1. newsmkp@gmail.com : Admin : sk Sirajul Islam siraj
  2. info@fxdailyinfo.com : admi2017 :
ব্রেকিং নিউজ :
 করোনা আপডেট :   করোনায় আরও ৪৪ জনের মৃত্যু, শনাক্ত ২৩২২

মধ্য যুগে ভারতে মুসলিম শাসনঃ দিল্লি সালতানাতঃ সাম্প্রদায়ীক সম্প্রিতিঃ সুশাসনঃ সমাজঃ সভ্যতা ও সংস্কৃতি

  • আপডেট টাইম : রবিবার, ৩০ মে, ২০২১
  • ৫৫ বার পঠিত
মুজিবুর রহমান মুজিব

প্রাচীন ভারত বর্ষকে বিশ্ববিখ্যাত ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ-ভিনসেন্ট স্মীথ- (ঠরহপবহঃ ঝসরঃয) যথার্থ ভাবেই-পৃথিবীর নৃ-তাত্বিক যাদুশালা-বলে মূল্যবান অভিমত দিয়ে ছিলেন। বিশাল ভারতের ভূ-বৈচিত্র, মাটির উপরে-নিচে বিপুল পরিমাণ ধন সম্পদ, অপরূপ প্রাকৃতিক নিসর্গ এবং ভারত বাসির মায়ায় বিমুগ্ধ হয়ে এদেশে যুগে যুগে এসেছেন আরব-অনারব-পীর-আউলিয়া-সাধু-সন্যাসী-আর্য্য-অনার্য্য-মুঘল-পাঠান-জাতি-উপজাতি। এসেছেন ইংরেজ-ফরাসী, ওলন্দাজ বনিকের দল। এদের আগমনে প্রাচীন ভারতের সভ্যতা ও সংস্কৃতি সম্বৃদ্ধ হয়েছে। এরা রাজ্য শাসন-সমাজ বিকশিত ও সমাজ উন্নয়ন করেছেণ। দিল্লিকে কেন্দ্র করেই ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতি বিকশিত হয়েছে। দিল্লি ছিল ভারতের প্রাণ-ভারতের রাজধানী। ভারতের দিল-দিল্লি পৃথিবীর মধ্যেই একটি অন্যতম প্রাচীন নগরী। তুঘলক ও মুঘল আমলে সাময়িক ভাবে ভারতীয় রাজধানী পরিবর্তন হলেও দিল্লির ইমেজ, মর্য্যাদা ও ভাবমূর্তি, প্রাচীন ঐতিহ্য, কোন কালেই ¤øান হয়নি।
ভারতীয় শাসক সম্প্রদায়ের মধ্যে রাজপুত একটি শক্তিশালী এবং অভিজাত জাতি। প্রায় সাড়ে পাঁচ শত বৎসর রাজপুত রাজাগণ চুটিয়ে উত্তর ভারত শাসন করেছেন। দিল্লির সর্বশেষ রাজপুত রাজা পৃথ্বিরাজ চৌহানকে গজনির সুলতান সাহাবুদ্দিন মোহাম্মদ ঘোরি ১১৯২ সালে তরাইনের ২য় যুদ্ধে হারিয়ে মহান আল্লাহর অপার মেহেরবানী এবং পীর আওলিয়ার দোয়ায় দিল্লিতে প্রথমবারের মত মুসলমানদের বিজয় নিশান উড়ান। রাজপুত রাজত্যের অবসানের সাথে সাথে দিল্লিতে শুরু হয় মুসলিম শাসন। শুভ সূচনা হয় ইসলামি সভ্যতা ও সংস্কৃতির। ঘোরির এক লক্ষ বিশ হাজার সেনাবাহিনীর ডেপুটি কমান্ডার ছিলেন তার একান্ত অনুগত ও বিশ্বস্থ সেনাপতি তুর্কি বীর কুতুব উদ্দিন আইবেক। আইবেক ছিলেন ক্রীতদাস এবং মামলুক। তাঁরা দাস বংশোদ্ভূত পেশাদার সৈনিক। মামলুকগণ ইসলাম ধর্মে দিক্ষিত হয়ে নবম শতাব্দীতে