কোরআন মানব জাতির কল্যাণের জন্যে এসেছে হুদাল্লিন নাছ ,এই দুটি বিষয় নিয়ে কোরআন এবং হাদিস ভিত্তিক আলোচনা।
** ইসলামে একজন মানুষের জান, মাল যেমন হারাম, তেমনি তার ইজ্জত-সম্মানও হারাম।
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বিদায় হজ্জের ভাষণে বলেছেন:
“তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ এবং তোমাদের সম্মান তোমাদের পরস্পরের উপর হারাম, যেমন আজকের এই দিন, এই মাস এবং এই শহর হারাম।” [বুখারী ও মুসলিম]
ইসলামে সম্মান হানি কী?
সম্মান হানি শুধু গালি দেওয়া নয়। ইসলামী শরীয়তে এর কয়েকটি স্তর আছে:
১. গীবত (পরনিন্দা): কারো অনুপস্থিতিতে তার এমন দোষ আলোচনা করা যা সে অপছন্দ করে, যদিও তা সত্য হয়।
আল্লাহ বলেন: “তোমাদের কেউ যেন অন্যের গীবত না করে। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? তোমরা তো তা ঘৃণা কর।” [সূরা হুজুরাত: ১২]
২. বুহতান (অপবাদ): কারো নামে মিথ্যা দোষ রটানো। এটা গীবতের চেয়েও জঘন্য।
আল্লাহ বলেন: “যারা সতী-সাধ্বী নারীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করে… তারা অভিশপ্ত দুনিয়া ও আখিরাতে।” [সূরা নূর: ২৩]
৩. তাহকীর ও ইসতিহযা (তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ও ঠাট্টা-বিদ্রূপ):
কারো চেহারা, বংশ, পেশা, দারিদ্রতা নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করা।
“হে মুমিনগণ! কোন পুরুষ যেন অপর কোন পুরুষকে উপহাস না করে… কোন নারী অপর নারীকে যেন উপহাস না করে।” [সূরা হুজুরাত: ১১]
৪. নামীমাহ (চোগলখোরি): একজনের কথা আরেকজনের কাছে লাগিয়ে সম্পর্ক নষ্ট করা ও সম্মানহানি করা। রাসূল (সাঃ) বলেছেন, চোগলখোর জান্নাতে প্রবেশ করবে না।
৫. তাজাসসুস (গোপন দোষ খোঁজা): মানুষের গোপন বিষয় খুঁজে বের করে প্রকাশ করা।
কেন ইসলাম এত কঠোর?
১. সমাজ নষ্ট হয়: সম্মান হানির কারণে হিংসা, শত্রুতা, পরিবার ও সমাজ ভেঙে যায়।
২. এটি বান্দার হক: নামাজ-রোজা আল্লাহ মাফ করতে পারেন, কিন্তু বান্দার সম্মান নষ্ট করলে যতক্ষণ না সেই বান্দা মাফ করবে, আল্লাহ মাফ করবেন না।
৩. দুনিয়াতে শাস্তি আছে: ইসলামী আইনে কারো উপর মিথ্যা অপবাদ, বিশেষ করে ব্যভিচারের অপবাদ দিলে ৮০ বেত্রাঘাতের শাস্তির বিধান আছে। একে হদ্দে কযফ বলে। [সূরা নূর: ৪]
বর্তমান সময়ে যে ভুলগুলো আমরা করি
আজ আমরা মুখে না বললেও ফেসবুকে, কমেন্টে, গ্রুপে খুব সহজে মানুষের সম্মান নষ্ট করি।
- কারো ছবি নিয়ে ট্রল করা
- যাচাই না করে কারো নামে পোস্ট শেয়ার করা
- কমেন্টে গালাগালি করা বা কারো বাবা-মা তুলে কথা বলা
- ভয়েস রেকর্ড, স্ক্রিনশট ফাঁস করে অপমান করা
এগুলো সবই সম্মান হানির অন্তর্ভুক্ত এবং কবিরা গুনাহ।
এর থেকে বাঁচার উপায় কী?
