ডেস্ক রিপোর্ট ::হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির-আবদোল্লাহিয়ানসহ ঊর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকর্তা। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ঘনিষ্ঠ এসব নেতার মৃত্যু ব্যাপক জল্পনা-কল্পনার জন্ম দিয়েছে। অনাকাঙ্ক্ষিত এই দুর্ঘটনা ঘিরে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, রাইসির মৃত্যুর ঘটনা নিছক দুর্ঘটনা নাকি নাশকতা?
যদিও ইরানের সরকারি ব্যাখ্যায় এখন পর্যন্ত বৈরী আবহাওয়া কারণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে। ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম বলছে, ভারী বৃষ্টিপাত আর ঘন কুয়াশার কারণে ফ্লাইটের দৃষ্টিসীমায় ব্যাঘাত ঘটেছে। তবে এই দুর্ঘটনায় শত্রুপক্ষের জড়িত থাকার আশঙ্কা নিয়ে জল্পনা ছড়িয়েছে। নাশকতা বা পরিকল্পিত হত্যার ক্ষেত্রে সন্দেহের তীর সবার আগে যাচ্ছে ইসরায়েলের দিকে। তবে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইসরায়েলের এক কর্মকর্তা রাইসি নিহতের ঘটনায় নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, ‘এই দুর্ঘটনায় আমরা জড়িত না।’
ইসরায়েল কি আসলেই জড়িত? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বের হয়ে এসেছে কিছু কারণ। ব্রিটিশ প্রভাবশালী সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাইসির নিহতের ঘটনায় কিছু ইরানি ইসরায়েলকে সন্দেহ করছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে ঐতিহাসিক বৈরিতার পরিপ্রেক্ষিতে অনেকে ধারণা করছেন যে এই দুর্ঘটনার পেছনে ইসরায়েল থাকতে পারে। দামেস্কে ইসরায়েল কর্তৃক একজন ইরানি জেনারেলকে হত্যা এবং পরবর্তী সময়ে ইসরায়েলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে রাইসির মৃত্যুর পেছনে ইসরায়েলের হাত থাকার ধারণা জোরদার হয়েছে। যদিও ইসরায়েল ও দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ ইরানি স্বার্থের বিরুদ্ধে কার্যক্রমের সঙ্গে, তবুও তারা কখনো কোনো রাষ্ট্রপ্রধানকে লক্ষ্যবস্তু করেনি।
সন্দেহ করা হচ্ছে ইসরায়েলের দুর্ধর্ষ গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদকে। চোরাগোপ্তা এবং নিখুঁত অভিযান চালানোর জন্য ব্যাপক পরিচিতি আছে তাদের। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা রাইসিকে বহনকারী হেলিকপ্টার বিধ্বস্তের ঘটনায় সন্দেহবাদীদের ইসরায়েলি সংশ্লিষ্টতার তত্ত্ব নাকচ করে দিয়েছেন। তারা এ ঘটনার সঙ্গে ইসরায়েলের জড়িত থাকার সম্ভাবনা খুঁজে পাচ্ছেন না। তারা বলছেন, একজন রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যা সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া বা এর জন্য ইরানকে উসকে দেওয়ার চেষ্টা করা। ইসরায়েলের কৌশলগত লক্ষ্য হচ্ছে, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের পরিবর্তে সামরিক ও পারমাণবিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা।
যুক্তরাষ্ট্রের হেলিকপ্টারে রাইসি?
