5:39 am, Friday, 6 November 2026

পথরোধ,হুমকি ও মানসিক নির্যাতন: কমলগঞ্জে মৃত্যুর কাছে হার মানলো এক স্কুল শিক্ষার্থী!

কমলগঞ্জ প্রতিনিধি: মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর ইউনিয়নে বখাটের দীর্ঘদিনের উত্ত্যক্ততা, হুমকি ও ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগে বিষপান করা এক স্কুলছাত্রীর মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। মৃত্যুর সঙ্গে এক সপ্তাহ লড়াই করে অবশেষে গত শুক্রবার (২২ মে) রাত ১১টার দিকে মারা যায় মাধবপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রী মীম আক্তার (১৫)।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, উপজেলার আদমপুর ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের কাটাবিল গ্রামের মনির মিয়ার ২য় মেয়ে মীম আক্তার দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় যুবক সানুয়ার মিয়ার উত্ত্যক্ততার শিকার ছিল। অভিযুক্ত সানুয়ার মিয়া একই এলাকার আব্দুর রহমান পচন মিয়ার ছেলে।

পরিবারের অভিযোগ, স্কুলে যাতায়াতের পথে প্রায়ই মীমের পথরোধ করতো সানুয়ার। বিভিন্ন অশ্লীল ইঙ্গিত, কটূক্তি ও আপত্তিকর আচরণের মাধ্যমে তাকে মানসিকভাবে চাপে রাখতো। এমনকি এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ছবি তৈরি ও সামাজিকভাবে অপমান করার ভয় দেখিয়ে মেয়েটিকে হুমকি দেওয়া হতো বলেও অভিযোগ পরিবারের।

স্বজনদের দাবি, শুধু তাই নয়—টাকা-পয়সার লোভ দেখানো, পরিবারের ক্ষতি করার হুমকি এবং ইজ্জতহানির ভয় দেখিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মীমকে মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয়। একপর্যায়ে স্থানীয়ভাবে একাধিকবার বিচার-সালিশের চেষ্টা করা হলেও অভিযুক্তের পরিবার থেকে কোনো কার্যকর সমাধান পাওয়া যায়নি।

পরিবারের ভাষ্যমতে, নিজের মানসিক ভারসাম্য ও পরিবারের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে বাধ্য হয়ে সানুয়ারের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে শুরু করে মীম। পরে অভিযুক্ত যুবক তাকে বিভিন্ন সময় রেস্টুরেন্ট, পার্ক, বাজার ও বিভিন্ন স্থানে যেতে বাধ্য করতো। সেই সুযোগে ছবি ও ভিডিও ধারণ করে তাকে নিয়মিত ব্ল্যাকমেইল করা হতো বলেও অভিযোগ উঠেছে।

স্বজনরা আরও জানান, অভিযুক্তের কথামতো চলাফেরা না করলে মীমের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে সানুয়ার। বিভিন্ন সময় ভয়ভীতি, হুমকি ও মানসিক নির্যাতনের কারণে মেয়েটি চরমভাবে ভেঙে পড়ে।

বিভিন্ন সময় স্কুলে যাতায়াতের পথে সানুয়ার মিয়া মীমের পথ আটকে উত্ত্যক্ত করতো বলে নিশ্চিত করেছেন একই স্কুলের নবম ও দশম শ্রেণির কয়েকজন শিক্ষার্থী। উত্ত্যক্ত্যের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন একই ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য কাদির মিয়াও।

পিতা মনির মিয়া জানান, গত সপ্তাহে চরম হতাশা ও আতঙ্কের মধ্যে মীম বিষপান করে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে। পরে তাকে উদ্ধার করে মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। সেখানে কয়েকদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

নিহত কিশোরীর বড় চাচা ও মামলার বাদী মো. আরিফ মিয়া বলেন,“আমার ভাতিজিকে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্নভাবে উত্ত্যক্ত করতো সানুয়ার। আমরা তার পরিবারকে একাধিকবার জানিয়েছি। কিন্তু তারা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। উল্টো ভয়ভীতি দেখিয়েছে। আমার ভাতিজি মানসিক চাপে পড়ে বিষপান করতে বাধ্য হয়েছে।”

তিনি আরও জানান, মৃত্যুর আগে মীম আক্তার তার বক্তব্যে সানুয়ার মিয়ার বিরুদ্ধে তাকে বিষপানে প্ররোচিত করা, ভয়ভীতি ও ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ করে যায়। এ ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে কমলগঞ্জ থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। হত্যা মামলা প্রক্রিয়াধীন বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে কমলগঞ্জ থানার ওসি আব্দুল আউয়াল বলেন, ঘটনাটি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।”

ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। স্থানীয় সচেতন মহল ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের নেতারা কিশোরীর মৃত্যুর জন্য দায়ীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগামী ছাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

Tag :
About Author Information

Sirajul Islam

সাংবাদিক এহসানুল হকের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলার প্রতিবাদে মানববন্ধন ও স্মারকলিপি পেশ

পথরোধ,হুমকি ও মানসিক নির্যাতন: কমলগঞ্জে মৃত্যুর কাছে হার মানলো এক স্কুল শিক্ষার্থী!

