11:16 pm, Tuesday, 9 June 2026

তৃণমূলে ভাঙন: ২০ সাংসদ ও ৬০ বিধায়কের নতুন ব্লক

ডেস্ক রিপোর্ট : পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে সোমবার (৮ জুন) এক নজিরবিহীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। একের পর এক ঘটনায় কার্যত বড় ভাঙনের মুখে পড়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস।

বিধানসভায় বিদ্রোহী বিধায়কদের পৃথক ব্লক গঠনের পর এবার লোকসভাতেও তৃণমূলের একাংশ নতুন গোষ্ঠী তৈরি করে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএর সঙ্গে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে দাবি উঠেছে।
এই মুহূর্তে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দিল্লিতে ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকে উপস্থিত রয়েছেন।

ঠিক সেই সময়েই তৃণমূলের ২০ জন সাংসদ নতুন সংসদীয় ব্লক গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন। ওই গোষ্ঠীর দাবি, তারাই এখন ‘আসল তৃণমূল কংগ্রেস’ এবং আগামী দিনে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএর সঙ্গে থেকে উন্নয়নের রাজনীতি করবে।
লোকসভায় নতুন গোষ্ঠীর নেতৃত্বে উঠে এসেছে বারাসাতের সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নাম। তাকে বিদ্রোহী সংসদীয় দলের চিফ হুইপ বা প্রধান হিসেবে দাবি করা হয়েছে।

সোমবার সকালে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের দিল্লির বাসভবনে বিদ্রোহী তৃণমূল সাংসদদের বৈঠক হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের বিরোধীদলীয় নেতা শুভেন্দু অধিকারী এবং ত্রিপুরার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেব। ওই বৈঠকেই লোকসভায় তৃণমূলের নতুন ব্লক গঠনের রূপরেখা চূড়ান্ত হয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলে জোর জল্পনা শুরু হয়েছে।

লোকসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের মোট ২৮ জন সাংসদ রয়েছেন। বিদ্রোহী শিবিরের দাবি, তাদের মধ্যে ২০ জন নতুন ব্লকের পক্ষে সই করেছেন। যদিও এখন পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা হয়নি।

সূত্র মারফত যাদের নাম সামনে এসেছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন কাকলি ঘোষ দস্তিদার, প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়, পার্থ ভৌমিক, শর্মিলা সরকার, অসিত মাল, কালীপদ সোরেন, অরূপ চক্রবর্তী, রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়, দেব, শতাব্দী রায়, জুন মালিয়া, সাজদা আহমেদ, বাপি হালদার, ইউসুফ পাঠান, খলিলুর রহমানসহ আরও কয়েকজন।

অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভাতেও তৃণমূলের একটি বড় অংশ আলাদা ব্লক তৈরি করেছে। সদ্য সমাপ্ত পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল ৮০টি আসনে জয়ী হলেও বিদ্রোহী শিবিরে ইতোমধ্যে ৫৮ জন বিধায়ক যোগ দিয়েছেন। এই নতুন গোষ্ঠীর নেতৃত্বে রয়েছেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। তাদের বক্তব্য, বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন তাদের পক্ষেই থাকায় তারাই প্রকৃত তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিনিধিত্ব করছে।

রাজনৈতিক জল্পনা আরও বেড়েছে কলকাতার মেয়র ও রাজ্যের মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিমকে ঘিরে। সূত্রের দাবি, তিনি এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। যদিও এখন পর্যন্ত তিনি দলবদল নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি। তবু রাজনৈতিক মহলে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে যে, তিনিও ভবিষ্যতে নতুন শিবিরে যোগ দিতে পারেন।

এই পরিস্থিতিতে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতীক ‘জোড়া ফুল’ নিয়েও নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিদ্রোহী শিবিরের দাবি, বিধানসভা ও লোকসভা দুই ক্ষেত্রেই জনপ্রতিনিধিদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ তাদের সঙ্গে রয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে নির্বাচন কমিশনের কাছে তারাই ‘আসল তৃণমূল’ হিসেবে দাবি জানাতে পারেন।

অন্যদিকে, দিল্লিতে ইন্ডিয়া জোটের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে উপস্থিত রয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। বৈঠকে কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি, আরজেডি, ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা, সিপিআইএম, সিপিআই, এনসিপি (শরদ পাওয়ার গোষ্ঠী), শিবসেনা (ইউবিটি), ন্যাশনাল কনফারেন্সসহ মোট ২৩টি জাতীয় ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল অংশ নিয়েছে।

একদিকে যখন বিরোধী জোট নিজেদের ঐক্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের এই অভ্যন্তরীণ ভাঙন রাজ্যের রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।

তবে বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি, দলীয় প্রতীক কার হাতে থাকবে এবং কোন পক্ষকে ‘আসল তৃণমূল’ হিসেবে গণ্য করা হবে, তা শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার ওপরই নির্ভর করবে।

