ডেস্ক রিপোর্ট : ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬ এখনো শুরু হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশে, বিশেষ করে বাঙালি ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে উৎসবের আমেজ ইতোমধ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে।
চায়ের আড্ডা থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম- সবখানেই চলছে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, পর্তুগাল কিংবা ফ্রান্সকে নিয়ে তর্ক-বিতর্ক ও সমর্থনের প্রকাশ।
তবে এবারের উন্মাদনায় যুক্ত হয়েছে নতুন এক মাত্রা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে নিজের প্রিয় দলের রঙে নিজেকে সাজিয়ে ছবি তৈরি করা।
কয়েকটি নির্দেশনা বা ‘প্রম্পট’ লিখলেই এআই এমন ছবি বানিয়ে দিচ্ছে, যেখানে কেউ আর্জেন্টিনার পতাকার নকশায় শাড়ি পরে আছেন, কেউ ব্রাজিলের সবুজ-হলুদ রঙের ঐতিহ্যবাহী পোশাকে, আবার কেউ নিজের শহরের কোনো পরিচিত স্থানে দাঁড়িয়ে বিশ্বকাপের আবহ তৈরি করেছেন।
এটি শুধু বিনোদন নয়, বরং ব্যক্তিগত পরিচয়, সৃজনশীলতা ও প্রযুক্তির এক নতুন সংযোগ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
গণমাধ্যমকর্মী শাকিলা জেসমিন আর্জেন্টিনা আবারও ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে ওঠার আনন্দ উদযাপন করেছেন এক ভিন্ন উপায়ে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি করা একটি ছবিতে তাকে আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা রঙ ও পতাকার আদলে নকশা করা শাড়ি পরে দেখা যায়।
ছবিটি নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে পোস্ট করে তিনি ক্যাপশনে লেখেন, “আর্জেন্টিনা আবারও ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষে! এই খুশিতে AI আমাকে শাড়ি পরিয়ে দিলো। কী, বাকিরা কি রাগ করলা??”।
পোস্টটি প্রকাশের পর সহকর্মী ও বন্ধুদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া পড়ে। অনেকে হাস্যরসাত্মক মন্তব্যে অংশ নেন, আবার কেউ নিজেদের প্রিয় দলের রঙে এআই দিয়ে ছবি তৈরির অভিজ্ঞতাও শেয়ার করেন। বিশ্বকাপকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এআই-নির্ভর সৃজনশীল কনটেন্ট তৈরির যে নতুন প্রবণতা তৈরি হয়েছে, শাকিলা জেসমিনের এই পোস্ট তারই একটি উদাহরণ হিসেবে আলোচনায় এসেছে।
তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন ছবি দেখে নিজেরও ইচ্ছা হয়েছিল। বাস্তবে এমন পোশাক তৈরি করা কঠিন হলেও এআই কয়েক মিনিটেই সেই কল্পনাকে ছবিতে রূপ দিয়েছে। বন্ধুদের সঙ্গে ছবিগুলো ভাগ করে নেওয়ার পর ব্যাপক সাড়া পান তিনি।
মা-ছেলের ভালোবাসায় এআই
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে নিজের ফুটবলপ্রেম ও মাতৃত্বের ভালোবাসাকে এক ফ্রেমে তুলে ধরেছেন সানজিদা ইসলাম মারিয়া।
কট্টর আর্জেন্টিনা সমর্থক মারিয়ার একমাত্র সন্তান ২৩ মাস বয়সী রিজভান চৌধুরী। বাস্তবে এত ছোট শিশুর জন্য বিশেষ নকশার বিশ্বকাপ-থিমের পোশাক তৈরি করা সহজ নয়। তাই এআই-এর সাহায্যে তিনি এমন কিছু ছবি তৈরি করেছেন, যেখানে ছোট্ট রিজভানকে আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা জার্সিতে দেখা যায়। ছবিগুলোতে শিশুটির হাসিমাখা মুখ আর আর্জেন্টিনার রঙ যেন ফুটবলপ্রেমী মায়ের আবেগকেই প্রকাশ করেছে।
শুধু প্রিয় দলের জার্সিতেই থেমে থাকেননি তিনি। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলকে ঘিরে সমর্থকদের চিরচেনা খুনসুটি ও মজার সংস্কৃতিকেও ছবিতে স্থান দিয়েছেন। এআই-নির্মিত একটি ছবিতে রিজভানকে এমন ভঙ্গিতে দেখানো হয়েছে, যেন সে নাকে হাত দিয়ে ব্রাজিলকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। আরেকটি ছবিতে তার জার্সির নকশাতেও সেই মজার বার্তা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল সমর্থকদের পরিচিত ঠাট্টার অংশ।
