7:04 pm, Thursday, 17 September 2026

র‌্যাগিংয়ের নামে উচ্ছশৃঙ্খলতা কাম্য নয়

আফতাব চৌধুরী:
আজকের দিনে ‘র‌্যাগিং’ শব্দটা ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে। যদিও সহজ ভাষায় এর প্রকৃত অর্থটা কী, সে সম্পর্কে কেউই মাথা ঘামানোর প্রয়োজনবোধ করেন না। তবুও কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে বিদ্যার্থীদের জীবনে ওই শব্দটার মর্মান্তিক কুপ্রভাব সম্পর্কে সকলেই চিন্তা ব্যক্ত করেন। আমরাও এ সম্পর্কে চিন্তামুক্ত নই। র‌্যাগিং মূলত ইংরেজি শব্দ। এটা পশ্চিমা বিদ্যার্থীদের একটা ঈঁষঃঁৎব, সংস্কার তথা ‘প্রথা’। ইংরেজরাই সাগরপার থেকে এটা বহন করে নিয়ে আসে আমাদের দেশে। দেশটা তখন আমাদের ছিল না, ছিল তাদের। ওরাই এ অঞ্চলে ছাত্রজীবনে কলেজস্তরে ‘র‌্যাগিং প্রথা’র প্রবর্তন করে। আমার এক সম্পর্কিত দাদুর মুখে শুনেছি, তিনি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মেডিক্যাল বিভাগে পড়াশোনা করতেন। তিনিও ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে অর্থাৎ নবাগত হিসাবে র‌্যাগিংয়ের শিকার হয়েছিলেন। প্রবীণরা নবীনদের নিয়ে বিচিত্র ধরনের হাস্য কৌতুকের অবতারণা করেছিলেন। তবে এর উদ্দেশ্য ছিল সৎ। উদ্দেশ্য ছিল অতি মধুর।
উল্লেখ্য, আমাদের সমাজজীবনে জন্ম, মৃত্যু ও বিবাহ-এই তিনটিকে সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা হিসাবে অভিহিত করা হয়। ‘বিবাহ’ নামক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মানুষ নতুন জীবনে প্রবেশ করে। কেবল জীবনসঙ্গী বা সঙ্গিনীটিই নতুন নয়, সবকিছুই যেন নতুনভাবে গড়ে নিতে হয়। জীবনটাকে পুনরায় নবপর্যায়ে নববিধানে পরিচয় করিয়ে নিতে হয়। বিবাহসূত্রে অচেনা মানুষজনের সঙ্গে চেনার পরিধি বাড়িয়ে নিতে হয়। সহজ কথায়, ওই সূত্রে মানুষের সঙ্গে আত্মীয়তার পরিধি, বন্ধুবান্ধব ও সখ্যর সীমানা প্রসারিত হয়। অর্থাৎ, আত্মীয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি হয়। আর এ সম্পর্ক আলাপচারিতার মাধ্যমেই গড়ে ওঠে। কিন্তু কে প্রথম কাছে আসবে? কে প্রথম ভালবাসবে? কে প্রথম কথা বলবে? তুমি, না আমি? অর্থাৎ অচেনা কনেপক্ষ, না অচেনা বরপক্ষ?
বিবাহবাসরে বর শ্বশুরবাড়ি প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গেই ও বাড়ির অপরিচিতরা তাকে সাদরে বরণ করে নেন। কনের বোন, বান্ধবীরা আগ বাড়িয়ে পরম ¯েœহে, পরম যতনে বরকে নিয়ে যান তাদের অন্দরমহলে। এটাকে আমরা প্রেম-প্রীতি-ভালবাসা নামক সৌন্দর্যের অন্দরমহল হিসাবেই অভিহিত করতে পারি। চলে নানা হাস্যকৌতুক। বরকে কেউ গান গেয়ে শোনাবার অনুরোধ করেন, কেউ বা আবার তার কাছে গল্প শুনতে চান! এভাবেই বাসর ঘর মাতিয়ে তোলেন তারা। ভাবি-দাদীরা বরকে বিভিন্ন রকমের উপাদেয় খাদ্য পরিবেশন করেন। এর মধ্যে থাকে নানা কৃত্রিম উপায়ে প্রস্তুত ভাজা-বড়াও। কাপড়ের টুকরো জড়ো করে পিটালি মাখিয়ে বড়া ভেজেও বরের পাতে দিয়ে দেওয়া হয়। বর নকল বড়া দাঁত দিয়ে ছিঁড়তে পারছেন না দেখে তারা হাসিতে ফেটে পড়েন। মূলত এগুলো তারা করেন নবাগত বরের আড়ষ্ট ভাবটি কাটিয়ে দেওয়ার জন্যই। তাকে সহজ করে, আপন করে নেওয়ার জন্যই। বৃদ্ধা দাদী শ্বশুড়িরা নতুন করে চুলে কলপ মেখে রাঙা টুকটুকে বেনারসী শাড়ি পরে কৃত্রিম রাঙা নববধু সেজে নাটকীয়ভাবে তরল অথচ মধুর পরিহাসের বাতাবরণ সৃষ্টি করেন। যেন যুগ যুগ ধরে এই অপরিচিত যুবকটির জন্যই তারা অপেক্ষা করে আসছেন। তারা গানও জুড়ে দেন-‘ও সাধের জামাই রে, তুই কেনে ভাতার হলি না!’
