2:10 pm, Friday, 6 November 2026

৫ ফেব্রুয়ারী গ্রন্থাকার দিবস: বই ভালো বন্ধু

আফতাব চৌধুরী:
একবিংশ শতকের ইলেকট্রনিক বিশ্বে দাঁড়িয়ে হতচকিত হতেই হয়। বৈদ্যুতিন মায়াজালে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়েছে নতুন প্রজন্ম। ভাবিত করছে অভিভাবকদেরও। ই-বুকের (ঊ-ইড়ড়শ) জমানায় ছেলেমেয়েদের বইপড়া বিশেষত সাহিত্য পাঠেরও কোনও আবশ্যিকতা আছে কিÑমনে জাগে সন্দেহ।
আজকের শিশু জন্মাতে না জন্মাতেই কম্প্যুটার দক্ষ একেবারে পাকাপোক্ত নেটের জালে আবদ্ধ। আমরা কি ভেবে দেখেছি যে, নবাগত শিশুটির বর্ণ পরিচয় ঘটে মজার মজার বইয়ের পাতায়। দাদা-দাদীর মুখে গল্প শুনতে শুনতে কখন যে কল্পমায়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায় একটি শিশুর মা-খালাদের মুখে মুখে উচ্ছারিত ছোট্ট ছোট্ট ছড়ায় সাতসমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে স্বপ্নের রাজকুমার খুঁজে পায় রাজকুমারীকে। কল্প-ঘোড়ার পিঠে টগবগ করে ছুটতে ছুটতে কখন যে খুলে যায় মনের দরজা সব কিছুরই অজান্তে। শিশুমন তিল তিল করে বড় মনের অংশীদার হয়ে উঠে। মনে জাগে বই পড়ার আগ্রহ। এমনি করেই শিশু গাছটি বটবৃক্ষের ছায়ায় লালিত-পালিত হয়। প্রকৃতি-পরিবেশের পাশাপাশি মা-খালাদের হাত ধরে গড়ে ওঠে বইপড়ার অভ্যেস। মাস্টারমশাই-আপামণিরা সে পথ মসৃণ করে থাকেন যতদিন না শিশুটি পূর্ণাঙ্গ মানুষ হয়ে উঠতে পারে। তাই জ্ঞানালোকে জ্বলে ওঠার অন্যতম মাধ্যম বই।
কবি বলেছিলেন, শত সহস্র বছরের বহমান স্রোতোধারার কলধ্বনি যদি কোথাও শুনতে পাওয়া যায় কান পাতলেÑতবে সেটা লাইব্রেরি বা গ্রন্থাগার। সেখানে থরে থরে সজ্জিত বইতে লুকানো থাকে কতই না অজানা বিশ্ব।
মানুষ নিত্যদিনের খাওয়া-পরা নিয়ে বেঁচে থাকতে পারে। একটি মানুষের বেঁচে থাকার জন্য বইয়ের প্রয়োজন না-ও থাকতে পারে, কিন্তু সে বাঁচা তো বাঁচা হতে পারে না। দেহের খোরাক যত্রতত্র ছড়িয়ে থাকে-মনের খোরাক জোগান দেয় বই। অনেক অভিজ্ঞ ব্যক্তির অভিমত-বই-ই মানুষের প্রকৃত বন্ধু। বইকে সঙ্গী করে একাকী মানুষ বেঁচে থাকতে পারে।
বই লেখা হয় কাদের জন্য? এককথায় বলতে গেলে বইপড়–য়াদের জন্য অর্থাৎ পাঠকের জন্য। পাঠক আবার যে কেউ নন পাঠক তারাই, যাদের একটি মন আছে। আবার, সেই মনকে হতে হবে ‘সহৃদয় হৃদয় সংবাদী।’ তাত্তি¡ক কথাবার্তা একটু কঠিনও বটে, কিন্তু সহজ করে বললে বলতে হয় যে, মন বই থেকে বিষয় রস উপলব্ধি করতে পারে। নিংড়ে নিতে পারে তার নির্যাসটুকু সে-ই সত্যিকার অর্থে পাঠক। সেই মনকে তৈরি করত হলে তাকে পানি-হাওয়া-মাটি দিয়ে লালন করা চাইÑ সেখানেই প্রয়োজন শিক্ষকের অভিভাবকের। উপযুক্ত শিক্ষাই একজন শিশুকে মানুষ হওয়ার পথ প্রদর্শন করতে পারে। সেই শিক্ষার শুরু বর্ণপরিচয়ের সঙ্গে সঙ্গে পাঠ্যপুস্তক, রূপকথার গল্প, ছড়া, দেশ-বিদেশের সাহিত্য পাঠ। পাঠ্য বিষয়বস্তুতে জ্ঞানাার্জনের পাশাপাশি সাহিত্য পাঠের প্রয়োজনীয়তা যথেষ্টই রয়েছে।
সাহিত্য জ্ঞানদৃষ্টি উন্মীলন করে, প্রজ্ঞাদৃষ্টি খুলে দেয়। বাস্তব সমস্যাজর্জরিত জীবনে বইপড়া অবকাশ যাপনের উৎকৃষ্ট পন্থা। চিন্তা-চেতনা যখন মস্তিষ্ককে বিধ্বস্ত করে মানবমন মুক্তির আশ্বাস খুঁেজ পায় সাহিত্যে তাই। বইপড়ার অভ্যাস প্রত্যেকেরই গড়ে তোলা উচিত।
আজকাল ছাত্রছাত্রীরা ইন্টারনেটের মাধ্যমে পুঁথি-পত্র-তথ্যাদি সংগ্রহ করে থাকে। বৈদ্যুতিক মাধ্যমের অবদান নানা সুযোগ সুবিধা হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে সারা বিশ্বকে। কিন্তু পরিসংখ্যান নিলে দেখা যাবে, গড়পড়তা কতজন ছাত্রছাত্রী সে সুবিধা ভোগ করছে সে সংখ্যা নগণ্য। মুষ্টিমেয় কিছু ছাত্রছাত্রী সে সুবিধা পেলেও অধিকাংশই বঞ্চিত থাকছে। তাই চির পুরাতন হলেও বড়পড়ার অভ্যেস চালু রাখা অবশ্য কর্তব্য। বই পড়ার যে আনন্দ, তা তো ভিন্নতর মাধ্যমে উপভোগ করা যায় না। বই থেকে রস গ্রহণ করতে না পারলে সে আনন্দ আস্বাদন মিলবে না।
বই আমাদের জ্ঞানচক্ষু-উম্মীলন করে, চৈতন্য জাগ্রত করে, অজানা-অচেনা বিশ্বকে জানায়, চেনায়, বই-ই আবার পাঠক মনকে আনন্দ সাগরে ভাসায়। বিদ্যাচর্চার জনপ্রিয় মাধ্যম বইপড়া নতুন প্রজন্মের কাছে সাদরে গৃহীত হোক এই হোক অঙ্গীকার।
সাংবাদিক ও কলামিষ্ট।

