4:34 am, Tuesday, 14 July 2026

মৌলভীবাজারে বন্যার পানি নামলেও তীব্র খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট, বিপর্যস্ত জনজীবন

হাসান আল মাহমুদ রাজু – : টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যার পানি মৌলভীবাজারে ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। তবে পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হয়ে উঠছে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। বিস্তীর্ণ কৃষি জমি, আমন ও আউশের বীজতলা, সবজি ক্ষেত, গ্রামীণ সড়ক, নলকূপ ও পুকুর বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বন্যাকবলিত জনপদে এখন দেখা দিয়েছে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট। অনেক এলাকায় মানুষ এখনও মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

সোমবার (১৩ জুলাই) জেলার রাজনগর, কমলগঞ্জ, কুলাউড়া ও সদর উপজেলার বন্যাকবলিত বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অনেক স্থানে পানি কমতে শুরু করলেও অসংখ্য বাড়িঘর, আঙিনা ও সড়কে এখনো পানি জমে রয়েছে। কোথাও কোথাও মানুষ ঘরে ফিরতে শুরু করলেও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা এখনো অনেক দূরের বাস্তবতা।

মনু ও ধলাই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করায় জেলার চার উপজেলার অন্তত ২৮টি ইউনিয়নের প্রায় ১০ হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়ে। জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, প্রায় ৩৮ হাজার মানুষ এ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। রাজনগর ও সদর উপজেলার ১৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় দুই হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।

রাজনগর উপজেলার বাসিন্দা শরীফ আহমেদ বলেন, “প্রায় দুইশ ফুটের বেশি বাঁধ ভেঙে পানি প্রবেশ করে পুরো এলাকা প্লাবিত হয়েছে। প্রায় ৩০ হাজার মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। কৃষিজমির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা আমাদের জন্য খুবই কঠিন হবে।”

একই ধরনের পরিস্থিতি বিরাজ করছে কমলগঞ্জ উপজেলার পতনঊষার ও রহিমপুর ইউনিয়নেও। রহিমপুর এলাকার আছকির মিয়া বলেন, “ধলাই নদীর পানি লোকালয়ে ঢুকে বহু পরিবারকে পানিবন্দী করেছে। এখন পানি নামতে শুরু করলেও মানুষের দুর্ভোগ একটুও কমেনি।”

সদর উপজেলার হেতি বেগম বলেন, “তিন দিন ধরে পানিবন্দী ছিলাম। অনেক ঘরে এখনো হাঁটুসমান পানি রয়েছে। সরকারি বা বেসরকারিভাবে সবাই এখনো ত্রাণ পায়নি। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে আত্মীয়স্বজনের বাড়ি কিংবা নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছে।”

বন্যার সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে কৃষি খাতে। আমনের বীজতলা, আউশের আবাদ ও বিভিন্ন সবজি ক্ষেত পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে। পাশাপাশি গ্রামীণ সড়কের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।

অপর দিকে কুলাউড়া উপজেলার পৃথিমপাশা ইউনিয়নস্থ শিকড়িয়া এলাকায় বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী আঞ্চলিক সড়কের (বাঁধ) ভাঙন দিয়ে পানি ডুকে প্লাবিত হয়েছে বিভিন্ন গ্রাম । দুবছর আগে ভারী বর্ষণে মনু নদীর উপরিভাগ ভারতের পানির প্রবাহে ভেঙে যায় স্থানটি। ভারত বিএসএফের বাঁধায় আজ অবধি বাধটি মেরামত করা হয়নি বলে স্থানীয়রা জানান। এবং ত্রান বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে স্থানীয়দের

এদিকে নলকূপ ও পুকুর ডুবে যাওয়ায় বহু এলাকায় বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। নিরাপদ পানির অভাবে পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পাশাপাশি অনেক পরিবার এখনো পর্যাপ্ত খাদ্যসামগ্রী না পাওয়ায় চরম দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছে।

জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, বন্যাদুর্গত মানুষের সহায়তায় ইতোমধ্যে ১ হাজার ৭৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার, ৯০ মেট্রিক টন চাল এবং ৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন এলাকায় রান্না করা খাবার বিতরণ কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে।

মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদ বিন ওয়ালিদ বলেন, “শুক্রবার রাত থেকেই জেলার প্রধান নদ-নদীর পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। উজানে নতুন করে ভারী বৃষ্টিপাত না হলে দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি হবে এবং বন্যার পানি নেমে যাবে।”

জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, “বন্যাদুর্গত মানুষের জন্য পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রী বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন হলে আরও বরাদ্দ দেওয়া হবে। সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা নিশ্চিত করা হবে।

Tag :
About Author Information

Sirajul Islam

মৌলভীবাজারে বন্যার পানি নামলেও তীব্র খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট, বিপর্যস্ত জনজীবন