একটি সামরিক শক্তি হিসাবে আত্ব প্রকাশ করেন। তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে মহাশক্তিশালী দিল্লির শাসক পৃথ্বিরাজ চৌহানের তিন লক্ষ সেনাবাহিনীকে পরাজিত করতে আইবেকের অসীম সাহস, রনকৌশল ও রননৈপুন্য কাজে লেগেছিল। ১২০৬ সালে অপুত্রক মোহাম্মদ ঘোরির মৃত্যু হলে তাঁর বিশাল সা¤্রাজ্য বিভক্ত হয়ে যায়। কুতুব উদ্দিন আইবেক দিল্লির সুলতান হিসাবে শাসন ভার গ্রহণ করেন। নিঃসন্তান ঘোরির কোন পুত্র সন্তান এবং ঘোষিত উত্তর সূরী না থাকায় দিল্লির শাসন ক্ষমতায় উপসেনাপতি কুতুব উদ্দিন আইবেকের একচ্ছত্র উত্থান ঘটে। শাসন ক্ষমতায় অধিষ্টিত হয়ে আইবেক কঠোর হস্তে যাবতীয় বিদ্রোহ দমন করতঃ দিল্লিতে-দাস বংশের-শাসন পাকা পোক্ত করেন। আইবেক-মুলতানের শাসক নাসির উদ্দিন কাবাছা এবং গজনীর সুলতান তাজ উদ্দিন ইয়ালদুজের বিদ্রোহ দমন করেন। বিচক্ষন কুতুব উদ্দিন আইবেক তার ক্ষমতা সু-সংহত ও উত্তর ভারতে নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। দিল্লিতে তার প্রশাসনিক ক্ষমতা অক্ষুন্ন ও বহাল রেখে আইবেক লাহোরে রাজধানী স্থানান্তর করেন। তার শাসনামলে বিশ্বস্থ সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দিন বিন বখতিয়ার খিলজি দ্বাদশ শতাব্দীতে বাংলা বিজয় করেন। আইবেক যেমনি ছিলেন বীরযোদ্ধা তেমনি ছিলেন একজন আদর্শ শাসক। আইবেক দিল্লিতে-কুয়াতুল ইসলাম মসজিদ এবং কুতুব মিনার-নির্ম্মান করেন। দিল্লির অনতি দূরে দ্বাদশ শতাব্দীর অনুপম মুসলিম স্থাপত্য-কুতুব মিনার-এখনও কালের স্বাক্ষী হয়ে মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে আছে। মহান মালিকের মেহেরবানীতে কুতুব মিনার পরিদর্শনের সুযোগ হয়েছে আমার। সুউচ্চ-কুতুব মিনার-লালটালির অপূর্ব স্থাপনা-একটি পর্য্যবেক্ষন টাওয়ার-বলা যেতে পার্ েকারন সেকালে উন্নত যোগাযোগ এবং তথ্য প্রযুক্তি ছিলনা। সু-উচ্চ কুতুব মিনারের চূড়ায় উঠে দূরবর্তী স্থানে শত্রæর আনা গুনা পর্য্যবেক্ষন করা যেত। দিল্লি বিজয়ী বীর মোঃ ঘোরির সহ যোদ্ধা আইবেক রাজ্য শাসনে ঘোরির নীতি অনুসরন করতেন। রাজপুত রাজাগণকে যুদ্ধে পরাজিত করে দেশ দখল করলেও রাজ্য শাসনে তাঁরা ছিলেন উদার, সহনশীল ও অসাম্প্রদায়ীক। রাজপুত ও হিন্দু প্রজা সাধারনকে তারা সকল নাগরিক সুযোগ সুবিধা দিয়েছেন। হিন্দু ধর্মাবলম্বি ও ভারতীয় দেব দেবীকে ধ্বংস কিংবা অসম্মান করা হয়নি। বরং