এবারে নববধূটির পালা। শ্বশুরগৃহে পদার্পণের সঙ্গে সঙ্গেই অপরিচিত নববধূকেও এ বাড়ির লোকেরাও ঠিক ওইভাবেই গ্রহণ করে নেন।এতে জা-দেবর-ননদি এবং দাদাশ্বশুড়িদের মুখ্য ভূমিকা থাকে। মূলত হাস্যকৌতুকের অবকাশ রচনা করে নববধূটিকে তারা আপন করে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এর উদ্দেশ্য হলো, বধূটি যেন সহজেই তার অপরিচিত বা আড়ষ্ট ভাব কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়। এজন্যই তারা কৃত্রিম কৌতুক অভিনয়ের মঞ্চ তথা ক্ষেত্র প্রস্তুত করার অবতারনা করেন। ইউরোপীয় সমাজপটে অনুরূপ সংস্কৃতির অবকাশ নেই। তবে উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মূলত তারা আমাদের এই সংস্কৃতিরই অবতারণা করে থাকে। বিষয়টির তাৎপর্য নিঃসন্দেহে খুবই প্রশংসনীয়। স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে দূর-দূরান্ত থেকে ছাত্রছাত্রীরা প্রবেশ করে কলেজে। কেউ কেউ আবার ছাত্রাবাসে এসেও বাসা বাধেন। শুরু হয় তাদের নতুন জীবন। আমাদের উলি­খিত নববধূরা যেমন করে ভীরু পদক্ষেপে অজানা অচেনা জগতে অর্থাৎ শ্বশুরগৃহে প্রবেশ করেন, এরাও ঠিক এমনি করেই অচেনা-অজানা কলেজ ও ছাত্রাবাসে তাদের নতুন জীবন শুরু করেন। এখানকার নতুন জগতকে তাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব সঙ্গত কারণেই উপরে বর্ণিত তথা সমাজমূলের প্রকৃত উত্তরাধিকারী প্রবীণ ছাত্রছাত্রীদের ওপরই বর্তায়। তাই প্রবীণ ছাত্রছাত্রীরা নবীনদের মনের ভীরুতা ও আড়ষ্ট ভাব কাটিয়ে দিতে নানা প্রকারের হাস্যকৌতুকের অবতারণা করেন। প্রবীণরা যদি আগ বাড়িয়ে পরিচয়পর্বের ডালি নিয়ে এগিয়ে না আসে তাহলে নবীনরা তাদের সঙ্গে মিলিত হবে কেমন করে? তাই সর্বাগ্রে বন্ধুত্বের হাত প্রসারিত করার, নবীনদের ডেকে ডেকে নানা প্রকারের হাস্যালাপের মাধ্যমে পরিচয়পর্বের সূত্রপাত করার দায়িত্ব পালন করেন প্রবীণ ছাত্রছাত্রীরাই। ইংরেজিতে এর নামকরণ করা হয়েছে ‘র‌্যাগিং’।
তবে ইংরেজ আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একদিন আমার দাদু যেভাবে র‌্যাগিঙের সুমধুর পরশ অনুভব করেছিলেন, কালের প্রবাহে ধীরে ধীরে আবর্তিত প্রজন্মের হাতে পড়ে র‌্যাগিং তার মাধুর্য এবং উদ্দেশ্য দু’টোই আজ পুরোমাত্রায় হারিয়ে ফেলেছে। বলা যায়, র‌্যাগিঙের আশীর্বাদ আজ অভিশাপরূপেই বর্ষিত হচ্ছে নবাগতদের ওপর। আজকাল মেডিক্যাল বিভাগের ছাত্রাবাসে নরকঙ্কাল দেখিয়ে র‌্যাগিং করা হয়। হঠাৎ করে নিশিরাতে কঙ্কাল দেখে নবাগত পড়–য়াদের অনেকেই ভয়ে মুর্ছা যান। আবার কখনও বা মরা সাপ-ব্যাঙ ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয় তাদের উপর। কেবল মেডিক্যাল কলেজগুলোতেই নয়, র‌্যাগিং হয় অন্য কলেজগুলোতেও। র‌্যাগিংয়ের নামে নবাগতদের শারীরিক নির্যাতন হয় বড়ই নির্মমভাবে। নবাগতদের জন্য এটা যেন এক বিরাট অভিশপ্ত তথা বিভীষিকাময় জগৎ। মেঝে একঘটি পানি ঢেলে দিয়ে নবীন পড়–য়াদের এর ওপর সাঁতার কাটার আদেশ দেওয়া হয়। ব্যাপারটা যে কত নির্মম, নৃশংস তথা মর্মান্তিক তা সহৃদয় ব্যক্তিমাত্রই উপলব্ধি করতে পারছেন।
