8:48 pm, Thursday, 21 May 2026

যে ছিনতাইকারীদের কারণে আতঙ্কে ছিলেন শ্রীমঙ্গলবাসী, তাদের মূল হোতা খালেদকে আটক করেছে পুলিশ

বিকুল চক্রবর্তী:: মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে একের পর এক ছিনতাইয়ের ঘটনায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন শহর ও শহরতলীর বাসিন্দারা। ধারাবাহিক এসব ঘটনায় পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ছিনতাইকারী চক্রটি প্রতিবারই নিরাপদে পালিয়ে যেতে সক্ষম হতো।

একটি মোটরসাইকেলে কখনো দুইজন, কখনো তিনজন চড়ে শহরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়াত তারা। সুযোগ পেলেই পেছনে থাকা ব্যক্তি কাঁধের ব্যাগ থেকে ধারালো দা বের করে কয়েক মিনিটের মধ্যে নগদ টাকা, মোবাইল ফোন, সোনার চেইন ও আংটি ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যেত।

শ্রীমঙ্গল থানার অফিসার ইনচার্জ জহিরুল ইসলাম মুন্না জানান, শ্রীমঙ্গলের বাইরে থেকে মোটরসাইকেলে এসে একদল ছিনতাইকারী এসব ঘটনা ঘটিয়ে দ্রুত এলাকা ত্যাগ করত। তাদের ধরতে পুলিশ বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে। একাধিক স্থানে মোটরসাইকেল চেকিংও চালানো হয়। তবে প্রথমদিকে তাদের আটক করা সম্ভব হয়নি। পরে অবশেষে চক্রের মূল হোতা খালেদকে তার ব্যবহৃত মোটরসাইকেল ও অন্যান্য আলামতসহ সিলেট থেকে আটক করা হয়।

শ্রীমঙ্গলের রূপসপুর এলাকার শিক্ষিকা অর্পিতা রায় জানান, গত ৩ মে বিকেল ৪টার দিকে তিনি পশ্চিম শ্রীমঙ্গল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে সবুজবাগ এলাকার বাসায় ফিরছিলেন। পথে রূপসপুর আখড়ার পাশে মোটরসাইকেলে এসে ছিনতাইকারী চক্রটি ধারালো দা দেখিয়ে তার প্রায় পৌনে এক ভরি ওজনের সোনার চেইন ছিনিয়ে নেয়। এ ঘটনায় তিনি শ্রীমঙ্গল থানায় লিখিত অভিযোগ করেন।

এর দুইদিন পর একই চক্র সন্ধানী আবাসিক এলাকা থেকে আরেক নারীর কানের ইমিটেশনের দুল সোনা ভেবে ছিনিয়ে নেয়।

একই দিনে সবুজবাগ ড্যামের পুল এলাকায় আরেক নারীর কাছ থেকে দা দেখিয়ে পার্স ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে তারা। তবে পেছন থেকে একটি টমটম আসতে দেখে ছিনতাইকারীরা পালিয়ে যায়।

সেদিন বিকেলে শ্রীমঙ্গলের মাস্টারপাড়া এলাকায় আরেক নারী জয়া সাহার গলায় দা ধরে কানের ও গলার অলংকার ছিনিয়ে নেয় চক্রটি। এ সময় জয়া সাহা আহত হন।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ঝুমা গোম্বাসী জানান, তিনি পাশের একটি ভবনের দ্বিতীয় তলায় ছিলেন। হঠাৎ তিনি দেখতে পান, মাস্টারপাড়ার সড়কে এক নারীর গলা থেকে চেইন ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এ সময় এক টমটমচালক এগিয়ে এলে ছিনতাইকারীরা তার দিকেও ধাওয়া দেয়। পরে তিনি ও পাশের ভবনের আরেক নারী চিৎকার দিলে ছিনতাইকারীরা পালিয়ে যায়।

“অপরদিকে, গত ১৮ ফেব্রুয়ারি শ্রীমঙ্গলের গুহ রোড এলাকার সহকারী অধ্যাপক সুদর্শন শীলের বাসা থেকে চোরচক্র ১৫ ভরি স্বর্ণ ও নগদ প্রায় দুই লাখ টাকা চুরি করে নিয়ে যায়। সহকারী অধ্যাপক সুদর্শন শীল জানান, এ ব্যাপারে তিনি শ্রীমঙ্গল থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।”

এ ঘটনায় মামলার তদন্তভার পড়ে শ্রীমঙ্গল থানার এসআই মহিবুর রহমানের ওপর। গত ৩ মে রাতে অভিযোগ পাওয়ার পর থেকেই তিনি তদন্তে নামেন।