মোঃ ঘোরি তার মুদ্রায় দেবী লক্ষীর প্রতিকৃতি অব্যাহত রেখেছিলেন। আইবেক পরাজিত রাজপুত রাজাগণকে আজমীর ও গোয়ালিওর শাসনের সুযোগ দিয়ে উদার মনেরই পরিচয় দিয়েছিলেন। দিল্লির মুসলিম শাসনের সূচনাকারীদের উদারও সহনশীল মনোভাবের প্রকৃষ্ট উদাহরন “হিমু দ্য হিন্দু হিরো অব মেডিয়াভ্যাল ইন্ডিয়া” দ্য হিন্দুজ ভিজ অ্যা ভিজ দ্য আফগান এন্ড দি মোগল-গ্রহ্ণের-৮৯-পৃষ্ঠায় এই ভাবে “গড়ংঃ ড়ভ ঃযব ঞঁৎশং যিড় যধফ বংঃধনষরংযবফ ঃযব ঝঁষঃধহধঃব ড়ভ উবষযর বিৎব, ঘড়ফড়ঁনঃ হবড়ঢ়যুঃবং নঁঃ ঃযবু বিৎব ংরহমঁষধৎষু ভৎবব ভৎড়স ধষষ ৎবষরমরড়ঁং নরড়মড়ঃৎু ড়ৎ ভধহধঃরপংস ভড়ৎ বীধসঢ়ষব ঝযধনঁফফরহ এযড়ৎব পড়হভরৎসবফ ঃযব ভরমঁৎবং ড়ভ ঃযব মড়ফফবং ষধশংসর ড়হ যরং পড়রহং. ছঁঃঁন টফফরহ অরনবশ ধষষড়বিফ ঃযব জধলঢ়ঁঃ চৎরহপবং ঃড় ৎঁষব ড়াবৎ ফবষযর ধহফ ধলসরৎ ধহফ মধিষরড়ৎ বাবৎ ধভঃবৎ ঃযব পড়হয়ঁবংঃ ড়ভ ঃযড়ংব ৎবমরড়হং- লিখা আছে।
দিল্লীতে-দাসরাজ বংশের-প্রতিষ্টাতা কুতুব উদ্দিন আইবেক ১২১০ সালে লাহোরে-পলো-খেলার সময় ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে মৃত্যুবরণ করেন। সেখানেই তিনি সমাহিত। রাজপুত উত্তর দিল্লী ধারাবাহিক ভাবে ১.। দাস বংশ, ২. খিলজি বংশ, ৩. তুঘলক বংশ, ৪. সৈয়দ বংশ এবং ৫. লোদীরাজ বংশ, এই পাঁচ রাজ বংশ সগৌরবে তিনশ বিশ বৎসর দিল্লী শাসন করেন। এই পাঁচ বংশের শাসন ভারতের ইতিহাসে “দিল্লী সালতানাত” নামে খ্যাত। আইবেক প্রতিষ্ঠিত-দাস বংশের-শাসকদের মধ্যে সুলতানা রাজিয়া, সামসুদ্দিন ইলতুত মিশ, মইজ উদ্দিন বাহরাম শাহ্, নাসির উদ্দিন মাহমুদ, গিয়াস উদ্দিন বলবনের নাম সবিশেষ উল্লেখ্য যোগ্য। দিল্লী ও ভারত শাসনের ইতিহাসে সেই মধ্যযুগের একমাত্র মহিলা মুসলিম শাসক এর নাম জালালাত উদ্দিন রাজিয়া। গোড়া মুসলিমদের বিরোধিতা উপেক্ষা করে সুলতানা রাজিয়া ১২৩৬ থেকে ৪০ সাল পর্য্যন্ত সগৌরবে দিল্লী শাসন করেন। সেই যুগেও সুলতানা রাজিয়ার উদার নীতি ভারতের ইতিহাসে ঐতিহাসিক অধ্যায়। তিনি হিন্দু মুসলিম সকল নর নারী প্রজা সাধারনকে এক চোখে দেখতেন। রাজিয়া ছিলেন ধর্মানুরাগী, জ্ঞানী, বিদ্যোতশাহী। তার শাসনামলে ব্যাপক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং পাঠাগার স্থাপিত হয়। গন গ্রন্থাগার সমূহে পবিত্র আল কোরআন ও ধর্ম দর্শন সংক্রান্ত পুস্তক সংরক্ষিত থাকত। খিলজিদের উত্থানে দাস বংশের শাসনের অবসান