আবার, বড়দের আদেশ অমান্য করার বিষময় ফল ভীষণ আকার ধারণ করে। এতে কোনও কোনও নবীন পড়–য়া তাদের মানসিক ভারসাম্যও হারিয়ে ফেলেন। এমনকী কারও কারও শখের কলেজ জীবন অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যায়। এরূপ জীবননাশী র‌্যাগিংয়ের দাপটে কেউ কেউ কলেজ জীবনে ইতি টেনে দিয়ে তল্পিতল্প গুটিয়ে বাড়িতে চলে আসতেও বাধ্য হয়। এসব খবর কে রাখে? বছর কয়েক আগে র‌্যাগিঙের ‘মাস্টার’রা ঢাকা কলেজের এক নবাগত ছাত্রকে রাতদুপুরে কেবলমাত্র অন্তর্বাস পরে ছাত্রাবাস থেকে পালিয়ে আসতে বাধ্য করেছিল। সেবার চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের এক ছাত্র নিদারুণ র‌্যাগিংয়ের দাপটে সেখানকার সমস্ত পাট চুকিয়ে সিলেট চলে আসতে বাধ্য হন। অবশ্য তার খুঁটির জোরে তিনি পুনরায় চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হতে সক্ষম হন।
কেবলমাত্র ছাত্রাবাসগুলোতেই যে র‌্যাগিং হয়, এমন নয়। এর বীভৎস থাবা নখ-দন্ত প্রসারিত করে আছড়ে পড়ে ক্লাসে ক্লাসে, প্রতিটি কমনরম। মেয়েরাও মেয়েদের র‌্যাগিং করেন বড়ই নিষ্ঠুরভাবে। তাদের হুকুম তালিম করতে কোনও প্রকারের গড়িমসি কিংবা কসুর করলে ওরা নবাগতদের গালে সজোরে চড়-থাপ্পড়ও কষিয়ে দেন! ব্যাপারটা এরকমই-আজকের নববধূরা বধূ নির্যাতনের ব্যাপারে যেমন করে দক্ষতার সঙ্গে আগামী দিনের শাশুড়ির ভূমিকা পালন করেন, নির্যাতিত নবীন পড়–য়ারাও পরবর্তীকালে ওই একই রূপ ধারণ করেন। আবার সকলেই যে সমানভাবে র‌্যাগিঙের শিকার হন, এমন কথাও সত্যি নয়। এ ব্যাপারে হতভাগা-হতভাগিনী মফঃস্বলের পড়–য়ারাই অধিক নির্যাতন ভোগ করেন। শহরে থাকা চেনাজানাদের প্রায়ই লঘু দন্ড দিয়েই ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে যদি কারও প্রতি ব্যক্তিগত শত্রæতা থাকে, তাহলে তো কথাই নেই। এই সুযোগে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করে নেওয়া হয়।
মোট কথা, বর্তমানকালে ‘রাগিং’ তার উদ্দেশ্য হারিয়ে ফেলে অর্থাৎ রচনাত্মক ভূমিকা ছেড়ে ধ্বংসাত্মক ভূমিকায়ই অবতীর্ণ হয়ে গিয়েছে। এর গতি-প্রকৃতি মোটেই সুস্থ মানসিকার পরিচায়ক নয়। মানবসভ্যতার মূলে এটা কুঠারাঘাত করছে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রভূত উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে আজ মানুষ সেখানে শূন্যে, মহাশূন্যে মানবসভ্যতার রেশ ছড়িয়ে দিতে ব্রত ধারণ করেছে, সভ্যতার নতুন ইতিহাস রচনা করে চলেছে, সেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এরূপ মানবতাবিরোধী নৃশংস কার্যকলাপ মানবসভ্যতা ধ্বংসের নামান্তর ছাড়া আর কী হতে পারে? আমাদের মা বাবারা বড় শখ করে ছেলেমেয়েদের কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য পাঠিয়ে থাকেন। কিন্তু র‌্যাগিংয়ের নামে এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যে সব আচরণ করা হয়ে থাকে