ডেস্ক রিপোর্ট : শুরুটা ছিল পর্তুগালের, শেষটা ডিআর কঙ্গোর উৎসবের। ম্যাচ শুরু হতে না হতেই এগিয়ে গিয়েছিল পর্তুগাল।
কিন্তু বিরতির ঠিক আগে ইয়োয়ান উইসার হেডে সমতায় ফেরে ডিআর কঙ্গো। এরপর দ্বিতীয়ার্ধজুড়ে লড়েও আর গোল পায়নি ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর দল।
হিউস্টনে বিশ্বকাপের গ্রুপ ‘কে’র ম্যাচে পর্তুগালের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করেছে ডিআর কঙ্গো। বিশ্বকাপে এটিই তাদের প্রথম পয়েন্ট।
পর্তুগালের হয়ে গোল করেন জোয়াও নেভেস। ডিআর কঙ্গোর গোলটি করেন উইসা।
রেকর্ডের ম্যাচে পর্তুগালের একাদশে ছিলেন রোনালদো। ৪১ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড মাঠে নেমে ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলার মাইলফলকে লিওনেল মেসিকে ছুঁয়েছেন। একই সঙ্গে বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বয়সী আউটফিল্ড ফুটবলার হিসেবেও ম্যাচ খেললেন তিনি।
ম্যাচের শুরু থেকেই বলের দখলে আধিপত্য ছিল পর্তুগালের। ডিআর কঙ্গোকে নিচে নামিয়ে রেখে আক্রমণ সাজাতে থাকে রোবের্তো মার্তিনেজের দল। ফলও পায় দ্রুত।
ষষ্ঠ মিনিটে ডান দিক থেকে পেদ্রো নেতোর দারুণ ক্রসে গ্ল্যান্সিং হেড করেন নেভেস। বল যায় দূরের কোণে। লিওনেল এমপাসির কিছুই করার ছিল না। এগিয়ে যায় পর্তুগাল।
এই গোলের আগে থেকেই ইতিহাসে নাম লিখিয়েছিলেন নেভেস। পর্তুগালের হয়ে বিশ্বকাপে সবচেয়ে কম বয়সী সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার হিসেবে ম্যাচ শুরু করেন তিনি। গোল করার পর হয়ে যান পর্তুগালের তৃতীয় সর্বকনিষ্ঠ বিশ্বকাপ গোলদাতা। তার ওপরে আছেন শুধু রোনালদো ও গনসালো রামোস।
গোলের পরও বেশির ভাগ সময় বল ছিল পর্তুগালের পায়ে। প্রথমার্ধে একসময় তাদের দখলে ছিল ৮০ শতাংশ বল। তবে এত দখল নিয়েও পরিষ্কার সুযোগ তৈরি করতে পারছিল না তারা।
১৩ মিনিটে এদো কায়েম্বেকে দেরিতে ট্যাকল করে হলুদ কার্ড দেখেন বের্নার্দো সিলভা। ১৮ মিনিটে নুনো মেনদেসের আক্রমণ থেকে সুযোগ তৈরি হয়েছিল। তার চেষ্টায় এমপাসি অস্বস্তিতে পড়লেও ফিরতি বলে ব্রুনো ফার্নান্দেসের নিচু ক্রসে স্লাইড করেও বল ছুঁতে পারেননি বের্নার্দো।
৩০ মিনিটে রোনালদোর সামনে প্রথম ভালো সুযোগ আসতে পারত। জোয়াও কানসেলোর নিচু ক্রস ছয় গজ বক্সে ছুটে গিয়েছিলেন পর্তুগাল অধিনায়ক। তবে বলটি তার নাগালের একটু বাইরে দিয়ে চলে যায়।
গোল হজমের পর মাথা নত করেনি ডিআর কঙ্গো। ধীরে ধীরে ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করে তারা। ৩৫ মিনিটে দূর থেকে শট নেন কায়েম্বে। সেটি খুব বেশি বিপজ্জনক ছিল না, তবে ডিআর কঙ্গোর প্রথম লক্ষ্যে থাকা শট ছিল সেটি।
৩৩ মিনিটে নেতোর সঙ্গে সংঘর্ষে হলুদ কার্ড দেখেন চান্সেল এমবেম্বা। এরপরও ডিআর কঙ্গো নিজেদের গুছিয়ে রাখে। উইসা সতীর্থদের বারবার ওপরে উঠতে বলছিলেন। যে কারণে শেষ দিকে তাদের আত্মবিশ্বাসও বাড়তে থাকে।
প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে আসে ডিআর কঙ্গোর ইতিহাস গড়ার মুহূর্ত। ছোট করে নেওয়া কর্নারের পর পর্তুগাল রক্ষণে ভুল করে বসে। ব্রুনো ফার্নান্দেস সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করেন, তমাস আরাউজোও উইসাকে ফাঁকা রেখে দেন। সুযোগ পেয়ে দারুণ হেডে বল ওপরের বাঁ কোণে পাঠান উইসা।
এটি ছিল ডিআর কঙ্গোর ৫২ বছরের মধ্যে প্রথম বিশ্বকাপ গোল। সেই গোলেই বিরতিতে ম্যাচ যায় ১-১ সমতায়।