ঘটে। দিল্লী সালতানাতের দ্বিতীয় রাজ বংশ তুর্কি আফগান-খিলজি-গন। এই বংশের প্রতিষ্ঠাতা সুলতান জালালুদ্দিন মালিক ফিরোজ খিলজি হলেও এই বংশের আলাউদ্দিন খিলজি শ্রেষ্ট শাসক। খিলজিগন তুর্কি-আফগান। আফগানিস্থানের একটি গ্রামের নামে এই বংশের নামকরন। এই বংশের শ্রেষ্ট শাসক ও বীর যোদ্ধা সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি ক্রমাগত মোঙ্গঁল আক্রমণ থেকে ভারতকে রক্ষা করেছিলেন। তিন লক্ষ সুশিক্ষিত সেনাবাহিনীর অধিনায়ক আলাউদ্দিন খিলজি কঠোর হস্তে যাবতীয় রাজপুত বিদ্রোহ দমন করতঃ রাজ্য সীমাবর্ধিত করেন। সমর নায়ক আলা উদ্দিনের আমলেই ভারতীয় মুসলিম ঘরানার সঙ্গীঁত ও সংস্কৃতির সূচনা। তার সভা কবি আমীর খসরু ভারতীয় ফারসী সংস্কৃতি সঙ্গীঁতের সমন্বয়ে ভারতীয় সঙ্গীঁত জগতে বিপ্লব ঘটান। দিল্লি সালতানাতের তৃতীয় রাজ বংশের নাম তুঘলক বংশ। তুঘলকগন তুর্কি বংশীয় মুসলমান হলেও তারা আফগান মুসলমানদের সঙ্গেঁ জোট গঠন করে গাজি মালিকের নেতৃত্বে তুঘলক-বাদ প্রতিষ্টা করেন। কোন যোগ্য উত্তরসূরী না থাকায় তুঘলক বংশের শাসনাবসান হয়। সর্ব্বোপরি ১৩৯৮ সালের ১৫ইং ডিসেম্বর তৈমুর লং ভারত আক্রমণ করতঃ-দিল্লী সালতানাতের-বিশাল বাহিনীকে পরাজিত করলে এই বংশের ক্ষমতা শেষ হয়ে যায়।
দিল্লী সালতানাতের চতুর্থ রাজ বংশ-সৈয়দ বংশ। ১৪১৪ থেকে ৪১ সাল মোট ৩৭ বৎসর চারজন সৈয়দজাদা দিল্লী শাসন করেন। সৈয়দ বংশের প্রতিষ্টাতা খিজির খাঁন। এই বংশ নিজেদেরকে মহানবী হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা (দঃ) এর বংশের বলে দাবী করতেন। তাদের সময় দিল্লীর রাজ ভাষা ছিল ফারসি। মহাবীর তৈমুর লং এর আক্রমনে যখন দিল্লী লুন্ঠিত ও বিদ্ধস্থ তখন দেশব্যাপী বিরাজমান বিশৃঙ্খলার মাঝে শাসন ভার গ্রহণ করে এই সৈয়দ বংশ দিল্লীতে শান্তি ফিরিয়ে আনেন। ইয়াহিয়া বিন আহমদ সিরহিন্দি রচিত “তারিখি মুবারক শাহ”-তে সৈয়দ বংশের বিবরণ পাওয়া যায়। তিনি তার এই বিখ্যাত গ্রন্থে খিজির খানকে মহানবী (দঃ) এর বংশের বলে উল্লেখ করেছেন। দিল্লী সালতানাতে সৈয়দ বংশের শেষ শাসক আলাউদ্দিন আলম শাহ। রাজ সিংহাসন প্রাপ্তি, দখল ও অধিকারে যেখানে যোগ্যতা, উত্তরাধিকার, তরবারি, সৈন্য বাহিনী, যুদ্ধ বিগ্রহের প্রয়োজন হয় সেখানে সৈয়দ বংশীয় এই শেষ শাসক স্বেচ্ছায় দিল্লীর সিংহাসন বাহলুল খান লোদীর অনুকুলে ত্যাগ করে বাদাউন গমন করেন। দিল্লী