Tag :
About Author Information

Sirajul Islam

প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ

তৃণমূলে ভাঙন: ২০ সাংসদ ও ৬০ বিধায়কের নতুন ব্লক

Update Time : 08:24:27 am, Tuesday, 9 June 2026

ডেস্ক রিপোর্ট : পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে সোমবার (৮ জুন) এক নজিরবিহীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। একের পর এক ঘটনায় কার্যত বড় ভাঙনের মুখে পড়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস।

বিধানসভায় বিদ্রোহী বিধায়কদের পৃথক ব্লক গঠনের পর এবার লোকসভাতেও তৃণমূলের একাংশ নতুন গোষ্ঠী তৈরি করে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএর সঙ্গে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে দাবি উঠেছে।
এই মুহূর্তে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দিল্লিতে ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকে উপস্থিত রয়েছেন।

ঠিক সেই সময়েই তৃণমূলের ২০ জন সাংসদ নতুন সংসদীয় ব্লক গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন। ওই গোষ্ঠীর দাবি, তারাই এখন ‘আসল তৃণমূল কংগ্রেস’ এবং আগামী দিনে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএর সঙ্গে থেকে উন্নয়নের রাজনীতি করবে।
লোকসভায় নতুন গোষ্ঠীর নেতৃত্বে উঠে এসেছে বারাসাতের সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নাম। তাকে বিদ্রোহী সংসদীয় দলের চিফ হুইপ বা প্রধান হিসেবে দাবি করা হয়েছে।

সোমবার সকালে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের দিল্লির বাসভবনে বিদ্রোহী তৃণমূল সাংসদদের বৈঠক হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের বিরোধীদলীয় নেতা শুভেন্দু অধিকারী এবং ত্রিপুরার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেব। ওই বৈঠকেই লোকসভায় তৃণমূলের নতুন ব্লক গঠনের রূপরেখা চূড়ান্ত হয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলে জোর জল্পনা শুরু হয়েছে।

লোকসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের মোট ২৮ জন সাংসদ রয়েছেন। বিদ্রোহী শিবিরের দাবি, তাদের মধ্যে ২০ জন নতুন ব্লকের পক্ষে সই করেছেন। যদিও এখন পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা হয়নি।

সূত্র মারফত যাদের নাম সামনে এসেছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন কাকলি ঘোষ দস্তিদার, প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়, পার্থ ভৌমিক, শর্মিলা সরকার, অসিত মাল, কালীপদ সোরেন, অরূপ চক্রবর্তী, রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়, দেব, শতাব্দী রায়, জুন মালিয়া, সাজদা আহমেদ, বাপি হালদার, ইউসুফ পাঠান, খলিলুর রহমানসহ আরও কয়েকজন।

অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভাতেও তৃণমূলের একটি বড় অংশ আলাদা ব্লক তৈরি করেছে। সদ্য সমাপ্ত পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল ৮০টি আসনে জয়ী হলেও বিদ্রোহী শিবিরে ইতোমধ্যে ৫৮ জন বিধায়ক যোগ দিয়েছেন। এই নতুন গোষ্ঠীর নেতৃত্বে রয়েছেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। তাদের বক্তব্য, বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন তাদের পক্ষেই থাকায় তারাই প্রকৃত তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিনিধিত্ব করছে।

রাজনৈতিক জল্পনা আরও বেড়েছে কলকাতার মেয়র ও রাজ্যের মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিমকে ঘিরে। সূত্রের দাবি, তিনি এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। যদিও এখন পর্যন্ত তিনি দলবদল নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি। তবু রাজনৈতিক মহলে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে যে, তিনিও ভবিষ্যতে নতুন শিবিরে যোগ দিতে পারেন।

এই পরিস্থিতিতে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতীক ‘জোড়া ফুল’ নিয়েও নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিদ্রোহী শিবিরের দাবি, বিধানসভা ও লোকসভা দুই ক্ষেত্রেই জনপ্রতিনিধিদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ তাদের সঙ্গে রয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে নির্বাচন কমিশনের কাছে তারাই ‘আসল তৃণমূল’ হিসেবে দাবি জানাতে পারেন।

অন্যদিকে, দিল্লিতে ইন্ডিয়া জোটের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে উপস্থিত রয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। বৈঠকে কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি, আরজেডি, ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা, সিপিআইএম, সিপিআই, এনসিপি (শরদ পাওয়ার গোষ্ঠী), শিবসেনা (ইউবিটি), ন্যাশনাল কনফারেন্সসহ মোট ২৩টি জাতীয় ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল অংশ নিয়েছে।

একদিকে যখন বিরোধী জোট নিজেদের ঐক্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের এই অভ্যন্তরীণ ভাঙন রাজ্যের রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।

তবে বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি, দলীয় প্রতীক কার হাতে থাকবে এবং কোন পক্ষকে ‘আসল তৃণমূল’ হিসেবে গণ্য করা হবে, তা শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার ওপরই নির্ভর করবে।