6:30 pm, Saturday, 7 November 2026

ট্রাম্পের ভরাডুবি: দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার সুযোগ মধ্যপ্রাচ্যের

ডেস্ক রিপোর্ট : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, ২০২৬ সালের ১৬ মার্চ ওভাল অফিসে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে লড়াই হয়েছে, এমনটাই বলবেন বিশ্লেষকেরা। তবে গভীরভাবে দেখলে পররাষ্ট্রনীতির বিষয়েও ভোটারদের রায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের ভূমিকা, ইসরায়েলের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থন এবং ইরানের বিরুদ্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধ—সবকিছুর বিরুদ্ধেই অবস্থান জানিয়েছেন ভোটাররা।
রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে।

কয়েক দশক ধরে রিপাবলিকানদের ভোট দিয়ে আসা কয়েকটি অঙ্গরাজ্যও এবার ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে গেছে। এ নিয়ে ইতোমধ্যে নানা বিশ্লেষণ সামনে এসেছে।
ট্রাম্প তেহরানে সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন। কিন্তু ইরান টিকে থেকে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে সহায়তা করেছে।
নির্বাচনের ফল ইসরায়েলপন্থি লবি এবং তাদের নব্য রক্ষণশীল সক্রিয় রাজনীতির জন্যও একটি বাঁকবদল। একসময় ইসরায়েলপন্থি লবি সংগঠন আইপ্যাকের সমর্থন প্রার্থীদের জন্য বড় সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হতো। এখন অনেক প্রার্থী সেই সমর্থন থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নিতে ব্যস্ত। এ পরিস্থিতিতে লবিটি কম দৃশ্যমান বিভিন্ন মাধ্যমে অর্থ ব্যয়ের কৌশল নিয়েছে।

ইসরায়েল সরকারের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নিঃশর্ত ও সীমাহীন সামরিক এবং আর্থিক সমর্থনের সমালোচনা করা প্রার্থীদের বিরুদ্ধে লাখ লাখ ডলার ব্যয় করেছে আইপ্যাক। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী এলাকাগুলোতে সেই অর্থ ভোটারদের সিদ্ধান্ত বদলাতে পারেনি।

এর সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ মিশিগান। অঙ্গরাজ্যটির সিনেট আসনে জয়ী ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদ মার্কিন স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে প্রচার চালিয়েছেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বীরা নির্বাচনকে ইসরায়েলের স্বার্থের পক্ষে-বিপক্ষে ভোট হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলেন।

কিন্তু ভোটাররা সেই প্রচারণা বুঝতে পেরেছেন এবং রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। রজার্সের প্রচারে ইসরায়েলের প্রতি আনুগত্যের ফাঁকা প্রতিশ্রুতি থাকলেও মিশিগানের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা নিয়ে তেমন কিছু ছিল না। ইসরায়েলের প্রতি ওয়াশিংটনের আনুগত্য যুক্তরাষ্ট্রকে ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় সামরিক পরাজয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

ইরাক বা আফগানিস্তানের পরাজয়ের বিপরীতে এবারের যুদ্ধের প্রভাব সাধারণ মার্কিনিরা নিজ দেশেই, নিজেদের পকেটে অনুভব করেছেন। ইরান যুদ্ধ মার্কিনিদের আরও দরিদ্র করেছে, তাদের দেশকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে এবং চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় ওয়াশিংটনকে আরও দুর্বল অবস্থানে ফেলেছে।

অন্যদিকে, তেহরান ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে। ইসরায়েল ও ট্রাম্প প্রশাসনের কয়েক মাসের যুদ্ধংদেহী বক্তব্য সহ্য করেছে তারা। নির্বাচনের আগে উভয় পক্ষই যেন আরেক দফা বড় যুদ্ধ বাধাতে আগ্রহী ছিল।

ট্রাম্প যাতে নির্বাচনী প্রচারে কূটনৈতিক সাফল্য দেখাতে না পারেন, সে জন্যও ইরান কোনো সমঝোতার সুযোগ দেয়নি। তবে এ হিসাবের ঝুঁকিও রয়েছে। কারণ, এখন ইরানের মুখোমুখি এমন এক প্রেসিডেন্ট, যিনি প্রতিশোধ নিতে চাইতে পারেন।

উপসাগরীয় লবির উত্থান
ইসরায়েলপন্থি লবির প্রভাব কমার সঙ্গে সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর লবির প্রভাব বাড়ছে বলেই মনে হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল হলেও উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অংশীদার ও অবদানকারী হিসেবে তুলে ধরেছে। মার্কিন স্বার্থের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলটিতে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে কৌশলগত গভীরতা দিচ্ছে।