Tag :
About Author Information

Sirajul Islam

সাংবাদিক এহসানুল হকের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলার প্রতিবাদে মানববন্ধন ও স্মারকলিপি পেশ

৫ ফেব্রুয়ারী গ্রন্থাকার দিবস: বই ভালো বন্ধু

Update Time : 01:42:58 pm, Friday, 3 February 2023

আফতাব চৌধুরী:
একবিংশ শতকের ইলেকট্রনিক বিশ্বে দাঁড়িয়ে হতচকিত হতেই হয়। বৈদ্যুতিন মায়াজালে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়েছে নতুন প্রজন্ম। ভাবিত করছে অভিভাবকদেরও। ই-বুকের (ঊ-ইড়ড়শ) জমানায় ছেলেমেয়েদের বইপড়া বিশেষত সাহিত্য পাঠেরও কোনও আবশ্যিকতা আছে কিÑমনে জাগে সন্দেহ।
আজকের শিশু জন্মাতে না জন্মাতেই কম্প্যুটার দক্ষ একেবারে পাকাপোক্ত নেটের জালে আবদ্ধ। আমরা কি ভেবে দেখেছি যে, নবাগত শিশুটির বর্ণ পরিচয় ঘটে মজার মজার বইয়ের পাতায়। দাদা-দাদীর মুখে গল্প শুনতে শুনতে কখন যে কল্পমায়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায় একটি শিশুর মা-খালাদের মুখে মুখে উচ্ছারিত ছোট্ট ছোট্ট ছড়ায় সাতসমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে স্বপ্নের রাজকুমার খুঁজে পায় রাজকুমারীকে। কল্প-ঘোড়ার পিঠে টগবগ করে ছুটতে ছুটতে কখন যে খুলে যায় মনের দরজা সব কিছুরই অজান্তে। শিশুমন তিল তিল করে বড় মনের অংশীদার হয়ে উঠে। মনে জাগে বই পড়ার আগ্রহ। এমনি করেই শিশু গাছটি বটবৃক্ষের ছায়ায় লালিত-পালিত হয়। প্রকৃতি-পরিবেশের পাশাপাশি মা-খালাদের হাত ধরে গড়ে ওঠে বইপড়ার অভ্যেস। মাস্টারমশাই-আপামণিরা সে পথ মসৃণ করে থাকেন যতদিন না শিশুটি পূর্ণাঙ্গ মানুষ হয়ে উঠতে পারে। তাই জ্ঞানালোকে জ্বলে ওঠার অন্যতম মাধ্যম বই।
কবি বলেছিলেন, শত সহস্র বছরের বহমান স্রোতোধারার কলধ্বনি যদি কোথাও শুনতে পাওয়া যায় কান পাতলেÑতবে সেটা লাইব্রেরি বা গ্রন্থাগার। সেখানে থরে থরে সজ্জিত বইতে লুকানো থাকে কতই না অজানা বিশ্ব।
মানুষ নিত্যদিনের খাওয়া-পরা নিয়ে বেঁচে থাকতে পারে। একটি মানুষের বেঁচে থাকার জন্য বইয়ের প্রয়োজন না-ও থাকতে পারে, কিন্তু সে বাঁচা তো বাঁচা হতে পারে না। দেহের খোরাক যত্রতত্র ছড়িয়ে থাকে-মনের খোরাক জোগান দেয় বই। অনেক অভিজ্ঞ ব্যক্তির অভিমত-বই-ই মানুষের প্রকৃত বন্ধু। বইকে সঙ্গী করে একাকী মানুষ বেঁচে থাকতে পারে।