ভেঙে পড়া হেলিকপ্টারের খোঁজ মিললেও ধ্বংসস্তূপে কোনো প্রাণের চিহ্ন নেই বলেই জানানো হয়েছে। বিবিসির তথ্য বলছে, ইব্রাহিম রাইসিকে বহন করছিল বেল ২১২ মডেলের একটি হেলিকপ্টার। আর এই মডেলটি নাকি তৈরি যুক্তরাষ্ট্রে। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর যুক্তরাষ্ট্রের এটি ইরানের কাছে বিক্রি করার কথা নয়। সেই হিসাবে এই হেলিকপ্টারটি প্রায় ৪৫ বছরের পুরোনো। ইরানে কিন্তু এমন ঘটনা প্রথম নয়। এর আগেও আকাশপথে দুর্ঘটনায় ইরানের বহু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি প্রাণ হারিয়েছেন। বিমান কিংবা হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে নিহত হয়েছেন ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রীসহ বিভিন্ন সময় পরিবহনমন্ত্রী, ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড এবং সেনাবাহিনীর কমান্ডাররা। এখানেও রয়ে গেছে একটা বড় ধোঁয়াশা। তাহলে কি প্রযুক্তিগত কারণেই এত বড় দুর্ঘটনা? নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে ঘটানো হয়েছে কোনো বড় নাশকতা?
এদিকে রাইসি নিহত হওয়ার পর বিভিন্ন দেশ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলেও যুক্তরাষ্ট্র গতকাল রাতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কোনো প্রতিক্রিয়া বা বিবৃতি দেয়নি। ফলে এ ঘটনার সঙ্গে দেশটি জড়িত কি না, সেদিকেও সন্দেহের তীর যাচ্ছে।
রাইসির শত্রু কম নয়
সাম্প্রতিক সময়ে নিজের দেশের ভেতর কিংবা দেশের বাইরেও বেশ চাপে ছিলেন ইব্রাহিম রাইসি। ২০১৯ সালে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা তাকে নিযুক্ত করেছিলেন বিচার বিভাগের প্রধানের শক্তিশালী পদে। ৬৩ বছর বয়সী রাইসি ২০২১ সালে দ্বিতীয় প্রচেষ্টায় ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। ইরানের দায়িত্বে আসার পর থেকেই তিনি নৈতিকতাবিষয়ক আইন আরও কঠোর করার নির্দেশ দেন। শুধু তা-ই নয়, তাকে বিবেচনা করা হতো একজন কট্টরপন্থি ধর্মীয় নেতা হিসেবে। তিনি তার নিজের দেশেই সরকারবিরোধী ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে পড়েছিলেন। আর যদি পারমাণবিক শক্তির কথা বলেন, তাহলে বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলোর সঙ্গে পারমাণবিক ক্ষমতার জেরে তাকে কম চাপে পড়তে হয়নি। আবার কোনো কোনো কূটনৈতিক মনে করছেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির যোগ্য উত্তরসূরি হওয়ার জন্য নিজেকে তৈরি করছিলেন রাইসি। তাকে নিয়ে কম বিতর্ক নেই। ১৯৮৮ সালে যখন ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধ, গণহত্যা চালাতে তৈরি করা হয়েছিল একটা বিশেষ কমিটি। যাকে বলা হতো মৃত্যুর দূত। তার সদস্য ছিলেন রাইসি। ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের তরফে ইরানের কিছু সরকারি আধিকারিকদের ওপর জারি করা হয়েছিল নিষেধাজ্ঞা। সেখানেও কিন্তু ছিল রাইসির নাম। আর রাইসির আমলেই রীতিমতো তলানিতে গিয়ে ঠেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক। বহু বছর ধরে যুক্ত ছিলেন ইরানের শাসনব্যবস্থার সঙ্গে। ২০১৭ সালে ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নাম লেখালেও জিততে পারেননি। পরের বার বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন। তবে হ্যাঁ, তার নামে যতই বিতর্ক থাকুক না কেন, ইরানের বেশির ভাগ জনগণের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় নেতা তিনি। তিনি যখন ক্ষমতায় আসেন, তখন ইরান ছিল গুরুতর অর্থনৈতিক সমস্যায় জর্জরিত। সেই সময় তিনি ইরানের হাল ধরেছেন। গত কয়েক বছরে আরও জোরদার করেছেন চীন আর রাশিয়ার সঙ্গে পররাষ্ট্রনীতি। ইউক্রেন যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র আর রাশিয়ার উত্তেজনার মাঝে পোক্ত করেছেন রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক।

নিজস্ব প্রতিবেদক 




