উপসাগরীয় দেশগুলো মার্কিন অর্থনীতিতে ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তাদের সার্বভৌম সম্পদ তহবিলও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করছে। এ ছাড়া গাজা থেকে ইরান—ইসরায়েলের তৈরি বিভিন্ন সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে ট্রাম্পকে বারবার কূটনৈতিক পথ দেখিয়েছে কাতার ও ওমান।

তারপরও যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মুখোমুখি অবস্থানে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে উপসাগরীয় দেশগুলো। ইরানের পাশাপাশি তারাই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছে এবং যুদ্ধের বোঝার বড় অংশ বহন করেছে।

উপসাগরীয় দেশগুলোর রাজধানীগুলোতে ট্রাম্প ও তার ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন (মাগা)’ আন্দোলন নিয়ে হতাশা স্পষ্ট। ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। উপসাগরীয় নেতারাও তার ‘আমেরিকাকে আবার মহান করার’ অঙ্গীকারে আস্থা রেখেছিলেন।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা পেয়েছেন ইসরায়েলপন্থি আরেক প্রেসিডেন্টকে, যাকে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিজের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে সহজেই ব্যবহার করেছেন।

এ কারণে রিয়াদ, দোহা ও আবুধাবি এখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবমুক্ত এক মধ্যপ্রাচ্যের সম্ভাবনা নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে। এমন ব্যবস্থায় এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি থাকবে ঠিকই, তবে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে তার অংশীদারত্ব বৃহত্তর বহুপক্ষীয় চুক্তির কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হবে।

মধ্যবর্তী নির্বাচন উপসাগরীয় নেতাদের ট্রাম্প-পরবর্তী যুক্তরাষ্ট্রের কথাও ভাবার সুযোগ করে দিয়েছে। তারা এমন একটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা করছেন, যা হবে বেশি পূর্বানুমানযোগ্য, কম খামখেয়ালি এবং আঞ্চলিক সংঘাত থেকে দূরে থাকতে আগ্রহী। শেষের বিষয়টিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে এখন এমন যুক্তরাষ্ট্র বেশি কাম্য, যারা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে জড়িয়ে পড়বে না। কারণ, বারবার জেতা অসম্ভব এমন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে প্রতিবারই অঞ্চলটিকে আরও খারাপ অবস্থায় ফেলে যাচ্ছে ওয়াশিংটন।

খোঁড়াতে থাকা ট্রাম্প
উপসাগরীয় দেশগুলো ইতোমধ্যে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ও স্বনির্ভরতার পথে এগিয়েছে। রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়া ট্রাম্প সেই প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত করবে। উপসাগরীয় সরকারগুলো ওয়াশিংটনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে ইউরোপসহ অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াবে।

তবে দীর্ঘস্থায়ী সমাধান নিহিত রয়েছে এ অঞ্চলের মধ্যেই। উপসাগরীয় দেশগুলো ও ইরানের মধ্যে আরও গভীর সহযোগিতা প্রয়োজন। এর ভিত্তি হতে পারে তাদের নিজেদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সম্পাদিত একটি অনাক্রমণ চুক্তি, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র থাকবে আলোচনার বাইরে।

এ উদ্যোগ সফল করতে দুটি শর্ত পূরণ করতে হবে। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রকে আবার যুদ্ধে জড়ানো থেকে বিরত রাখতে উপসাগরীয় দেশগুলোকে ওয়াশিংটনে নিজেদের প্রভাব একত্র করতে হবে এবং একটি অভিন্ন লক্ষ্য অর্জনে তা কাজে লাগাতে হবে।

যুদ্ধের আরেকটি দফা আগের চেয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য আরও ভয়াবহ হবে। এতে একমাত্র লাভবান হবে ইসরায়েল। ট্রাম্পের প্রস্তাব করা প্রতিটি সামরিক পদক্ষেপই উপসাগরীয় অঞ্চলের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে, সম্পদ ধ্বংস করবে এবং বিশ্ব অর্থনীতিকে দুর্বল করে দেবে।

দ্বিতীয়ত, এমন একটি কূটনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যা পরস্পরের প্রতি প্রায় শূন্য আস্থার দুটি পক্ষের কাছেই গ্রহণযোগ্য হবে। আবারও সেই কঠিন দায়িত্ব এসে পড়েছে কাতারের কাঁধে।