সালতানাতের শেষ ও পঞ্চম রাজ বংশ লোদী রাজ বংশ। লোদীরা ছিলেন পুশতুভাষী খান পদবী ধারী আফগান। ১৪৫১ সালে বাহলুল খান লোদী এই রাজ বংশ প্রতিষ্টা করেন। এই বংশের শেষ শাসক ইব্রাহিম লোদী। ১৫২৬ খৃষ্টাব্দে পানি পথের প্রথম যুদ্ধে চেঙ্গীঁস-তৈমুরের অধঃস্থন বংশধর জহির উদ্দিন মোহাম্মদ বাবরের কাছে পরাজিত ও নিহত হলে দিল্লীতে লোদী বংশ ও দিল্লী সালতানাতের অবসান হয়। আফগান গনবিভক্ত থাকায় দিল্লীর সুলতান ইব্রাহিম খান লোদী ভারতীয় আফগানদের সাহায্য সহযোগীতা পাননি। ফলতঃ রাজ্য রক্ষায় মহাবীর

বাবরের সঙ্গেঁ বীর দর্পে লড়াই করে স্বদেশ ও স্বাধীনতার জন্য প্রানদেন ইব্রাহিম খান লোদী। বাবরের মাধ্যমে ভারতে মুঘল শাহীর শুভ সূচনা। দিল্লী সালতানাতের অবসান।
মধ্য যুগের দিল্লী সালতানাত শুধুমাত্র দিল্লী নয় ভারতের ইতিহাসের স্বর্ণ যুগও বলা যেতে পারে। শিক্ষা, জ্ঞান, বিজ্ঞান, দর্শনের সেই অনগ্রসর যুগেও দিল্লী সালতানাতের মহান সুলতানগনের রাজ্য পরিচালনা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রিতি, প্রজাহিতৈষী কার্য্যক্রম, ব্যতিক্রমী শাসকদের প্রজা সাধারনের নিকট কোন দায়বদ্ধতা ছিল না তবুও দায়িত্ববোধ থেকেই দিল্লী সুলতানগণ প্রজাহিতৈষী কার্যক্রম করেছেন। সিংহাসন ও শাসন ক্ষমতা নিয়ে শাসক সম্প্রদায়ের মধ্যেই সংঘাত সীমাবদ্ধ ছিল প্রজা সাধারনের উপর তার কোন বিরুপ প্রতিক্রিয়া কিংবা প্রভাব পরিলক্ষিত হয় নি। অথছ দুঃখ ও দূর্ভাগ্যজনক ভাবে এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে মানব জাতি শিক্ষাও জ্ঞান বিজ্ঞানে উন্নতির চরম শিখরে আরোহন করে ও কুশিক্ষা, সাম্প্রদায়ীকতা, জঙ্গীবাদ, মৌলবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হচ্ছে। জাতি সংঘের নিষেধাজ্ঞাকে উপেক্ষা করে আধুনিক মানব সভ্যতার কলংক ও দুষ্ট ক্ষত ইসরাইল ফিলিস্থিন-গাজায় বেপরোওয়া বোমা বর্ষন করে শিশু-নরনারি নির্মম ভাবে হত্যা করে।
দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতাব্দীর দিল্লী সুলতানগণ জন্মগত ভাবে ভারতীয় ছিলেন না, রাজ্য শাসন, সুশাসন প্রজা পালনে তারা ছিলেন আদি ও অকৃত্তিম ভারতীয়। দিল্লী ও ভারতীয় জনগোষ্টীকে শিক্ষা ও জ্ঞানে সম্বৃদ্ধ ও শক্তিশালী করার জন্য দিল্লীর সুলতানগন শিক্ষা, ভাষা ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নে বহুবিধ কার্য্যক্রম করেছিলেন। সর্বভারতীয় সাংস্কৃতিক