Update Time : 09:31:23 am, Sunday, 24 May 2026

কমলগঞ্জ প্রতিনিধি: মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর ইউনিয়নে বখাটের দীর্ঘদিনের উত্ত্যক্ততা, হুমকি ও ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগে বিষপান করা এক স্কুলছাত্রীর মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। মৃত্যুর সঙ্গে এক সপ্তাহ লড়াই করে অবশেষে গত শুক্রবার (২২ মে) রাত ১১টার দিকে মারা যায় মাধবপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রী মীম আক্তার (১৫)।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, উপজেলার আদমপুর ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের কাটাবিল গ্রামের মনির মিয়ার ২য় মেয়ে মীম আক্তার দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় যুবক সানুয়ার মিয়ার উত্ত্যক্ততার শিকার ছিল। অভিযুক্ত সানুয়ার মিয়া একই এলাকার আব্দুর রহমান পচন মিয়ার ছেলে।

পরিবারের অভিযোগ, স্কুলে যাতায়াতের পথে প্রায়ই মীমের পথরোধ করতো সানুয়ার। বিভিন্ন অশ্লীল ইঙ্গিত, কটূক্তি ও আপত্তিকর আচরণের মাধ্যমে তাকে মানসিকভাবে চাপে রাখতো। এমনকি এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ছবি তৈরি ও সামাজিকভাবে অপমান করার ভয় দেখিয়ে মেয়েটিকে হুমকি দেওয়া হতো বলেও অভিযোগ পরিবারের।

স্বজনদের দাবি, শুধু তাই নয়—টাকা-পয়সার লোভ দেখানো, পরিবারের ক্ষতি করার হুমকি এবং ইজ্জতহানির ভয় দেখিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মীমকে মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয়। একপর্যায়ে স্থানীয়ভাবে একাধিকবার বিচার-সালিশের চেষ্টা করা হলেও অভিযুক্তের পরিবার থেকে কোনো কার্যকর সমাধান পাওয়া যায়নি।

পরিবারের ভাষ্যমতে, নিজের মানসিক ভারসাম্য ও পরিবারের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে বাধ্য হয়ে সানুয়ারের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে শুরু করে মীম। পরে অভিযুক্ত যুবক তাকে বিভিন্ন সময় রেস্টুরেন্ট, পার্ক, বাজার ও বিভিন্ন স্থানে যেতে বাধ্য করতো। সেই সুযোগে ছবি ও ভিডিও ধারণ করে তাকে নিয়মিত ব্ল্যাকমেইল করা হতো বলেও অভিযোগ উঠেছে।

স্বজনরা আরও জানান, অভিযুক্তের কথামতো চলাফেরা না করলে মীমের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে সানুয়ার। বিভিন্ন সময় ভয়ভীতি, হুমকি ও মানসিক নির্যাতনের কারণে মেয়েটি চরমভাবে ভেঙে পড়ে।

বিভিন্ন সময় স্কুলে যাতায়াতের পথে সানুয়ার মিয়া মীমের পথ আটকে উত্ত্যক্ত করতো বলে নিশ্চিত করেছেন একই স্কুলের নবম ও দশম শ্রেণির কয়েকজন শিক্ষার্থী। উত্ত্যক্ত্যের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন একই ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য কাদির মিয়াও।

পিতা মনির মিয়া জানান, গত সপ্তাহে চরম হতাশা ও আতঙ্কের মধ্যে মীম বিষপান করে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে। পরে তাকে উদ্ধার করে মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। সেখানে কয়েকদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

নিহত কিশোরীর বড় চাচা ও মামলার বাদী মো. আরিফ মিয়া বলেন,“আমার ভাতিজিকে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্নভাবে উত্ত্যক্ত করতো সানুয়ার। আমরা তার পরিবারকে একাধিকবার জানিয়েছি। কিন্তু তারা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। উল্টো ভয়ভীতি দেখিয়েছে। আমার ভাতিজি মানসিক চাপে পড়ে বিষপান করতে বাধ্য হয়েছে।”

তিনি আরও জানান, মৃত্যুর আগে মীম আক্তার তার বক্তব্যে সানুয়ার মিয়ার বিরুদ্ধে তাকে বিষপানে প্ররোচিত করা, ভয়ভীতি ও ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ করে যায়। এ ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে কমলগঞ্জ থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। হত্যা মামলা প্রক্রিয়াধীন বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে কমলগঞ্জ থানার ওসি আব্দুল আউয়াল বলেন, ঘটনাটি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।”

ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। স্থানীয় সচেতন মহল ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের নেতারা কিশোরীর মৃত্যুর জন্য দায়ীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগামী ছাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।