তা অমানবিক। এই লজ্জাজনক ‘‘র‌্যাগিং’’ প্রথা বন্ধ করার জন্য কয়েক বছর পূর্বেই আমাদের দেশে আইন প্রণয়ন করা হয়েছে কিন্তু প্রশাসনিক শিথিলতায় সে আইন আজও পড়–য়াদের কোনোও উপকারে আসেনি। তাই আর সরকারের মুখাপেক্ষী না থেকে র‌্যাগিংয়ের নির্মূলে খোদ ছাত্রসমাজকেই অগ্রণীর ভূমিকা নিতে হবে। তবেই কাজের কাজ হবে। এজন্য পড়–য়াদের মানসিকতার আমূল পরিবর্তন করতে হবে। নতুবা মানবসভ্যতার ইতিহাসে এটা অতি কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসাবেই চিরকাল বিরাজ করবে।
সাংবাদিক-কলামিস্ট।

Tag :
About Author Information

Sirajul Islam

ভেজালমুক্ত পণ্য নিশ্চিত করতে শক্তিশালী হচ্ছে ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর

র‌্যাগিংয়ের নামে উচ্ছশৃঙ্খলতা কাম্য নয়

Update Time : 11:12:20 am, Sunday, 5 March 2023

আফতাব চৌধুরী:
আজকের দিনে ‘র‌্যাগিং’ শব্দটা ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে। যদিও সহজ ভাষায় এর প্রকৃত অর্থটা কী, সে সম্পর্কে কেউই মাথা ঘামানোর প্রয়োজনবোধ করেন না। তবুও কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে বিদ্যার্থীদের জীবনে ওই শব্দটার মর্মান্তিক কুপ্রভাব সম্পর্কে সকলেই চিন্তা ব্যক্ত করেন। আমরাও এ সম্পর্কে চিন্তামুক্ত নই। র‌্যাগিং মূলত ইংরেজি শব্দ। এটা পশ্চিমা বিদ্যার্থীদের একটা ঈঁষঃঁৎব, সংস্কার তথা ‘প্রথা’। ইংরেজরাই সাগরপার থেকে এটা বহন করে নিয়ে আসে আমাদের দেশে। দেশটা তখন আমাদের ছিল না, ছিল তাদের। ওরাই এ অঞ্চলে ছাত্রজীবনে কলেজস্তরে ‘র‌্যাগিং প্রথা’র প্রবর্তন করে। আমার এক সম্পর্কিত দাদুর মুখে শুনেছি, তিনি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মেডিক্যাল বিভাগে পড়াশোনা করতেন। তিনিও ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে অর্থাৎ নবাগত হিসাবে র‌্যাগিংয়ের শিকার হয়েছিলেন। প্রবীণরা নবীনদের নিয়ে বিচিত্র ধরনের হাস্য কৌতুকের অবতারণা করেছিলেন। তবে এর উদ্দেশ্য ছিল সৎ। উদ্দেশ্য ছিল অতি মধুর।
উল্লেখ্য, আমাদের সমাজজীবনে জন্ম, মৃত্যু ও বিবাহ-এই তিনটিকে সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা হিসাবে অভিহিত করা হয়। ‘বিবাহ’ নামক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মানুষ নতুন জীবনে প্রবেশ করে। কেবল জীবনসঙ্গী বা সঙ্গিনীটিই নতুন নয়, সবকিছুই যেন নতুনভাবে গড়ে নিতে হয়। জীবনটাকে পুনরায় নবপর্যায়ে নববিধানে পরিচয় করিয়ে নিতে হয়। বিবাহসূত্রে অচেনা মানুষজনের সঙ্গে চেনার পরিধি বাড়িয়ে নিতে হয়। সহজ কথায়, ওই সূত্রে মানুষের সঙ্গে আত্মীয়তার পরিধি, বন্ধুবান্ধব ও সখ্যর সীমানা প্রসারিত হয়। অর্থাৎ, আত্মীয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি হয়। আর এ সম্পর্ক আলাপচারিতার মাধ্যমেই গড়ে ওঠে। কিন্তু কে প্রথম কাছে আসবে? কে প্রথম ভালবাসবে? কে প্রথম কথা বলবে? তুমি, না আমি? অর্থাৎ অচেনা কনেপক্ষ, না অচেনা বরপক্ষ?
