ডেস্ক রিপোর্ট : বিশ্বকাপ মানেই চেনা সব ছক আর ফুটবলীয় যুক্তি ওলটপালট হয়ে যাওয়ার মঞ্চ। যেখানে নিখুঁত পরিকল্পনাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ম্যাচ টেক্কা দেয় আবেগ, নাটকীয়তা আর আকস্মিকতা।
গতকাল আর্জেন্টিনা বনাম মিসরের নকআউট পর্বের ম্যাচে ঠিক এই দৃশ্যই দেখা গেল। ম্যাচ শেষে ফুটবল বিশ্লেষকদের সব যুক্তি আর ট্যাকটিকাল ব্যাখ্যা আড়ালে পড়ে গেল।
কারণ, মাঠের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত জয় হয়েছে আর্জেন্টিনার ফুটবলারদের অদম্য ইচ্ছা আর হৃদয়ের জোরের।
নিজেদের ফুটবল দর্শনের প্রতি আর্জেন্টিনার টান চিরন্তন।
মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ রেখে ছোট ছোট পাসে বল নিয়ে উপরে ওঠার চেনা ছন্দ যাকে তারা বলে ‘লা নুয়েস্ত্রা’, তাতেই অভ্যস্ত আলবিসেলেস্তেরা। কিন্তু গতকালের ম্যাচে যখন দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছিল, তখন এই চেনা কৌশল ধরে রাখার কোনো উপায় ছিল না।
যখন যুক্তি আর মাথার চেয়ে মন আর আবেগের জোর বেশি প্রয়োজন ছিল, তখনই বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা তাদের চিরচেনা নিয়মগুলো ভাঙল। আর তাতেই বদলে গেল ম্যাচের ভাগ্য।
ম্যাচের প্রথমার্ধেই বেশ সাহসী ফুটবল খেলে আর্জেন্টিনাকে চমকে দেয় মিসর। গোল করে প্রথমে এগিয়ে যায় আফ্রিকান দলটি। লিওনেল মেসি প্রথমার্ধে একটি পেনাল্টি মিস করলে আরও চাপে পড়ে যায় আর্জেন্টিনা। দ্বিতীয়ার্ধে মিসর রক্ষণভাগ কাউন্টার অ্যাটাকের ওপর জোর দেয়। স্প্যানিশ লিগের তলানির ক্লাবে খেলা হাইসেম হাসানের দুর্দান্ত এক পাল্টা আক্রমণ থেকে গোল পেয়ে ব্যবধান দ্বিগুণ করে তারা (মিসরের আরেকটি গোল অফসাইডে বাতিল হয়)। একপর্যায়ে মনে হচ্ছিল, বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিদায় এবার স্রেফ সময়ের ব্যাপার।
ঠিক এই বিপর্যয়ের মুহূর্তেই খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসে আর্জেন্টিনা। দলের কোচ লিওনেল স্কালোনি ফুটবলীয় ব্যাকরণ একপাশে সরিয়ে রেখে জুয়া খেলেন। একজন ফুল-ব্যাক তুলে মাঠে নামান উইঙ্গার নিকো গঞ্জালেসকে, আর মিডফিল্ডার তুলে নামিয়ে দেন স্ট্রাইকার লাউতারো মার্টিনেজকে। মাঠের চেনা ছক তখন ভেঙে চুরমার। আর্জেন্টিনা তখন খেলছিল কেবলই ম্যাচ বাঁচানোর তাড়না আর হৃদয়ের আবেগ থেকে।
খেলার এই ছকহীন অবস্থায় জাদুকর লিওনেল মেসি মাঠের ডানপ্রান্তে নিজের জন্য জায়গা তৈরি করে নেন। সেখান থেকেই শুরু হয় রূপকথা। বক্সে বল ভেসে এলে ডিফেন্ডার ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো বাতাসে ভেসে বলের দখল নেন এবং আর্জেন্টিনার পক্ষে প্রথম গোলটি করেন। এটি ছিল আর্জেন্টিনার চেনা ঘরানার সম্পূর্ণ বিপরীত এক গোল। এর কিছুক্ষণ পরই আবার ডানপ্রান্ত থেকে মেসির আক্রমণ, বক্সের ভেতর ডিফেন্ডারদের জটলা আর এরিয়াল ডুয়েল থেকে ফিরে আসা বলে লক্ষ্যভেদ করে নিজেই স্কোরলাইন ২-২ করেন মহাতারকা মেসি।
ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। কিন্তু নাটকের তখনও বাকি ছিল। যে আর্জেন্টিনা ধীরগতির পাসের ফুটবল পছন্দ করে, গতিময় পাল্টা আক্রমণ যাদের শক্তিমত্তা নয় সেই আর্জেন্টানাই অতিরিক্ত সময়ের শেষ মুহূর্তে মিসরকে স্তব্ধ করে দেয় এক চোখধাঁধানো কাউন্টার অ্যাটাকে! মিসরের আক্রমণ প্রতিহত করে পাল্টা আক্রমণে ওঠেন লাউতারো মার্টিনেজ। তার নিখুঁত ক্রস থেকে বল জালে জড়ান এনজো ফার্নান্দেজ।
এই জয় কোনো ফুটবল বিশ্লেষকের যুক্তি বা কৌশলের ছকে বাঁধা ছিল না। আর্জেন্টিনা প্রমাণ করল, নিখুঁত ফুটবলীয় দর্শনের বাইরেও কখনো কখনো কেবল আবেগ, সাহস আর বুক চিতিয়ে লড়াই করার মানসিকতা দিয়েই বিশ্বকাপের মঞ্চে টিকে থাকা যায়।

নিজস্ব প্রতিবেদক 



