এসআই মহিবুর রহমান জানান, মামলাটি ছিল ‘ক্লুলেস’। তারপরও তিনি আশা ছাড়েননি। সম্প্রতি শ্রীমঙ্গলে সংঘটিত প্রতিটি ঘটনার স্থানে গিয়ে তিনি ঘটনার সময় ও বর্ণনা অনুযায়ী সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করতে থাকেন। ফুটেজ দেখে তিনি ছিনতাইকারীদের শনাক্ত করলেও শ্রীমঙ্গল বা আশপাশের কোনো থানার পুলিশ তাদের চিনতে পারেনি।

পরবর্তীতে তিনি ছিনতাইকারীদের পালিয়ে যাওয়ার সম্ভাব্য পথ ধরে তদন্ত চালান। গত ১৫ দিনে তিনি প্রায় শতাধিক সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করেন, যার মধ্যে অন্তত ২৫টিতে ছিনতাইকারীদের দেখা যায়। তদন্তের ধারাবাহিকতায় তিনি শ্রীমঙ্গল-ভানুগাছ সড়ক, কমলগঞ্জ, শমশেরনগর ও কুলাউড়া হয়ে সিলেট পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ অনুসরণ করেন।

দীর্ঘ পর্যালোচনা ও যাচাই-বাছাই শেষে গত ১৯ মে সিলেট নগরীর জালালাবাদ থানার আখালিয়া গেট এলাকার একটি নির্জন বাসা থেকে ছিনতাইকারী চক্রের মূল হোতা খালেদ আহমেদকে (৩৪) গ্রেপ্তার করা হয়। খালেদ সিলেটের গোলাপগঞ্জ থানার গৌরাবাড়ী এলাকার বাশির মিয়ার ছেলে।

এ সময় তার কাছ থেকে ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত মোটরসাইকেল, হেলমেট, নগদ টাকা, মোবাইল ফোন ও পার্স উদ্ধার করা হয়।

এসআই মহিবুর রহমান আরও জানান, এই চক্র শুধু শ্রীমঙ্গলে নয়, মৌলভীবাজার সদর ও হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ এলাকাতেও একাধিক ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটিয়েছে। প্রয়োজনীয় জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ২০ মে আসামিকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে মৌলভীবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নোবেল চাকমা জানান, “অনেক কষ্ট করে আমরা এই ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করেছি।

Tag :
About Author Information

Sirajul Islam

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে রক্তপাত বন্ধ করাই চ্যালেঞ্জ: সিইসি

যে ছিনতাইকারীদের কারণে আতঙ্কে ছিলেন শ্রীমঙ্গলবাসী, তাদের মূল হোতা খালেদকে আটক করেছে পুলিশ

Update Time : 10:08:33 am, Thursday, 21 May 2026

বিকুল চক্রবর্তী:: মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে একের পর এক ছিনতাইয়ের ঘটনায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন শহর ও শহরতলীর বাসিন্দারা। ধারাবাহিক এসব ঘটনায় পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ছিনতাইকারী চক্রটি প্রতিবারই নিরাপদে পালিয়ে যেতে সক্ষম হতো।

একটি মোটরসাইকেলে কখনো দুইজন, কখনো তিনজন চড়ে শহরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়াত তারা। সুযোগ পেলেই পেছনে থাকা ব্যক্তি কাঁধের ব্যাগ থেকে ধারালো দা বের করে কয়েক মিনিটের মধ্যে নগদ টাকা, মোবাইল ফোন, সোনার চেইন ও আংটি ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যেত।

শ্রীমঙ্গল থানার অফিসার ইনচার্জ জহিরুল ইসলাম মুন্না জানান, শ্রীমঙ্গলের বাইরে থেকে মোটরসাইকেলে এসে একদল ছিনতাইকারী এসব ঘটনা ঘটিয়ে দ্রুত এলাকা ত্যাগ করত। তাদের ধরতে পুলিশ বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে। একাধিক স্থানে মোটরসাইকেল চেকিংও চালানো হয়। তবে প্রথমদিকে তাদের আটক করা সম্ভব হয়নি। পরে অবশেষে চক্রের মূল হোতা খালেদকে তার ব্যবহৃত মোটরসাইকেল ও অন্যান্য আলামতসহ সিলেট থেকে আটক করা হয়।

শ্রীমঙ্গলের রূপসপুর এলাকার শিক্ষিকা অর্পিতা রায় জানান, গত ৩ মে বিকেল ৪টার দিকে তিনি পশ্চিম শ্রীমঙ্গল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে সবুজবাগ এলাকার বাসায় ফিরছিলেন। পথে রূপসপুর আখড়ার পাশে মোটরসাইকেলে এসে ছিনতাইকারী চক্রটি ধারালো দা দেখিয়ে তার প্রায় পৌনে এক ভরি ওজনের সোনার চেইন ছিনিয়ে নেয়। এ ঘটনায় তিনি শ্রীমঙ্গল থানায় লিখিত অভিযোগ করেন।