বিবাহবাসরে বর শ্বশুরবাড়ি প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গেই ও বাড়ির অপরিচিতরা তাকে সাদরে বরণ করে নেন। কনের বোন, বান্ধবীরা আগ বাড়িয়ে পরম ¯েœহে, পরম যতনে বরকে নিয়ে যান তাদের অন্দরমহলে। এটাকে আমরা প্রেম-প্রীতি-ভালবাসা নামক সৌন্দর্যের অন্দরমহল হিসাবেই অভিহিত করতে পারি। চলে নানা হাস্যকৌতুক। বরকে কেউ গান গেয়ে শোনাবার অনুরোধ করেন, কেউ বা আবার তার কাছে গল্প শুনতে চান! এভাবেই বাসর ঘর মাতিয়ে তোলেন তারা। ভাবি-দাদীরা বরকে বিভিন্ন রকমের উপাদেয় খাদ্য পরিবেশন করেন। এর মধ্যে থাকে নানা কৃত্রিম উপায়ে প্রস্তুত ভাজা-বড়াও। কাপড়ের টুকরো জড়ো করে পিটালি মাখিয়ে বড়া ভেজেও বরের পাতে দিয়ে দেওয়া হয়। বর নকল বড়া দাঁত দিয়ে ছিঁড়তে পারছেন না দেখে তারা হাসিতে ফেটে পড়েন। মূলত এগুলো তারা করেন নবাগত বরের আড়ষ্ট ভাবটি কাটিয়ে দেওয়ার জন্যই। তাকে সহজ করে, আপন করে নেওয়ার জন্যই। বৃদ্ধা দাদী শ্বশুড়িরা নতুন করে চুলে কলপ মেখে রাঙা টুকটুকে বেনারসী শাড়ি পরে কৃত্রিম রাঙা নববধু সেজে নাটকীয়ভাবে তরল অথচ মধুর পরিহাসের বাতাবরণ সৃষ্টি করেন। যেন যুগ যুগ ধরে এই অপরিচিত যুবকটির জন্যই তারা অপেক্ষা করে আসছেন। তারা গানও জুড়ে দেন-‘ও সাধের জামাই রে, তুই কেনে ভাতার হলি না!’