মৌলভীবাজারে বন্যার পানি নামলেও তীব্র খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট, বিপর্যস্ত জনজীবন

Update Time : 12:23:32 pm, Monday, 13 July 2026

হাসান আল মাহমুদ রাজু – : টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যার পানি মৌলভীবাজারে ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। তবে পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হয়ে উঠছে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। বিস্তীর্ণ কৃষি জমি, আমন ও আউশের বীজতলা, সবজি ক্ষেত, গ্রামীণ সড়ক, নলকূপ ও পুকুর বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বন্যাকবলিত জনপদে এখন দেখা দিয়েছে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট। অনেক এলাকায় মানুষ এখনও মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

সোমবার (১৩ জুলাই) জেলার রাজনগর, কমলগঞ্জ, কুলাউড়া ও সদর উপজেলার বন্যাকবলিত বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অনেক স্থানে পানি কমতে শুরু করলেও অসংখ্য বাড়িঘর, আঙিনা ও সড়কে এখনো পানি জমে রয়েছে। কোথাও কোথাও মানুষ ঘরে ফিরতে শুরু করলেও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা এখনো অনেক দূরের বাস্তবতা।

মনু ও ধলাই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করায় জেলার চার উপজেলার অন্তত ২৮টি ইউনিয়নের প্রায় ১০ হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়ে। জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, প্রায় ৩৮ হাজার মানুষ এ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। রাজনগর ও সদর উপজেলার ১৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় দুই হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।

রাজনগর উপজেলার বাসিন্দা শরীফ আহমেদ বলেন, “প্রায় দুইশ ফুটের বেশি বাঁধ ভেঙে পানি প্রবেশ করে পুরো এলাকা প্লাবিত হয়েছে। প্রায় ৩০ হাজার মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। কৃষিজমির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা আমাদের জন্য খুবই কঠিন হবে।”

একই ধরনের পরিস্থিতি বিরাজ করছে কমলগঞ্জ উপজেলার পতনঊষার ও রহিমপুর ইউনিয়নেও। রহিমপুর এলাকার আছকির মিয়া বলেন, “ধলাই নদীর পানি লোকালয়ে ঢুকে বহু পরিবারকে পানিবন্দী করেছে। এখন পানি নামতে শুরু করলেও মানুষের দুর্ভোগ একটুও কমেনি।”

সদর উপজেলার হেতি বেগম বলেন, “তিন দিন ধরে পানিবন্দী ছিলাম। অনেক ঘরে এখনো হাঁটুসমান পানি রয়েছে। সরকারি বা বেসরকারিভাবে সবাই এখনো ত্রাণ পায়নি। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে আত্মীয়স্বজনের বাড়ি কিংবা নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছে।”

বন্যার সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে কৃষি খাতে। আমনের বীজতলা, আউশের আবাদ ও বিভিন্ন সবজি ক্ষেত পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে। পাশাপাশি গ্রামীণ সড়কের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।

অপর দিকে কুলাউড়া উপজেলার পৃথিমপাশা ইউনিয়নস্থ শিকড়িয়া এলাকায় বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী আঞ্চলিক সড়কের (বাঁধ) ভাঙন দিয়ে পানি ডুকে প্লাবিত হয়েছে বিভিন্ন গ্রাম । দুবছর আগে ভারী বর্ষণে মনু নদীর উপরিভাগ ভারতের পানির প্রবাহে ভেঙে যায় স্থানটি। ভারত বিএসএফের বাঁধায় আজ অবধি বাধটি মেরামত করা হয়নি বলে স্থানীয়রা জানান। এবং ত্রান বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে স্থানীয়দের

এদিকে নলকূপ ও পুকুর ডুবে যাওয়ায় বহু এলাকায় বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। নিরাপদ পানির অভাবে পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পাশাপাশি অনেক পরিবার এখনো পর্যাপ্ত খাদ্যসামগ্রী না পাওয়ায় চরম দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছে।

জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, বন্যাদুর্গত মানুষের সহায়তায় ইতোমধ্যে ১ হাজার ৭৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার, ৯০ মেট্রিক টন চাল এবং ৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন এলাকায় রান্না করা খাবার বিতরণ কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে।

মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদ বিন ওয়ালিদ বলেন, “শুক্রবার রাত থেকেই জেলার প্রধান নদ-নদীর পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। উজানে নতুন করে ভারী বৃষ্টিপাত না হলে দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি হবে এবং বন্যার পানি নেমে যাবে।”

জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, “বন্যাদুর্গত মানুষের জন্য পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রী বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন হলে আরও বরাদ্দ দেওয়া হবে। সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা নিশ্চিত করা হবে।