মারিয়া বাংলানিউজকে বলেন, এটি কারও প্রতি বিদ্বেষ নয়; বরং ফুটবলকে ঘিরে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও আনন্দের বহিঃপ্রকাশ। তিনি বলেন, বিশ্বকাপ এলেই আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল সমর্থকদের মধ্যে মজার খুনসুটি চলে। এআই দিয়ে ছেলেকে নিয়ে এমন কিছু ছবি বানিয়ে আমার খুব ভালো লেগেছে। কয়েক মিনিটেই এমন স্মৃতি তৈরি করা সম্ভব হয়েছে, যা হয়তো বাস্তবে করা কঠিন।
শ্রেণিকক্ষ থেকে ভার্চুয়াল গ্যালারিতে
নারায়ণগঞ্জ সিদ্ধিরগঞ্জের একটি স্কুলের শিক্ষক পারভীন আক্তার দীর্ঘদিন ধরে ব্রাজিলের সমর্থক। বিশ্বকাপ এলেই শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ফুটবল নিয়ে আলোচনা করেন। এবার তিনি এআই দিয়ে এমন একটি ছবি তৈরি করেছেন, যেখানে তাকে সবুজ-হলুদ রঙের শাড়িতে একটি ফুটবল মাঠের গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
তিনি বলেন, এটি বাস্তব ছবি নয়, কিন্তু আমার সমর্থনের অনুভূতিটা সুন্দরভাবে প্রকাশ করেছে। প্রযুক্তি যে সৃজনশীল আনন্দও দিতে পারে, সেটি নতুন করে উপলব্ধি করেছি।
সমুদ্র আর আর্জেন্টিনার প্রতি ভালোবাসা
ছড়াকার জিয়ার দুটি বড় ভালোবাসা- সমুদ্র আর আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপের উন্মাদনা শুরু হতেই তিনি এআই ব্যবহার করে সেই দুই আবেগকে এক ছবিতে মিলিয়ে নিয়েছেন। এআই-নির্মিত ছবিতে তাকে দেখা যায় কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের ঢেউয়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে, গায়ে আর্জেন্টিনার নীল-সাদা রঙের পোশাক এবং পিঠে লিওনেল মেসির বিখ্যাত ১০ নম্বর জার্সি।
বাস্তবে এমন মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দি করা সম্ভব না হলেও, কয়েকটি নির্দেশনা দিয়েই এআই তার কল্পনাকে জীবন্ত করে তুলেছে। ছবিতে সমুদ্রের নীল জল, সৈকতের বিস্তৃত বালুকাবেলা এবং আর্জেন্টিনার প্রতীকী রঙ মিলেমিশে তৈরি করেছে এক ভিন্ন আবহ।
জিয়া বলেন, সমুদ্র আমাকে সবসময় টানে, আর ফুটবলে আমার ভালোবাসা আর্জেন্টিনার প্রতি। এআইয়ের মাধ্যমে এই দুটি অনুভূতিকে একসঙ্গে প্রকাশ করতে পেরেছি। এটি শুধু একটি ছবি নয়, বরং আমার ব্যক্তিগত আবেগের সৃজনশীল প্রকাশ।
হাসপাতালের ব্যস্ততার মাঝেও ফুটবলপ্রেম
পেশাগত ব্যস্ততার কারণে বিশ্বকাপের অনেক ম্যাচই সরাসরি দেখা হয় না ডা. মাহির হাসানের। কিন্তু তিনি আর্জেন্টিনার একনিষ্ঠ সমর্থক। এআই দিয়ে তিনি এমন একটি ছবি তৈরি করেছেন, যেখানে চিকিৎসকের কোটের নিচে আর্জেন্টিনার জার্সির আদলে নকশা এবং পেছনে বিশ্বকাপ ট্রফির প্রতীকী দৃশ্য ফুটে উঠেছে।
তার মতে, এটি বাস্তব নয়, কিন্তু নিজের আগ্রহকে ভিন্নভাবে প্রকাশ করার সুযোগ দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই এমন ছবি তৈরি করে আনন্দ ভাগাভাগি করছেন।”
কয়েকজন ফুটবলপ্রমী জানান, একসময় বিশ্বকাপ মানেই ছিল ঘরের ছাদে পতাকা টাঙানো, জার্সি কেনা বা দেয়ালে প্রিয় দলের ছবি আঁকা। এখন সেই তালিকায় যোগ হয়েছে এআই-নির্মিত ব্যক্তিগত ছবি। কয়েকটি শব্দের নির্দেশনায় এমন সব কল্পনাপ্রসূত দৃশ্য তৈরি হচ্ছে, যা বাস্তবে ধারণ করা সম্ভব নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জেনারেটিভ এআই সাধারণ মানুষের হাতে সৃজনশীলতার নতুন একটি মাধ্যম তুলে দিয়েছে। তবে এ ধরনের ছবি ব্যবহার বা প্রচারের ক্ষেত্রে এটি যে কৃত্রিমভাবে তৈরি- সেটি উল্লেখ করা এবং বিভ্রান্তিকর বা ভুয়া তথ্য ছড়ানো থেকে বিরত থাকা গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে, ২০২৬ বিশ্বকাপকে ঘিরে সেই উৎসবের প্রস্তুতি এবার মাঠের বাইরে ডিজিটাল জগতেও বিস্তৃত হয়েছে। প্রিয় দলের পতাকার রঙে নিজেকে সাজিয়ে এআই-নির্মিত ছবি শেয়ার করছেন বিভিন্ন পেশার মানুষ। ফলে বিশ্বকাপের অপেক্ষা এখন শুধু খেলার জন্য নয়; প্রযুক্তির ছোঁয়ায় নিজের সমর্থনকে নতুনভাবে প্রকাশ করার আনন্দও যোগ হয়েছে সেই অপেক্ষায়।

নিজস্ব প্রতিবেদক 

