বই লেখা হয় কাদের জন্য? এককথায় বলতে গেলে বইপড়–য়াদের জন্য অর্থাৎ পাঠকের জন্য। পাঠক আবার যে কেউ নন পাঠক তারাই, যাদের একটি মন আছে। আবার, সেই মনকে হতে হবে ‘সহৃদয় হৃদয় সংবাদী।’ তাত্তি¡ক কথাবার্তা একটু কঠিনও বটে, কিন্তু সহজ করে বললে বলতে হয় যে, মন বই থেকে বিষয় রস উপলব্ধি করতে পারে। নিংড়ে নিতে পারে তার নির্যাসটুকু সে-ই সত্যিকার অর্থে পাঠক। সেই মনকে তৈরি করত হলে তাকে পানি-হাওয়া-মাটি দিয়ে লালন করা চাইÑ সেখানেই প্রয়োজন শিক্ষকের অভিভাবকের। উপযুক্ত শিক্ষাই একজন শিশুকে মানুষ হওয়ার পথ প্রদর্শন করতে পারে। সেই শিক্ষার শুরু বর্ণপরিচয়ের সঙ্গে সঙ্গে পাঠ্যপুস্তক, রূপকথার গল্প, ছড়া, দেশ-বিদেশের সাহিত্য পাঠ। পাঠ্য বিষয়বস্তুতে জ্ঞানাার্জনের পাশাপাশি সাহিত্য পাঠের প্রয়োজনীয়তা যথেষ্টই রয়েছে।
সাহিত্য জ্ঞানদৃষ্টি উন্মীলন করে, প্রজ্ঞাদৃষ্টি খুলে দেয়। বাস্তব সমস্যাজর্জরিত জীবনে বইপড়া অবকাশ যাপনের উৎকৃষ্ট পন্থা। চিন্তা-চেতনা যখন মস্তিষ্ককে বিধ্বস্ত করে মানবমন মুক্তির আশ্বাস খুঁেজ পায় সাহিত্যে তাই। বইপড়ার অভ্যাস প্রত্যেকেরই গড়ে তোলা উচিত।
আজকাল ছাত্রছাত্রীরা ইন্টারনেটের মাধ্যমে পুঁথি-পত্র-তথ্যাদি সংগ্রহ করে থাকে। বৈদ্যুতিক মাধ্যমের অবদান নানা সুযোগ সুবিধা হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে সারা বিশ্বকে। কিন্তু পরিসংখ্যান নিলে দেখা যাবে, গড়পড়তা কতজন ছাত্রছাত্রী সে সুবিধা ভোগ করছে সে সংখ্যা নগণ্য। মুষ্টিমেয় কিছু ছাত্রছাত্রী সে সুবিধা পেলেও অধিকাংশই বঞ্চিত থাকছে। তাই চির পুরাতন হলেও বড়পড়ার অভ্যেস চালু রাখা অবশ্য কর্তব্য। বই পড়ার যে আনন্দ, তা তো ভিন্নতর মাধ্যমে উপভোগ করা যায় না। বই থেকে রস গ্রহণ করতে না পারলে সে আনন্দ আস্বাদন মিলবে না।
বই আমাদের জ্ঞানচক্ষু-উম্মীলন করে, চৈতন্য জাগ্রত করে, অজানা-অচেনা বিশ্বকে জানায়, চেনায়, বই-ই আবার পাঠক মনকে আনন্দ সাগরে ভাসায়। বিদ্যাচর্চার জনপ্রিয় মাধ্যম বইপড়া নতুন প্রজন্মের কাছে সাদরে গৃহীত হোক এই হোক অঙ্গীকার।
সাংবাদিক ও কলামিষ্ট।