এর দুইদিন পর একই চক্র সন্ধানী আবাসিক এলাকা থেকে আরেক নারীর কানের ইমিটেশনের দুল সোনা ভেবে ছিনিয়ে নেয়।

একই দিনে সবুজবাগ ড্যামের পুল এলাকায় আরেক নারীর কাছ থেকে দা দেখিয়ে পার্স ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে তারা। তবে পেছন থেকে একটি টমটম আসতে দেখে ছিনতাইকারীরা পালিয়ে যায়।

সেদিন বিকেলে শ্রীমঙ্গলের মাস্টারপাড়া এলাকায় আরেক নারী জয়া সাহার গলায় দা ধরে কানের ও গলার অলংকার ছিনিয়ে নেয় চক্রটি। এ সময় জয়া সাহা আহত হন।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ঝুমা গোম্বাসী জানান, তিনি পাশের একটি ভবনের দ্বিতীয় তলায় ছিলেন। হঠাৎ তিনি দেখতে পান, মাস্টারপাড়ার সড়কে এক নারীর গলা থেকে চেইন ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এ সময় এক টমটমচালক এগিয়ে এলে ছিনতাইকারীরা তার দিকেও ধাওয়া দেয়। পরে তিনি ও পাশের ভবনের আরেক নারী চিৎকার দিলে ছিনতাইকারীরা পালিয়ে যায়।

“অপরদিকে, গত ১৮ ফেব্রুয়ারি শ্রীমঙ্গলের গুহ রোড এলাকার সহকারী অধ্যাপক সুদর্শন শীলের বাসা থেকে চোরচক্র ১৫ ভরি স্বর্ণ ও নগদ প্রায় দুই লাখ টাকা চুরি করে নিয়ে যায়। সহকারী অধ্যাপক সুদর্শন শীল জানান, এ ব্যাপারে তিনি শ্রীমঙ্গল থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।”

এ ঘটনায় মামলার তদন্তভার পড়ে শ্রীমঙ্গল থানার এসআই মহিবুর রহমানের ওপর। গত ৩ মে রাতে অভিযোগ পাওয়ার পর থেকেই তিনি তদন্তে নামেন।

এসআই মহিবুর রহমান জানান, মামলাটি ছিল ‘ক্লুলেস’। তারপরও তিনি আশা ছাড়েননি। সম্প্রতি শ্রীমঙ্গলে সংঘটিত প্রতিটি ঘটনার স্থানে গিয়ে তিনি ঘটনার সময় ও বর্ণনা অনুযায়ী সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করতে থাকেন। ফুটেজ দেখে তিনি ছিনতাইকারীদের শনাক্ত করলেও শ্রীমঙ্গল বা আশপাশের কোনো থানার পুলিশ তাদের চিনতে পারেনি।

পরবর্তীতে তিনি ছিনতাইকারীদের পালিয়ে যাওয়ার সম্ভাব্য পথ ধরে তদন্ত চালান। গত ১৫ দিনে তিনি প্রায় শতাধিক সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করেন, যার মধ্যে অন্তত ২৫টিতে ছিনতাইকারীদের দেখা যায়। তদন্তের ধারাবাহিকতায় তিনি শ্রীমঙ্গল-ভানুগাছ সড়ক, কমলগঞ্জ, শমশেরনগর ও কুলাউড়া হয়ে সিলেট পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ অনুসরণ করেন।

দীর্ঘ পর্যালোচনা ও যাচাই-বাছাই শেষে গত ১৯ মে সিলেট নগরীর জালালাবাদ থানার আখালিয়া গেট এলাকার একটি নির্জন বাসা থেকে ছিনতাইকারী চক্রের মূল হোতা খালেদ আহমেদকে (৩৪) গ্রেপ্তার করা হয়। খালেদ সিলেটের গোলাপগঞ্জ থানার গৌরাবাড়ী এলাকার বাশির মিয়ার ছেলে।

এ সময় তার কাছ থেকে ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত মোটরসাইকেল, হেলমেট, নগদ টাকা, মোবাইল ফোন ও পার্স উদ্ধার করা হয়।

এসআই মহিবুর রহমান আরও জানান, এই চক্র শুধু শ্রীমঙ্গলে নয়, মৌলভীবাজার সদর ও হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ এলাকাতেও একাধিক ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটিয়েছে। প্রয়োজনীয় জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ২০ মে আসামিকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে মৌলভীবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নোবেল চাকমা জানান, “অনেক কষ্ট করে আমরা এই ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করেছি।