রেঁনেসায় দিল্লী সালতানাতের ঐতিহাসিক অবদান ইতিহাসের গৌরবোজ্জল অধ্যায়। এই আমলেই সংস্কৃত, প্রাকৃত এবং ফারসি ভাষার সমাহারে-আন্ত সংমিশ্রনে উর্দূ ভাষার জন্ম। বিশিষ্ট সাংবাদিক ও সুলেখক সাহাদাত হোসেন খাঁন তার সুবিশাল গবেশনা গ্রন্থ “মুঘল স¤্রাজ্যের সোনালী অধ্যায়” এ বলেন “হিন্দু মুসলিম সাংস্কৃতিক মিলন, স্থাপত্য, সঙ্গীত, সাহিত্য, ধর্ম ও পোষাকে স্থায়ী প্রভাব বিস্তার করে।” দিল্লীর সুলতানদের আমলেই সর্ব প্রথম মুসলিম যাদুঘর প্রতিষ্টিত হয়। ১২৩১ সালে সুলতান শামশুদ্দিন ইলতুত মিশ দিল্লীতে-সুলতান ঘারি-প্রতিষ্টা করেন- যা ভারতের ইতিহাসে প্রথম-মুসলিম যাদুঘর-হিসাবে খ্যাত। রাজ্য পরিচালনায় জনগনের অংশ গ্রহন তথা মতামত এর প্রয়োজনে সুলতানী আমলে অভিজাত সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব মূলক সংস্থা- “চিহাল গানি”- ব্যবস্থার প্রচলন ছিল। চিহাল গানি-রাজ্য পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন- যা আধুনিক জমানায় সাংসদ, মন্ত্রীসভার মাননীয় সদস্য-উপদেষ্টা বৃন্দ করে থাকেন।
দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতাব্দরি দিল্লীর শাসকগন, সালতানাত অব দিল্লীর শাসক ও জনগন সে যুগেও ছিলেন উদার ও অসাম্প্রদায়িক-তাদের অবদান ভারতের ইতিহাসের গৌরবোজ্জল অধ্যায়।
প্রাচীন নগরী দিল্লী “লাল কোট”, “মেহেরুলি”, “শহর-ই-নও-বা-তুঘলকাবাদ”-যে নামেই ডাকা হোক না কেন-দিল্লী-দিল্লীই-। হাজার বছরের গৌরবময় ইতিহাস ঐহিত্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন নগরি দিল্লী। আধুনিক ভারতের রাজধানী নয়া দিল্লী হলেও ওল্ড দিল্লী তাঁর গুরুত্ব ও প্রাচীনত্ব হারায়নি। উপমহাদেশের প্রবীন সাংবাদিক সুখওয়ান্ত সিং তাঁর বিখ্যাত গ্রহ্ণ “দিল্লীতে-তা-বয়ান করেছেন। আধুনিক কালেও দিল্লির জনগন অত্যন্ত রাজনীতি সচেতন, দূর্নীতি বিরোধী, উদার গনতন্ত্র মনস্ক। একজন অখ্যাত অরবিন্দ কেজরিওয়াল ঘুষ দূর্নীতি সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে জন প্রিয়তা অর্জন করতঃ গনদাবীর প্রেক্ষিতে গঠন করেন আম আদমী পার্টি। অরবিন্দ কেজরিওয়াল রাজ্য সভার নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করে ভারতের রাজনীতিতে চমক সৃষ্টি করেন। উপমহাদেশের প্রাচীনতম ঐতিহ্যবাহী দল কংগ্রেস, হিন্দুত্ব বাদী দল বিজেপি এবং মোদী ঝড়কে উড়িয়ে