এবারে নববধূটির পালা। শ্বশুরগৃহে পদার্পণের সঙ্গে সঙ্গেই অপরিচিত নববধূকেও এ বাড়ির লোকেরাও ঠিক ওইভাবেই গ্রহণ করে নেন।এতে জা-দেবর-ননদি এবং দাদাশ্বশুড়িদের মুখ্য ভূমিকা থাকে। মূলত হাস্যকৌতুকের অবকাশ রচনা করে নববধূটিকে তারা আপন করে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এর উদ্দেশ্য হলো, বধূটি যেন সহজেই তার অপরিচিত বা আড়ষ্ট ভাব কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়। এজন্যই তারা কৃত্রিম কৌতুক অভিনয়ের মঞ্চ তথা ক্ষেত্র প্রস্তুত করার অবতারনা করেন। ইউরোপীয় সমাজপটে অনুরূপ সংস্কৃতির অবকাশ নেই। তবে উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মূলত তারা আমাদের এই সংস্কৃতিরই অবতারণা করে থাকে। বিষয়টির তাৎপর্য নিঃসন্দেহে খুবই প্রশংসনীয়। স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে দূর-দূরান্ত থেকে ছাত্রছাত্রীরা প্রবেশ করে কলেজে। কেউ কেউ আবার ছাত্রাবাসে এসেও বাসা বাধেন। শুরু হয় তাদের নতুন জীবন। আমাদের উলি­খিত নববধূরা যেমন করে ভীরু পদক্ষেপে অজানা অচেনা জগতে অর্থাৎ শ্বশুরগৃহে প্রবেশ করেন, এরাও ঠিক এমনি করেই অচেনা-অজানা কলেজ ও ছাত্রাবাসে তাদের নতুন জীবন শুরু করেন। এখানকার নতুন জগতকে তাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব সঙ্গত কারণেই উপরে বর্ণিত তথা সমাজমূলের প্রকৃত উত্তরাধিকারী প্রবীণ ছাত্রছাত্রীদের ওপরই বর্তায়। তাই প্রবীণ ছাত্রছাত্রীরা নবীনদের মনের ভীরুতা ও আড়ষ্ট ভাব কাটিয়ে দিতে নানা প্রকারের হাস্যকৌতুকের অবতারণা করেন। প্রবীণরা যদি আগ বাড়িয়ে পরিচয়পর্বের ডালি নিয়ে এগিয়ে না আসে তাহলে নবীনরা তাদের সঙ্গে মিলিত হবে কেমন করে? তাই সর্বাগ্রে বন্ধুত্বের হাত প্রসারিত করার, নবীনদের ডেকে ডেকে নানা প্রকারের হাস্যালাপের মাধ্যমে পরিচয়পর্বের সূত্রপাত করার দায়িত্ব পালন করেন প্রবীণ ছাত্রছাত্রীরাই। ইংরেজিতে এর নামকরণ করা হয়েছে ‘র‌্যাগিং’।
তবে ইংরেজ আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একদিন আমার দাদু যেভাবে র‌্যাগিঙের সুমধুর পরশ অনুভব করেছিলেন, কালের প্রবাহে ধীরে ধীরে আবর্তিত প্রজন্মের হাতে পড়ে র‌্যাগিং তার মাধুর্য এবং উদ্দেশ্য দু’টোই আজ পুরোমাত্রায় হারিয়ে ফেলেছে। বলা যায়, র‌্যাগিঙের আশীর্বাদ আজ অভিশাপরূপেই বর্ষিত হচ্ছে নবাগতদের ওপর। আজকাল মেডিক্যাল বিভাগের ছাত্রাবাসে নরকঙ্কাল দেখিয়ে র‌্যাগিং করা হয়। হঠাৎ করে নিশিরাতে কঙ্কাল দেখে নবাগত পড়–য়াদের অনেকেই ভয়ে মুর্ছা যান। আবার কখনও বা মরা সাপ-ব্যাঙ ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয় তাদের উপর। কেবল মেডিক্যাল কলেজগুলোতেই নয়, র‌্যাগিং হয় অন্য কলেজগুলোতেও। র‌্যাগিংয়ের নামে নবাগতদের শারীরিক নির্যাতন হয় বড়ই নির্মমভাবে। নবাগতদের জন্য এটা যেন এক বিরাট অভিশপ্ত তথা বিভীষিকাময় জগৎ। মেঝে একঘটি পানি ঢেলে দিয়ে নবীন পড়–য়াদের এর ওপর সাঁতার কাটার আদেশ দেওয়া হয়। ব্যাপারটা যে কত নির্মম, নৃশংস তথা মর্মান্তিক তা সহৃদয় ব্যক্তিমাত্রই উপলব্ধি করতে পারছেন।
