কাঠের তৈরি। সাধারণ কাঠ হিসেবে ব্যবহার হতো কূল, বাবলা ও জাম গাছ। তবে কাঠ হতে হয় ভারি ও শক্ত ধরনের। নরম ও হালকা ধরনের কাঠ ছিল ঢেঁকি তৈরির জন্য অনুপযুক্ত। ঢেঁকির দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাত এবং চওড়া পৌনে এক হাত। মাথার দিকে একটু পুরু এবং অগ্রভাগ সরু। ঢেঁকির মাথায় এক হাত লম্বা একটি দন্ড থাকে। একে বলে চুরুন বা ছিয়া। এর মাথায় লাগানো থাকে লোহার গোলা। গোলার মুখ মাটির যে স্থান স্পর্শ করে তাকে বলে গড়। এটা চার পাঁচ ইঞ্চি গর্ত এবং গর্তের ভিতর স্থাপিত হয়ে কাঠের একটি অংশ। অনেকে কাঠের পরবির্তে পাথরের খন্ড ব্যবহার করতেন। তবে যা-ই ব্যবহার হোক না কেন সেটি হয় খুব মসৃণ। এই গর্তের ভেতর দেয়া হয় ধান, গম, ডাল, মরিচ প্রভৃতির যে কোন একটি। ঢেঁকির পেছনে ঢেঁকিতে ধান, গম, ডাল প্রভৃতির যে কোন একটি ভানতে সাধারণত দু’জনের প্রয়োজন হয়। একজন ঢেঁকির গড়ের বা গর্তের ভেতর ধান নাড়াচাড়া করে এবং অন্যজন পাড় দেয়। অনেক সময় ধান বেশি হলেও ৩ জনের প্রয়োজন হয়। দু’জন এক সাথে পাড় দেয় এবং একজন ধান নাড়াচাড়া করে। যেখানে পা দিতে হয় তার এক হাত সামনে ঢেঁকিতে ছিদ্র করে ছিয়ার মতো করে একটি দন্ড দিতে হয়। এক বলে অসিল। এবার ঢেঁকির পেছনে পা দিয়ে আঘাত করে কাঠের দন্ডটি গর্তের ভেতর পড়তে ধানের খোসা উঠে যায়। এভাবে ধানকে কয়েকবার পাড় দিয়ে খোসাকে পরিস্কার করে চাল বের করতে হয়। নতুন প্রজন্মের অধিকাংশের কাছে ঢেঁকি হয়তো অপরিচিত। ঢেঁকির নাম শুনেছেন অনেকেই কিন্তু চোখে দেখেননি এমন লোকও আছেন। আমাদের গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকগীতি, বাউল শিল্পীর গানেও প্রবাদে ঢেঁকির কথা অনেক এসেছে। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম পর্যন্ত গ্রাম বাংলার এই ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি শিল্পকে কেন্দ্র করে গান লিখেছেন। ‘পায়ের পরশে পেয়েছে কাঠের ঢেঁকির প্রাণ’ গ্রাম-বাংলার নারীরা পিঠাপুলি বানাতে ঢেঁকিতে চাল ভাঙার শব্দে মুখরিত করে তুলতো চারপাশ। এমন একদিন আসবে যখন ঢেঁকি আর কোথাও দেখা যাবেনা। গ্রাম-বাংলার এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প ‘ঢেঁকিকে’ দেখার জন্য হয়তো বা জাদুঘরে যেতে হবে।

সাংবাদিক কলামিস্ট।

প্লিজ আপনি ও অপরকে নিউজটি শেয়ার করার জন্য অনুরোধ করছি

এ জাতীয় আরো খবর..