১. জবানকে হেফাজত করা: রাসূল (সাঃ) বলেছেন, “যে ব্যক্তি তার জিহ্বা ও লজ্জাস্থানের হেফাজতের দায়িত্ব নেবে, আমি তার জন্য জান্নাতের দায়িত্ব নেব।”
২. ক্ষমা চাওয়া: যদি কারো সম্মান নষ্ট করে ফেলেন, তবে তার কাছে গিয়ে সরাসরি ক্ষমা চাইতে হবে। এবং যাদের সামনে তার বদনাম করেছেন, তাদের সামনেই তার প্রশংসা করতে হবে।
৩. ধারণা থেকে বাঁচা: কুরআনে বলা হয়েছে, অধিকাংশ ধারণাই পাপ। “তোমরা অনেক ধারণা থেকে বেঁচে থাকো, নিশ্চয়ই কতক ধারণা গুনাহ।” [সূরা হুজুরাত: ১২]
ইসলাম চায় প্রতিটি মানুষ নিরাপদ থাকবে। তার অনুপস্থিতিতেও তার সম্মান নিরাপদ থাকবে। এটাই একটি সুন্দর সমাজের ভিত্তি।ইসলাম হল এমন একটা ধর্ম শুধু ইসলামের মধ্যে যারা আছে তাহাদের কথা চিন্তা করে না সমগ্র মানবগোষ্ঠীর চিন্তা করে।
**কোরআন মানবগোষ্ঠীর কল্যাণে জন্যে এসেছে *
**তাই আল্লাহ **”হুদাল্লিন নাস – هُدًى لِّلنَّاسِ” এর অর্থ হলো “মানবজাতির জন্য হেদায়েত বা পথনির্দেশ”।
এটি কুরআনের একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। এই শব্দটি কুরআনে কয়েক জায়গায় এসেছে।
شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِّلنَّاسِ
“রমজান মাস, যে মাসে কুরআন নাযিল করা হয়েছে, যা মানুষের জন্য হেদায়েত।” [সূরা বাকারা: ১৮৫]
শব্দগত ব্যাখ্যা
হুদা (هُدًى): এর অর্থ শুধু উপদেশ নয়। এর অর্থ এমন পথ দেখানো যা মানুষকে গন্তব্য পর্যন্ত পৌঁছে দেয়। অন্ধকারে টর্চলাইট যেমন পথ দেখায়, কুরআন তেমনই।
লিন-নাস (لِّلنَّاسِ): নাস মানে সকল মানুষ। মুসলিম, অমুসলিম, আরব, অনারব, কালো, সাদা – সবাই।
এখানে একটি সূক্ষ্ম বিষয় আছে। সূরা বাকারার শুরুতে আল্লাহ বলেছেন:
“هُدًى لِّلْمُتَّقِينَ” – এটি মুত্তাকীদের জন্য হেদায়েত।
আবার এখানে বলছেন “হুদাল্লিন নাস” – এটি সকল মানুষের জন্য হেদায়েত।
দুইটা কি সাংঘর্ষিক? না।
তাফসীরকারগণ বলেন:
১. সবার জন্য উন্মুক্ত: কুরআনের দাওয়াত, আলো, বিধান সবার জন্য। যে কেউ এর কাছে আসবে, সে-ই পথ পাবে। সূর্যের আলো যেমন সবার জন্য, কুরআনের আলোও তেমন। কিন্তু চোখ বন্ধ করে থাকলে আলো পাওয়া যায় না।
২. দুই প্রকার হেদায়েত: - হেদায়েতে আম বা বয়ানী: পথ দেখিয়ে দেওয়া। এটি কুরআন সবার জন্য করে। ভালো-মন্দ, হক-বাতিল স্পষ্ট করে দেয়। এই অর্থে কুরআন হুদাল্লিন নাস।
- হেদায়েতে খাস বা তাওফিকী: পথে চলার তাওফিক দেওয়া, অন্তরে হেদায়েত ঢেলে দেওয়া। এটি আল্লাহ শুধু তাদেরকেই দেন যারা হেদায়েত চায়, অর্থাৎ মুত্তাকীদের। এই অর্থে কুরআন হুদাল্লিল মুত্তাকীন।
ইমাম ইবনে কাসীর (রহ.) বলেন, “হুদাল্লিন নাস” এর মানে হলো কুরআন এমন এক কিতাব যা মানুষকে তাদের ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক জীবন, সমাজ, অর্থনীতি, রাষ্ট্র – সব ক্ষেত্রে সঠিক পথ দেখায়। মানুষ যে সমস্যায় বিভ্রান্ত হয়, কুরআন সেখানে সমাধান দেয়।
কুরআন কীভাবে সকল মানুষের হেদায়েত?
১. আকীদায় হেদায়েত: মানুষ কে? তাকে কে সৃষ্টি করেছে? কেন সৃষ্টি করেছে? মৃত্যুর পর কী হবে? এই মৌলিক প্রশ্নের উত্তর দিয়ে মানুষকে শিরক ও নাস্তিকতার অন্ধকার থেকে বাঁচায়।
২. ইবাদতে হেদায়েত: আল্লাহর সাথে বান্দার সম্পর্ক কেমন হবে, তা শেখায়।
৩. চরিত্রে হেদায়েত: মিথ্যা, অহংকার, হিংসা, সম্মানহানি থেকে বেঁচে সত্যবাদিতা, নম্রতা, ক্ষমার চরিত্র গঠন করে।
৪. জীবন ব্যবস্থায় হেদায়েত: মানুষের জন্য কোনটি কল্যাণকর আর কোনটি ক্ষতিকর, তার পূর্ণাঙ্গ গাইডলাইন দেয়।
তাই কুরআন শুধু মুসলমানদের ধর্মীয় গ্রন্থ নয়, এটি “রহমাতুল্লিল আলামীন” এর মতো “হুদাল্লিল আলামীন” – পুরো বিশ্বের জন্য পথনির্দেশ।
যে ব্যক্তি নিজেকে ‘নাস’ বা মানুষ মনে করে এবং সত্য খুঁজতে চায়, কুরআন তাকে ফেরায় না।
মতিন বকশ
সমাজ কর্মী

নিজস্ব প্রতিবেদক 



