বিরতির পর বের্নার্দোর জায়গায় ফ্রান্সিসকো কনসেইসাওকে নামায় পর্তুগাল। গতি বাড়ানোর চেষ্টা ছিল কোচ মার্তিনেজের। তবে দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেও ডিআর কঙ্গো রক্ষণে দৃঢ়তার পরিচয় দেয়।
৫০ মিনিটে দূরহ কোণ থেকে শট নেন সেদ্রিক বাকাম্বু। দিয়োগো কস্তা সেটি ঠেকালেও অফসাইডের পতাকা ওঠে। ৫২ মিনিটে নতুন নিয়মে সময়মতো গোলকিক নিতে না পারায় কর্নার দিয়ে দেন ডিআর কঙ্গোর গোলকিপার এমপাসি। তবে সেখান থেকে কিছু করতে পারেনি পর্তুগাল।
৫৪ মিনিটে রোনালদোর পাস থেকে নুনো মেন্দেসের নিচু ক্রস আটকে দেন অ্যাক্সেল তুয়ানজেবে ও অ্যারন ওয়ান-বিসাকা। নেভেস শটের অপেক্ষায় থাকলেও বল তার কাছে পৌঁছায়নি।
এক মিনিট পর জালের দেখা পেয়েছিল পর্তুগাল। বুক দিয়ে বল নামিয়ে কাছ থেকে বাইসাইকেল কিকে গোল করেন কানসেলো। কিন্তু অফসাইডের কারণে গোলটি বাতিল হয়। পরে রিপ্লেতে দেখা যায় বল পাওয়ার সময় তিনি প্রায় দুই গজ এগিয়ে ছিলেন।
৫৭ মিনিটে উল্টো এগিয়ে যাওয়ার বড় সুযোগ পায় ডিআর কঙ্গো। পর্তুগালের বক্সে ব্রুনোকে কাটিয়ে বল নিয়ে জোরালো শট নেন বাকাম্বু। বল লাগে কাছের পোস্টে। অল্পের জন্য বেঁচে যায় পর্তুগাল।
ম্যাচের ৬৬ মিনিট পর্যন্ত নেভেসের গোলই ছিল পর্তুগালের একমাত্র লক্ষ্যে থাকা শট। এত বড় দল হয়েও গোলের সামনে তাদের ধার কম ছিল। এর কৃতিত্বও ডিআর কঙ্গোর রক্ষণকে দিতে হয়।
৬৯ মিনিটে কনসেইসাও বাইলাইন থেকে বল কাটব্যাক করেন রোনালদোর দিকে। কিন্তু পাসটি একটু জোরে ও পেছনে ছিল। শট নিতে গিয়ে বল ঠিকমতো লাগাতে পারেননি পর্তুগাল অধিনায়ক।
৭০ মিনিটে পানীয় বিরতির পর গতি বাড়ায় পর্তুগাল। ৭২ মিনিটে নুনো মেন্দেস ও নেতোকে তুলে নেলসন সেমেদো ও রাফায়েল লেয়াওকে নামায় পর্তুগিজ কোচ।
৭৪ মিনিটে আবারও সুযোগ পান রোনালদো। নিচু ক্রসে কাছের পোস্টে বলের দিকে ছুটেছিলেন তিনি। এবার আগের চেয়েও কাছে ছিলেন, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত গোল আসেনি তার পা থেকে।
৭৬ মিনিটে ডিআর কঙ্গো পরিবর্তন আনে। ক্লান্ত হয়ে পড়া খেলোয়াড়দের বদলে নতুন কয়েকজনকে নামায় দলের কোচ। ৭৯ মিনিটে পাল্টা আক্রমণে সুযোগ পেয়েছিল তার দল। কিন্তু বাকাম্বুর শট অনেক ওপর দিয়ে যায়।
৮৪ মিনিটে ভিতিনিয়াকে তুলে গনসালো রামোসকে নামায় পর্তুগাল। দুই স্ট্রাইকার নিয়ে শেষ দিকে গোলের জন্য চাপ বাড়ায় তারা। ৮৫ মিনিটে ডিআর কঙ্গোও শেষ দুটি পরিবর্তন আনে। বাকাম্বু ও ওয়ান-বিসাকার জায়গায় নামেন সিমন বানজা ও গেদেওন কালুলু।
শেষ দিকে পর্তুগাল চাপ বাড়ালেও এমপাসি ছিলেন সতর্ক। ৮৮ মিনিটে কানসেলোর নিচু ক্রস কাছের পোস্টে ধরতে ভুল করেননি তিনি। বল ফসকালেই খুব কাছ থেকে ট্যাপ-ইন করতে পারতেন রোনালদো।
৮৯ মিনিটে পাল্টা আক্রমণে ছুটতে থাকা উইসাকে ফাউল করে হলুদ কার্ড দেখেন সেমেদো। ৯০ মিনিটে দূর থেকে শট নেন ব্রুনো, বল যায় ডান পোস্টের বাইরে দিয়ে।
যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে আবার উইসাকে থামাতে গিয়ে হলুদ কার্ড দেখেন তমাস আরাউজো। চতুর্থ মিনিটে দারুণ নটমেগ করে কর্নার আদায় করেন সেমেদো। কিন্তু ব্রুনোর কর্নার নিরাপদে ধরে ফেলেন এমপাসি।
এরপর শেষ বাঁশি বাজতেই ডিআর কঙ্গো শিবিরে উল্লাস শুরু হয়। বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম পয়েন্ট পেয়ে ইতিহাস গড়ল তারা। অন্যদিকে বলের দখল আর অভিজ্ঞতায় এগিয়ে থেকেও জয় দিয়ে আসর শুরু করতে পারল না পর্তুগাল।

নিজস্ব প্রতিবেদক 

























