1. [email protected] : Admin : sk Sirajul Islam siraj siraj
  2. [email protected] : admi2017 :
  3. [email protected] : Sk Sirajul Islam Siraj : Sk Sirajul Islam Siraj
ব্রেকিং নিউজ :
বিনোদন :: গান গাইতে গাইতে মঞ্চেই গায়কের মর্মান্তিক মৃত্যু!,  খেলার খবর : অনূর্ধ্ব-১৯ এশিয়া কাপ চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ, বিমানবন্দরে যুবাদের জানানো হবে উষ্ণ অভ্যর্থনা,

দেশি মাছ কাকিলাকে যেভাবে রক্ষা করার চেষ্টা করছেন বিজ্ঞানীরা

  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২১
  • ৮৪৯ বার পঠিত

ডেস্ক রিপোর্ট :: বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে বেশ কিছু ছোট মাছের প্রজাতি বিপন্ন হয়ে পড়লেও এসব মাছের মোট উৎপাদন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। আর এটা সম্ভব হয়েছে মৎস্য বিজ্ঞানীদের গবেষণায় ধারাবাহিক সাফল্যের কারণে।

কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউটের বিজ্ঞানীরা উন্মুক্ত জলাশয়ের এ রকম ৩১টি মাছকে বিলুপ্ত হওয়ার বিপদ থেকে রক্ষা করছেন। শুধু তাই নয়, এর ফলে পুষ্টিসমৃদ্ধ এসব মাছ এখন সহজে পুকুরেও চাষ করা সম্ভব হচ্ছে।

বাংলাদেশে স্বাদু পানিতে ২৬০ প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়। তার মধ্যে ১৪৩টি মাছই ছোট মাছ। যেসব মাছ আকারে নয় সেন্টিমিটারের ছোট সেগুলোকে ছোট মাছ বা স্মল ইন্ডিজেনাস স্পেসিস কিংবা এসআইএস হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

পরিবেশ সংরক্ষণে কাজ করে যে আন্তর্জাতিক সংগঠন আইইউসিএন, তারা বাংলাদেশের ৬৪টি প্রজাতির মাছকে ইতোমধ্যে বিপন্ন বলে উল্লেখ করেছে। এসব মাছের মধ্যে রয়েছে মহাশোল, খরকি, পিপলা শোল, কালা পাবদা, বাঘ মাছ ইত্যাদি।

এ কারণে সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে অস্তিত্বের হুমকির মধ্যে পড়া এসব মাছের বেশ কয়েকটিকে রক্ষার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

মৎস্য বিজ্ঞানীরা কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে গত কয়েক বছরে ৩০টি মাছকে বিলুপ্ত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করেছে। এসব মাছের মধ্যে রয়েছে শিং, মাগুর, পুঁটি, বাইম, টেংরা, ফলি, বাতাসি, ঢেলা, বৈরালি, গুতুম, খলিসা ইত্যাদি।

মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউটের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে গত এক দশকে ছোট মাছের উৎপাদন চারগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০০৯ সালে এই মাছের উৎপাদনের পরিমাণ যেখানে ছিল ৬৭,০০০ টন, সেখানে ২০১৮ সালের উৎপাদন ছিল প্রায় আড়াই লাখ টন।

এ সব ছোট মাছের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে চাষ করা ৩০টি মাছ। এরই ধারাবাহিকতায় বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি আরো একটি মাছের কৃত্রিম প্রজনন করতে সক্ষম হয়েছেন। ৩১তম এই মাছটির নাম কাকিলা। কোথাও কোথাও এটি কাইক্কা এবং কাখলে মাছ নামেও পরিচিত।

শ্রীলঙ্কা, ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমার, মালয়েশিয়া এবং থাইল্যান্ডেও এই মাছটি পাওয়া যায় কিন্তু এর রঙ ও আকারে কিছু তারতম্য রয়েছে।

সবশেষ যোগ হলো কাকিলা
কাকিলা মাছের দেহ সরু ও লম্বাটে। অনেকটা সিলিন্ডারের মতো। মুখের সামনে ধারালো দাঁতযুক্ত লম্বা ঠোঁট। দেখতে অনেকটা কুমিরের মতো।

নদ-নদী, হাওর-বাঁওড়, খাল ও বিলের মতো অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে এক সময়ে এই কাকিলা মাছ প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যেত। বাজারেও উঠতো এই মাছ। ফলে সাধারণ মানুষ এটা খেতে পারতো।

কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনসহ মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কারণে এই মাছের বসবাসের পরিবেশ হুমকির মুখে পড়েছে। কীটনাশক ব্যবহারের কারণে এর প্রজনন ও বিচরণ ক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জলাশয় ভরাট করায় বাধাগ্রস্ত হয়েছে এসব মাছের অবাধ চলাচল।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. রবিউল আউয়াল হোসেন বলেন, “আগে এই মাছটা প্রচুর পাওয়া যেত। কিন্তু এখন কিছু কিছু অঞ্চল ছাড়া আর কোথাও তেমন একটা পাওয়া যায় না। এরই প্রেক্ষিতে সরকার এই মাছটিকে রক্ষার উদ্যোগ নেয়।”

যশোরের স্বাদু পানি উপকেন্দ্রে প্রায় তিন বছর ধরে নিবিড় গবেষণার পর বিজ্ঞানীরা এবছরের অগাস্ট মাসে এর কৃত্রিম প্রজনন ঘটাতে সক্ষম হয়েছেন।

কীভাবে বাঁচানো হচ্ছে
কাকিলা মাছটিকে উন্মুক্ত জলাশয় থেকে ধরে প্রথমে সেটিকে পুকুরের মতো বদ্ধ জলাশয়ে নিয়ে আসা হয়েছে। মাছটিকে ধরা ও পরিবহনের সময় সতর্কতা অবলম্বন করতে হয় যাতে এর কোনো ধরনের ক্ষতি না হয়।

বিজ্ঞানী মো. রবিউল আউয়াল বলেন, “কাকিলা মাছ অত্যন্ত স্পর্শকাতর। এটিকে পানিতে রেখে, পানির ট্যাঙ্কে কৃত্রিমভাবে অক্সিজেনের প্রবাহ দিয়ে, গাড়িতে করে খুব সাবধানে নিয়ে আসা হয়েছে। পরে এটি পুকুরের পানিতে ছেড়ে দিয়ে কন্ডিশনিং করা হয়েছে।”

তিনি জানান, প্রথমে পুকুরে মাছটির জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা হয়: মাছটি স্রোত পছন্দ করে কিনা, জলজ উদ্ভিদের মধ্যে থাকতে ভালোবাসে কিনা- এসব বিষয় মাথায় রেখে মোটামুটি একটা পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়।

এভাবে এটিকে এক-দুই বছর ধরে নতুন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করা হয়। অভ্যস্ত করা হয় নতুন পরিবেশে।

এ সময় মাছটির আচার আচরণ ও খাদ্যাভ্যাসের ওপর নজর রাখা হয়। হ্যাচারিতে উৎপাদিত কার্প জাতীয় মাছের জীবিত পোনা এবং জলাশয় থেকে সংগৃহীত জীবিত ছোট মাছ খাইয়ে পুকুরের বদ্ধ পরিবেশে তাকে অভ্যস্ত করা হয়।

“পুকুরে জাল টেনে ধরার পর মাছটিকে আবার পানিতে ছেড়ে দেওয়া হয়। একসময় জালের উপরে এসব মাছ মরে যেত। কিন্তু একটা সময় দেখা গেল এটি মাছের গা-সওয়া হয়ে গেছে। অর্থাৎ নতুন পরিবেশে তারা অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে,” বলেন মো. রবিউল।

এর পরে এই মাছের প্রজননের ব্যবস্থা করা হয়।

প্রজনন করা হয় যেভাবে
কাকিলা মাছ সাধারণত প্রাকৃতিকভাবে প্রবহমান জলাশয়ে, বিশেষ করে নদীতে এবং বর্ষাকালে প্লাবিত এলাকায় প্রজনন করে থাকে। পরিণত মাছেরা ভাসমান জলজ উদ্ভিদ নেই এমন স্থানে বসবাস করলেও জলজ উদ্ভিদের পাতার নিচে ও ভাসমান শেকড়ে স্ত্রী মাছ ডিম পাড়ে।

বিজ্ঞানীরা দেখলেন জুলাই, অগাস্ট মাসে কাকিলা মাছের ডিমের পরিপক্বতা সবচেয়ে ভাল থাকে। এ জন্য তারা এই সময়কালকেই বেছে নেন মাছটির প্রজননের জন্য।

মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউটের বিজ্ঞানী মো. শরীফুল ইসলাম বলেন, “এপ্রিল মাস থেকেই আমরা প্রজননের বিষয়ে পরীক্ষা চালাতে শুরু করি। প্রথমে এর দৈহিক বৈশিষ্ট্যের ওপর গবেষণা চালানো হয়। যখন দেখা যায় যে মাছটি প্রজননের জন্য তৈরি তখন বিভিন্ন ডোজে বিভিন্ন ধরনের হরমোন প্রয়োগ করা হয়।”

এভাবে বেশ কিছু পরীক্ষা চালানোর পর এক পর্যায়ে দেখা গেল যে নির্দিষ্ট একটি ডোজে মাছটি উত্তেজিত হয়ে পড়ছে। এসময় মা মাছটি ডিম পাড়ে এবং পুরুষ মাছটিও সেখানে তার শুক্রাণু ছেড়ে দেয়। তখন সেখানে ডিম নিষিক্ত হয়। তখনই বিজ্ঞানীরা ধরে নেন যে হরমোনের ডোজ প্রজননের জন্য উপযোগী হয়েছে।

এর পর চৌবাচ্চার ভেতরে ঝর্ণার ধারা তৈরি করে সেখান চার জোড়া মাছ ছেড়ে দেওয়া হয়। এই মাছটি সাধারণত কচুরিপানার মতো জলজ উদ্ভিদের গায়ে ডিম পাড়ে। একারণে চৌবাচ্চার ভেতরে সেরকম একটি পরিবেশ তৈরি করা হয়।

দেখা গেছে হরমোন ইনজেকশন দেওয়ার প্রায় ৪০ ঘণ্টা পরে মা কাকিলা মাছটি ডিম ছাড়ে এবং এর পর বাবা মাছটি সেখানে তার স্পার্ম ছেড়ে দেয়। সেই ডিম যাতে কোনো ধরনের দূষণের কারণে নষ্ট হয়ে না যায়, অথবা বড় মাছ এগুলোকে খেয়ে না ফেলে, সেজন্য ডিমগুলোকে রাখা হয় ইনটেনসিভ কেয়ারে।

“কাকিলা মাছের ডিম আঠালো হয়। সেগুলো কচুরিপানার গায়ে শক্ত হয়ে লেগে থাকে। দেখা যায় যে বাবা কিম্বা মা মাছ এসব ডিম খাচ্ছে না। বরং যেখানে বেশি ডিম সেখানে তারা পাহারা দিচ্ছে। বোঝা গেল যে তাদের প্যারেন্টাল কেয়ার অত্যন্ত শক্তিশালী,” বলেন শরীফুল ইসলাম।

অবশেষে ২৫ অগাস্ট রাত ৪টার সময় ডিম থেকে মাছের পোনা বের হয়।

এই মাছের বিষয়ে বিজ্ঞানীদের এখনো পূর্ণাঙ্গ ধারণা নেই। কারণ এর আগে কখনো কাকিলা মাছ নিয়ে কখনো গবেষণা হয়নি। ফলে মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউটের বিজ্ঞানীদেরকেই এই প্রথমবারের মতো একাজ করতে হচ্ছে।

প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. রবিউল আউয়াল হোসেন জানান তাদের বর্তমান এই গবেষণা থেকে পাওয়া ধারণা নিয়েই তারা ধাপে ধাপে আরো সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন।

কাকিলার পুষ্টিগুণ
কাকিলা মাছ খেতে যেমন খুব সুস্বাদু, তেমনি অনুপুষ্টিসমৃদ্ধ। এই মাছে আছে বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন, প্রোটিন, লিপিড, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, আয়রন, আয়োডিন ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ কিছু খনিজ পদার্থ।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, অন্যান্য ছোট মাছের তুলনায় কাকিলা মাছে এসব উপাদান বেশি থাকে।

শরীফুল ইসলাম বলেন, “সাধারণ মানুষের বিশেষ করে শিশুদের স্বাস্থ্যের জন্য এসব খনিজ পদার্থ খুবই উপকারী। যারা অ্যানিমিয়া বা রক্তস্বল্পতায় ভুগছে তাদের জন্য এবং দেহের রক্ত প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য এসব খনিজ পদার্থ অত্যন্ত প্রয়োজনী।”

 

প্লিজ আপনি ও অপরকে নিউজটি শেয়ার করার জন্য অনুরোধ করছি

এ জাতীয় আরো খবর..