আন্তর্জাতিক ডেস্ক :: দীর্ঘ দুই দশক পর গাজার একটি এলাকায় পৌর নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে অধিকৃত পশ্চিম তীরেও স্থানীয় সরকার কাঠামো নির্ধারণে ভোট দিচ্ছেন ফিলিস্তিনিরা।
চলমান যুদ্ধ, রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং দীর্ঘদিন জাতীয় নির্বাচন না হওয়ার প্রেক্ষাপটে এই নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ হলেও অনেকেই প্রতীকী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
শনিবার (২৫ এপ্রিল) স্থানীয় সময় সকাল ৭টায় গাজার দেইর আল-বালাহ এলাকায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়।
প্রায় ৭০ হাজার ভোটার এখানে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন। অবরুদ্ধ এই ভূখণ্ডে গত ২০ বছরের মধ্যে এটিই প্রথম কোনো স্থানীয় নির্বাচন।
তবে গাজার একক একটি শহরে এই ভোট আয়োজনকে মূলত ‘পাইলট’ বা পরীক্ষামূলক উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
অন্যদিকে, অধিকৃত পশ্চিম তীরে প্রায় ১৫ লাখ নিবন্ধিত ভোটার স্থানীয় পরিষদের প্রতিনিধিদের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।
এসব পরিষদ পানি, সড়ক ও বিদ্যুৎ সরবরাহসহ মৌলিক নাগরিক সেবা তদারকি করে থাকে।
বৈধতা ও সংস্কারের বার্তা দিতে নির্বাচন
দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি, রাজনৈতিক স্থবিরতা এবং ২০০৬ সালের পর জাতীয় নির্বাচন না হওয়ায় জনঅসন্তোষ বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ (পিএ) নিজেদের সংস্কার ও বৈধতা প্রদর্শনের অংশ হিসেবে এই নির্বাচন আয়োজন করছে বলে বিশ্লেষকদের মত।
বেশিরভাগ প্রার্থী তালিকা প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের নেতৃত্বাধীন ফাতাহ আন্দোলনের সমর্থিত অথবা স্বতন্ত্র প্রার্থী। গাজার নিয়ন্ত্রণকারী হামাস এ নির্বাচনে আনুষ্ঠানিকভাবে অংশ নেয়নি।
গাজা ও পশ্চিম তীরকে রাজনৈতিকভাবে যুক্ত করার চেষ্টা
রামাল্লাহভিত্তিক কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, এই ভোটের অন্যতম উদ্দেশ্য গাজা ও পশ্চিম তীরকে একটি একক রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে যুক্ত করা।
তবে যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় প্রচলিত পদ্ধতিতে ভোটার নিবন্ধন সম্ভব হয়নি। নির্বাচন কমিশন সরাসরি ইসরায়েল বা হামাসের সঙ্গে সমন্বয় করতে পারেনি এবং ব্যালট পেপার, বাক্স বা কালি পাঠাতেও নানা সীমাবদ্ধতার মুখে পড়েছে।
২০০৬ সালের পর বদলে যাওয়া রাজনৈতিক বাস্তবতা
২০০৬ সালের নির্বাচনে হামাস জয়লাভ করে এবং পরের বছর ফাতাহ-নেতৃত্বাধীন প্রশাসনকে সরিয়ে গাজার নিয়ন্ত্রণ নেয়। যদিও হামাস এবারের নির্বাচনে অংশ নেয়নি, বিভিন্ন জরিপে এখনো গাজা ও পশ্চিম তীরে হামাসের জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্য বলে উঠে এসেছে।
জাতিসংঘের মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়ার উপ-সমন্বয়ক রামিজ আলাকবারভ এই নির্বাচনকে ‘অত্যন্ত কঠিন সময়েও গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
নতুন শাসন কাঠামোর অনিশ্চয়তা
বর্তমানে গাজার একটি অংশ হামাসের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও ইসরায়েলি বাহিনীর আংশিক প্রত্যাহারের পর অঞ্চলটি নতুন শাসন ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ২০ দফা পরিকল্পনার আওতায় একটি আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধায়ক বোর্ড গঠনের কথা বলা হয়েছে।
তবে হামাস নিরস্ত্রীকরণ, পুনর্গঠন এবং ক্ষমতা হস্তান্তরসহ পরবর্তী ধাপগুলোয় অগ্রগতি এখনো স্থবির রয়েছে।
নির্বাচন ব্যবস্থায় পরিবর্তন
সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস নির্বাচন ব্যবস্থায় সংস্কার আনতে একটি ডিক্রি জারি করেন। নতুন নিয়মে দলীয় তালিকার পরিবর্তে ব্যক্তিভিত্তিক ভোটের সুযোগ রাখা হয়েছে, প্রার্থীদের বয়সসীমা কমানো হয়েছে এবং নারী প্রার্থীদের জন্য কোটা বাড়ানো হয়েছে।
এছাড়া, প্রার্থীদের ফিলিস্তিনি মুক্তি সংস্থার (পিএলও) কর্মসূচি মেনে নেওয়ার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে, যেখানে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং সশস্ত্র সংগ্রাম পরিত্যাগের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এতে কার্যত হামাসসহ কিছু গোষ্ঠী নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে চলে গেছে।
পশ্চিম তীরে সীমিত ক্ষমতা ও চ্যালেঞ্জ
অধিকৃত পশ্চিম তীরে পিএ সীমিত প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে থাকে। স্থানীয় পরিষদগুলো বর্জ্য ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে নির্মাণ অনুমোদন পর্যন্ত বিভিন্ন সেবা পরিচালনা করে।
অসলো চুক্তি অনুযায়ী অঞ্চলটির পূর্ণ প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ পিএর কাছে হস্তান্তরের কথা থাকলেও বাস্তবে এর বড় অংশ এখনো ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
এদিকে, নিরাপত্তা অভিযান চালিয়ে ইসরায়েলি বাহিনী যে এলাকাগুলো দখলে নিয়েছে, সেসব জায়গাতেও ভোট আয়োজন করা হচ্ছে। তবে রামাল্লাহ ও নাবলুসসহ কিছু বড় শহরে পর্যাপ্ত প্রার্থী না থাকায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে না।
দীর্ঘদিন শান্তি আলোচনা স্থবির থাকা এবং পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের ফলে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রভাব ক্রমেই কমে যাচ্ছে বলেও বিশ্লেষকদের অভিমত।

নিজস্ব প্রতিবেদক 



