সময় খুব কম। ট্রাম্পের হারানোর তেমন কিছু নেই। রিপাবলিকান পার্টির প্রতিও তার কখনো খুব বেশি আগ্রহ ছিল না। শিগগির কোনো সমঝোতা না হলে নিজের অহং তৃপ্ত করতে সামরিক হামলার সম্ভাবনা বাড়বে, আর তা ঘটতে পারে আরও দ্রুত।

তবে আশার একটি জায়গা রয়েছে। ট্রাম্পের নির্বাচনী জয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে, এমন ছাড় ইরান আগে দেয়নি। এখন ভোটের ফল ঘোষণা হয়ে যাওয়ায় সেই বিবেচনার আর প্রয়োজন নেই। তেহরান এখন তুলনামূলক নমনীয় অবস্থান নিতে পারে এবং একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা এখনো সম্ভব।

মার্কিন ভোটাররা ওয়াশিংটনের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিয়েছেন। নতুন নির্বাচিত অনেক আইনপ্রণেতা মাগা আন্দোলনের মূল প্রতিশ্রুতির প্রতিধ্বনি করছেন—এমন একটি যুক্তরাষ্ট্র, যারা সরাসরি নেতৃত্ব না দিয়ে পেছন থেকে কাজ করবে এবং নিজেদের অঞ্চলের দায়িত্ব নিতে সক্ষম অংশীদারদের মাধ্যমে লক্ষ্য অর্জন করবে।

উপসাগরীয় লবিকেও সেই অনুযায়ী কৌশল বদলাতে হবে। কংগ্রেসের নতুন প্রজন্মের আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলাই এখন তাদের কাজ। এই আইনপ্রণেতারা অতীতের নব্য রক্ষণশীল রাজনীতিকদের চ্যালেঞ্জ করছেন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেদের হাতে নেওয়ার উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রস্তুতিকে সমর্থন করছেন।

লেখক ড. আন্দ্রেয়াস ক্রিগ লন্ডনের কিংস কলেজের ডিফেন্স স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। তিনি মধ্যপ্রাচ্যে সরকারি ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কৌশলগত ঝুঁকি পরামর্শক হিসেবেও কাজ করেন। সম্প্রতি তার ‘সোসিও-পলিটিক্যাল অর্ডার অ্যান্ড সিকিউরিটি ইন দ্য আরব ওয়ার্ল্ড’ বইটি প্রকাশিত হয়েছে।

Tag :
About Author Information

Sirajul Islam

কুলাউড়ার আলী আমজদ স্কুল ও কলেজে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উদ্‌যাপন

ট্রাম্পের ভরাডুবি: দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার সুযোগ মধ্যপ্রাচ্যের

Update Time : 07:28:01 am, Saturday, 7 November 2026

ডেস্ক রিপোর্ট : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, ২০২৬ সালের ১৬ মার্চ ওভাল অফিসে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে লড়াই হয়েছে, এমনটাই বলবেন বিশ্লেষকেরা। তবে গভীরভাবে দেখলে পররাষ্ট্রনীতির বিষয়েও ভোটারদের রায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের ভূমিকা, ইসরায়েলের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থন এবং ইরানের বিরুদ্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধ—সবকিছুর বিরুদ্ধেই অবস্থান জানিয়েছেন ভোটাররা।
রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে।

কয়েক দশক ধরে রিপাবলিকানদের ভোট দিয়ে আসা কয়েকটি অঙ্গরাজ্যও এবার ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে গেছে। এ নিয়ে ইতোমধ্যে নানা বিশ্লেষণ সামনে এসেছে।
ট্রাম্প তেহরানে সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন। কিন্তু ইরান টিকে থেকে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে সহায়তা করেছে।
নির্বাচনের ফল ইসরায়েলপন্থি লবি এবং তাদের নব্য রক্ষণশীল সক্রিয় রাজনীতির জন্যও একটি বাঁকবদল। একসময় ইসরায়েলপন্থি লবি সংগঠন আইপ্যাকের সমর্থন প্রার্থীদের জন্য বড় সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হতো। এখন অনেক প্রার্থী সেই সমর্থন থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নিতে ব্যস্ত। এ পরিস্থিতিতে লবিটি কম দৃশ্যমান বিভিন্ন মাধ্যমে অর্থ ব্যয়ের কৌশল নিয়েছে।

ইসরায়েল সরকারের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নিঃশর্ত ও সীমাহীন সামরিক এবং আর্থিক সমর্থনের সমালোচনা করা প্রার্থীদের বিরুদ্ধে লাখ লাখ ডলার ব্যয় করেছে আইপ্যাক। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী এলাকাগুলোতে সেই অর্থ ভোটারদের সিদ্ধান্ত বদলাতে পারেনি।