দিয়ে দিল্লীতে সরকার গঠন করেন আম আদমী প্রধান ভারতীয় রাজনীতির নবীন নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল। দিল্লীর রাজনীতি সচেতন জনগন তাঁকে এই সুযোগ দিয়েছেন। দিল্লীর সুলতানগন আজ আর নেই। এত বৎসর বেঁচে থাকার কথা নয়। কিন্তু দিল্লীতে আছে অনেক পীর আউলিয়ার মাজার। আজমীরে চীর শয়ানে শায়িত আছেন সুলতানুল হিন্দ গরীবে নেওয়াজ খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি (রঃ আঃ)। তিনি ৯৫ বৎসর বয়সে মহান মৃত্যোকে আলীঙ্গন করেন। তার দরগাহে বারো মাস দৈনিক হাজার হাজার এবং বার্ষিক ওরশে লক্ষ লক্ষ আশেকান হাজির হয়ে জিয়ারত ও জিগির আজগার করেন। দিল্লীতে আরো আছে হযরত নিযাম উদ্দিন আউলিয়া, কুতুব উদ্দিন বখতিয়া খাকি প্রমুখ পীরে কামেলের মাজার। আছে-চাঁদনী চকের বিখ্যাত বাজার, ভারতের তাবত জিনিষ এই বাজারে পাওয়া যায়। দিল্লিরি লাড্ডু, বিশ্বখ্যাত দিল্লীর লাড্ডু খাওয়া নিয়ে মুখরোচক গল্প আছে- “দিল্লীকা লাড্ড যবই খাতা হ্যায়।
পূরাতন দিল্লীর লাল কেল্লা ও মুঘল ইতিহাস ঐতিহ্যের নিরব স্বাক্ষী হয়ে টিকে আছে। সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও গবেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবঃ) ডক্টর শাখাওয়াত হোসেনের মতে “দিল্লীর প্রতিটি ইটের পরতে পরতে ইতিহাস লুকায়িত আছে”। খাজা বাবার মাজার জিয়ারত ও গবেষনার কাজে সপ্তাহ খানেকের সফরে স্বদল বলে দিল্লী গিয়েছিলাম। জিয়ারত শেষে ঘুরলাম। দেখলাম। মনে হল সাগরে সাতার কাটা হল- পানি পান হল না, তৃষ্ণা মিটল না।
মধ্যযুগের উচ্চ মন মানসিকতার অধিকারি দিল্লী সালতানাতের উজ্জল স্মৃতির প্রতি সুগভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি। তাঁদের রুহের মাগফিরাত কামনা করি। খাজা গরীবে নওয়াজ এর মাজার শরীফ জিয়ারতের মহান সুযোগ দিয়েছিলেন আমাদের মহান মালিক সর্ব শক্তিমান আল্লাহ তায়ালা। তাঁর পাক দরগায় হাজার সালাম। সমাজ ও সভ্যতার ক্রম বিকাশের ইতিহাসে মধ্যযুগে দিল্লী সালনাত ইতিহাসে ঐতিহাসিক অবদান, ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ আছে।

[সিনিয়র এডভোকেট হাইকোর্ট। মুক্তিযোদ্ধা। সাবেক সভাপতি, মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব। সেক্রেটারি জেলা জামে মসজিদ, মৌলভীবাজার। ]

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..