আবার, বড়দের আদেশ অমান্য করার বিষময় ফল ভীষণ আকার ধারণ করে। এতে কোনও কোনও নবীন পড়–য়া তাদের মানসিক ভারসাম্যও হারিয়ে ফেলেন। এমনকী কারও কারও শখের কলেজ জীবন অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যায়। এরূপ জীবননাশী র‌্যাগিংয়ের দাপটে কেউ কেউ কলেজ জীবনে ইতি টেনে দিয়ে তল্পিতল্প গুটিয়ে বাড়িতে চলে আসতেও বাধ্য হয়। এসব খবর কে রাখে? বছর কয়েক আগে র‌্যাগিঙের ‘মাস্টার’রা ঢাকা কলেজের এক নবাগত ছাত্রকে রাতদুপুরে কেবলমাত্র অন্তর্বাস পরে ছাত্রাবাস থেকে পালিয়ে আসতে বাধ্য করেছিল। সেবার চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের এক ছাত্র নিদারুণ র‌্যাগিংয়ের দাপটে সেখানকার সমস্ত পাট চুকিয়ে সিলেট চলে আসতে বাধ্য হন। অবশ্য তার খুঁটির জোরে তিনি পুনরায় চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হতে সক্ষম হন।
কেবলমাত্র ছাত্রাবাসগুলোতেই যে র‌্যাগিং হয়, এমন নয়। এর বীভৎস থাবা নখ-দন্ত প্রসারিত করে আছড়ে পড়ে ক্লাসে ক্লাসে, প্রতিটি কমনরম। মেয়েরাও মেয়েদের র‌্যাগিং করেন বড়ই নিষ্ঠুরভাবে। তাদের হুকুম তালিম করতে কোনও প্রকারের গড়িমসি কিংবা কসুর করলে ওরা নবাগতদের গালে সজোরে চড়-থাপ্পড়ও কষিয়ে দেন! ব্যাপারটা এরকমই-আজকের নববধূরা বধূ নির্যাতনের ব্যাপারে যেমন করে দক্ষতার সঙ্গে আগামী দিনের শাশুড়ির ভূমিকা পালন করেন, নির্যাতিত নবীন পড়–য়ারাও পরবর্তীকালে ওই একই রূপ ধারণ করেন। আবার সকলেই যে সমানভাবে র‌্যাগিঙের শিকার হন, এমন কথাও সত্যি নয়। এ ব্যাপারে হতভাগা-হতভাগিনী মফঃস্বলের পড়–য়ারাই অধিক নির্যাতন ভোগ করেন। শহরে থাকা চেনাজানাদের প্রায়ই লঘু দন্ড দিয়েই ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে যদি কারও প্রতি ব্যক্তিগত শত্রæতা থাকে, তাহলে তো কথাই নেই। এই সুযোগে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করে নেওয়া হয়।
মোট কথা, বর্তমানকালে ‘রাগিং’ তার উদ্দেশ্য হারিয়ে ফেলে অর্থাৎ রচনাত্মক ভূমিকা ছেড়ে ধ্বংসাত্মক ভূমিকায়ই অবতীর্ণ হয়ে গিয়েছে। এর গতি-প্রকৃতি মোটেই সুস্থ মানসিকার পরিচায়ক নয়। মানবসভ্যতার মূলে এটা কুঠারাঘাত করছে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রভূত উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে আজ মানুষ সেখানে শূন্যে, মহাশূন্যে মানবসভ্যতার রেশ ছড়িয়ে দিতে ব্রত ধারণ করেছে, সভ্যতার নতুন ইতিহাস রচনা করে চলেছে, সেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এরূপ মানবতাবিরোধী নৃশংস কার্যকলাপ মানবসভ্যতা ধ্বংসের নামান্তর ছাড়া আর কী হতে পারে? আমাদের মা বাবারা বড় শখ করে ছেলেমেয়েদের কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য পাঠিয়ে থাকেন। কিন্তু র‌্যাগিংয়ের নামে এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যে সব আচরণ করা হয়ে থাকে তা অমানবিক। এই লজ্জাজনক ‘‘র‌্যাগিং’’ প্রথা বন্ধ করার জন্য কয়েক বছর পূর্বেই আমাদের দেশে আইন প্রণয়ন করা হয়েছে কিন্তু প্রশাসনিক শিথিলতায় সে আইন আজও পড়–য়াদের কোনোও উপকারে আসেনি। তাই আর সরকারের মুখাপেক্ষী না থেকে র‌্যাগিংয়ের নির্মূলে খোদ ছাত্রসমাজকেই অগ্রণীর ভূমিকা নিতে হবে। তবেই কাজের কাজ হবে। এজন্য পড়–য়াদের মানসিকতার আমূল পরিবর্তন করতে হবে। নতুবা মানবসভ্যতার ইতিহাসে এটা অতি কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসাবেই চিরকাল বিরাজ করবে।
সাংবাদিক-কলামিস্ট।