এর সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ মিশিগান। অঙ্গরাজ্যটির সিনেট আসনে জয়ী ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদ মার্কিন স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে প্রচার চালিয়েছেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বীরা নির্বাচনকে ইসরায়েলের স্বার্থের পক্ষে-বিপক্ষে ভোট হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলেন।

কিন্তু ভোটাররা সেই প্রচারণা বুঝতে পেরেছেন এবং রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। রজার্সের প্রচারে ইসরায়েলের প্রতি আনুগত্যের ফাঁকা প্রতিশ্রুতি থাকলেও মিশিগানের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা নিয়ে তেমন কিছু ছিল না। ইসরায়েলের প্রতি ওয়াশিংটনের আনুগত্য যুক্তরাষ্ট্রকে ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় সামরিক পরাজয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

ইরাক বা আফগানিস্তানের পরাজয়ের বিপরীতে এবারের যুদ্ধের প্রভাব সাধারণ মার্কিনিরা নিজ দেশেই, নিজেদের পকেটে অনুভব করেছেন। ইরান যুদ্ধ মার্কিনিদের আরও দরিদ্র করেছে, তাদের দেশকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে এবং চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় ওয়াশিংটনকে আরও দুর্বল অবস্থানে ফেলেছে।

অন্যদিকে, তেহরান ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে। ইসরায়েল ও ট্রাম্প প্রশাসনের কয়েক মাসের যুদ্ধংদেহী বক্তব্য সহ্য করেছে তারা। নির্বাচনের আগে উভয় পক্ষই যেন আরেক দফা বড় যুদ্ধ বাধাতে আগ্রহী ছিল।

ট্রাম্প যাতে নির্বাচনী প্রচারে কূটনৈতিক সাফল্য দেখাতে না পারেন, সে জন্যও ইরান কোনো সমঝোতার সুযোগ দেয়নি। তবে এ হিসাবের ঝুঁকিও রয়েছে। কারণ, এখন ইরানের মুখোমুখি এমন এক প্রেসিডেন্ট, যিনি প্রতিশোধ নিতে চাইতে পারেন।

উপসাগরীয় লবির উত্থান
ইসরায়েলপন্থি লবির প্রভাব কমার সঙ্গে সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর লবির প্রভাব বাড়ছে বলেই মনে হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল হলেও উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অংশীদার ও অবদানকারী হিসেবে তুলে ধরেছে। মার্কিন স্বার্থের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলটিতে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে কৌশলগত গভীরতা দিচ্ছে।

উপসাগরীয় দেশগুলো মার্কিন অর্থনীতিতে ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তাদের সার্বভৌম সম্পদ তহবিলও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করছে। এ ছাড়া গাজা থেকে ইরান—ইসরায়েলের তৈরি বিভিন্ন সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে ট্রাম্পকে বারবার কূটনৈতিক পথ দেখিয়েছে কাতার ও ওমান।

তারপরও যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মুখোমুখি অবস্থানে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে উপসাগরীয় দেশগুলো। ইরানের পাশাপাশি তারাই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছে এবং যুদ্ধের বোঝার বড় অংশ বহন করেছে।

উপসাগরীয় দেশগুলোর রাজধানীগুলোতে ট্রাম্প ও তার ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন (মাগা)’ আন্দোলন নিয়ে হতাশা স্পষ্ট। ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। উপসাগরীয় নেতারাও তার ‘আমেরিকাকে আবার মহান করার’ অঙ্গীকারে আস্থা রেখেছিলেন।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা পেয়েছেন ইসরায়েলপন্থি আরেক প্রেসিডেন্টকে, যাকে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিজের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে সহজেই ব্যবহার করেছেন।

এ কারণে রিয়াদ, দোহা ও আবুধাবি এখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবমুক্ত এক মধ্যপ্রাচ্যের সম্ভাবনা নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে। এমন ব্যবস্থায় এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি থাকবে ঠিকই, তবে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে তার অংশীদারত্ব বৃহত্তর বহুপক্ষীয় চুক্তির কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হবে।

মধ্যবর্তী নির্বাচন উপসাগরীয় নেতাদের ট্রাম্প-পরবর্তী যুক্তরাষ্ট্রের কথাও ভাবার সুযোগ করে দিয়েছে। তারা এমন একটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা করছেন, যা হবে বেশি পূর্বানুমানযোগ্য, কম খামখেয়ালি এবং আঞ্চলিক সংঘাত থেকে দূরে থাকতে আগ্রহী। শেষের বিষয়টিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে এখন এমন যুক্তরাষ্ট্র বেশি কাম্য, যারা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে জড়িয়ে পড়বে না। কারণ, বারবার জেতা অসম্ভব এমন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে প্রতিবারই অঞ্চলটিকে আরও খারাপ অবস্থায় ফেলে যাচ্ছে ওয়াশিংটন।

খোঁড়াতে থাকা ট্রাম্প
উপসাগরীয় দেশগুলো ইতোমধ্যে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ও স্বনির্ভরতার পথে এগিয়েছে। রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়া ট্রাম্প সেই প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত করবে। উপসাগরীয় সরকারগুলো ওয়াশিংটনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে ইউরোপসহ অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াবে।

তবে দীর্ঘস্থায়ী সমাধান নিহিত রয়েছে এ অঞ্চলের মধ্যেই। উপসাগরীয় দেশগুলো ও ইরানের মধ্যে আরও গভীর সহযোগিতা প্রয়োজন। এর ভিত্তি হতে পারে তাদের নিজেদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সম্পাদিত একটি অনাক্রমণ চুক্তি, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র থাকবে আলোচনার বাইরে।

এ উদ্যোগ সফল করতে দুটি শর্ত পূরণ করতে হবে। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রকে আবার যুদ্ধে জড়ানো থেকে বিরত রাখতে উপসাগরীয় দেশগুলোকে ওয়াশিংটনে নিজেদের প্রভাব একত্র করতে হবে এবং একটি অভিন্ন লক্ষ্য অর্জনে তা কাজে লাগাতে হবে।

যুদ্ধের আরেকটি দফা আগের চেয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য আরও ভয়াবহ হবে। এতে একমাত্র লাভবান হবে ইসরায়েল। ট্রাম্পের প্রস্তাব করা প্রতিটি সামরিক পদক্ষেপই উপসাগরীয় অঞ্চলের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে, সম্পদ ধ্বংস করবে এবং বিশ্ব অর্থনীতিকে দুর্বল করে দেবে।

দ্বিতীয়ত, এমন একটি কূটনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যা পরস্পরের প্রতি প্রায় শূন্য আস্থার দুটি পক্ষের কাছেই গ্রহণযোগ্য হবে। আবারও সেই কঠিন দায়িত্ব এসে পড়েছে কাতারের কাঁধে।

সময় খুব কম। ট্রাম্পের হারানোর তেমন কিছু নেই। রিপাবলিকান পার্টির প্রতিও তার কখনো খুব বেশি আগ্রহ ছিল না। শিগগির কোনো সমঝোতা না হলে নিজের অহং তৃপ্ত করতে সামরিক হামলার সম্ভাবনা বাড়বে, আর তা ঘটতে পারে আরও দ্রুত।

তবে আশার একটি জায়গা রয়েছে। ট্রাম্পের নির্বাচনী জয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে, এমন ছাড় ইরান আগে দেয়নি। এখন ভোটের ফল ঘোষণা হয়ে যাওয়ায় সেই বিবেচনার আর প্রয়োজন নেই। তেহরান এখন তুলনামূলক নমনীয় অবস্থান নিতে পারে এবং একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা এখনো সম্ভব।

মার্কিন ভোটাররা ওয়াশিংটনের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিয়েছেন। নতুন নির্বাচিত অনেক আইনপ্রণেতা মাগা আন্দোলনের মূল প্রতিশ্রুতির প্রতিধ্বনি করছেন—এমন একটি যুক্তরাষ্ট্র, যারা সরাসরি নেতৃত্ব না দিয়ে পেছন থেকে কাজ করবে এবং নিজেদের অঞ্চলের দায়িত্ব নিতে সক্ষম অংশীদারদের মাধ্যমে লক্ষ্য অর্জন করবে।

উপসাগরীয় লবিকেও সেই অনুযায়ী কৌশল বদলাতে হবে। কংগ্রেসের নতুন প্রজন্মের আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলাই এখন তাদের কাজ। এই আইনপ্রণেতারা অতীতের নব্য রক্ষণশীল রাজনীতিকদের চ্যালেঞ্জ করছেন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেদের হাতে নেওয়ার উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রস্তুতিকে সমর্থন করছেন।

লেখক ড. আন্দ্রেয়াস ক্রিগ লন্ডনের কিংস কলেজের ডিফেন্স স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। তিনি মধ্যপ্রাচ্যে সরকারি ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কৌশলগত ঝুঁকি পরামর্শক হিসেবেও কাজ করেন। সম্প্রতি তার ‘সোসিও-পলিটিক্যাল অর্ডার অ্যান্ড সিকিউরিটি ইন দ্য আরব ওয়ার্ল্ড’ বইটি প্রকাশিত হয়েছে।